ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনালাপ: মার্কিন প্রেসিডেন্টের টেলিফোন আলাপ কে শুনতে পারে?

ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন কল যিনি প্রকাশ করেছেন, তার দাবি, ওই ফোন কলটি যেভাবে অস্বাভাবিক গোপনীয়তার সঙ্গে সামলানো হয়েছে, তাতে বোঝা যায় যে, এ ধরণের ফোন কল কীভাবে নজরদারি করা হয় এবং কতটা গোপনীয় রাখা হয়।
ওই টেলিফোন আলাপে ডেমোক্র্যাট দল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে চাওয়া জো বাইডেন এবং তার ছেলের ব্যাপারে তদন্তের জন্য মি. ট্রাম্প চাপ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর মার্কিন কংগ্রেসে ইমপিচমেন্ট তদন্ত শুরু করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
ফোন কলের তথ্য ফাঁসকারী মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লোদামির যেলেনস্কির টেলিফোন কথোপকথন গোপনীয় একটি ইলেকট্রনিক স্থানে রাখার কারণ আসলে জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বরং রাজনৈতিক।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ওই টেলিফোন আলাপ গোপনীয় হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপরে সেটি চরম-গোপনীয় বলে তালিকাভুক্ত করা হয়, যা শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যক্তির দেখার বা শোনার সুযোগ আছে।
তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তির মতে, এর ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, এটার রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার ব্যাপারে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা যে শুধু জানতেনই, তা নয়, বরং তারা মার্কিন সরকারের অন্যদের কাছে থেকে তথ্য গোপন করার চেষ্টা করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচকরা বলছেন, ওই কলের উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে রাজি করানোর চেষ্টা করা যাতে তিনি প্রতিপক্ষ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেনের ব্যাপারে তদন্ত করেন। যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ হয় এবং হোয়াইট হাউজের কর্মীরা যাবতীয় চিহ্ন মুছে ফেলতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সহকারীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ওই টেলিফোন আলাপের ব্যাপারে আলাদা করে কিছু ঘটেনি।
কিন্তু এক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মগুলো কী?
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
কে শুনতে পারে টেলিফোন আলাপ?
রীতি অনুযায়ী, বিদেশি কোন নেতার সঙ্গে টেলিফোন আলাপের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের (এনএসসি) কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। এরপরে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট টেলিফোনে কথা বলেন, তখন ওই কর্মকর্তারা ওভাল অফিসে বসে থাকেন।
ইউএসএ টুডের তথ্য অনুযায়ী, এনএসসির কমপক্ষে দুইজন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
এ সময় হোয়াইট হাউজের আরেকটি গোপনীয় কক্ষে কর্মকর্তারা বসে ওই টেলিফোন আলাপ শুনবেন এবং নোট নেবেন। তাদের এই নোটকে বলা হয় 'মেমোর্যান্ডাম অফ টেলিফোন কনভারসেশন' এবং হোয়াইট হাউজের আরো অনেক জিনিসের মতো একে সংক্ষেপে বলা হয় মেমকন।
কম্পিউটারের মাধ্যমে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফোনালাপ বিস্তারিত বর্ণনা তৈরি করা হয়।
হোয়াইট হাউজের সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যে কর্মকর্তা টেলিফোন আলাপের নোট নেন, তার সঙ্গে কম্পিউটারের বর্ণনা মিলিয়ে দেখা হয়। কর্মকর্তার নোট এবং কম্পিউটারের ট্রান্সক্রিপ্ট পরবর্তীতে একটি ফাইলে সংযুক্ত করে রাখা হয়। হয়তো এই ট্রান্সক্রিপ্ট পুরোপুরি নিখুঁত হয় না, তবে যতটা সম্ভব যত্ন আর সতর্কতার সঙ্গে এটি তৈরি করা হয়।
তথ্যফাঁসকারী ওই ব্যক্তির দাবি অনুযায়ী, মি. যেলেনস্কির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফোনালাপ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন অন্তত এক ডজন ব্যক্তি, যারা ওই আলাপ শুনতে পেয়েছেন।
সাবেক এনএসসি কর্মকর্তারা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে টেলিফোন আলাপ শুরুর একেবারে আগে আগে ব্রিফিংয়ের জন্য কর্মকর্তাদের ডাকা হয়। যাদের সেখানে ডাকা হয়, তাদের দক্ষতাও একই রকম নয়। অনেক সময় শেষ মুহূর্তে ফোন কল শুনতে বলা হয়।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেলিফোন আলাপের জের ধরে ইমপিচমেন্ট তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরাটেলিফোন আলাপের গোপনীয়তা-চরম গোপনীয়তা কীভাবে নির্ধারিত হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের (এনএসসি) নির্বাহী সচিবের অফিসে যারা কাজ করেন, সেই কর্মকর্তারা ঠিক করেন যে একটি টেলিফোন আলাপের গোপনীয়তার মাত্রা কী হবে, বলছেন সাবেক একজন হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা।
যদি টেলিফোন আলাপের বর্ণনায় এমন তথ্য থাকে, যার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা বা কোন ব্যক্তির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে, তাহলে সেটি চরম গোপনীয় বলে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বিশেষ সংরক্ষিত স্থানে সেটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
ওবামা প্রশাসনের সময় জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য গণতন্ত্র বিষয়ক প্রকল্পের কর্মকর্তা অ্যান্ডু মিলার, যিনি এই গোপনীয়তার ধাপগুলো সম্পর্কে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মি. মিলার বলছেন, কেন কিছু টেলিফোন আলাপকে সবচেয়ে বেশি গোপনীয়তার তকমা দেয়া হয়। কিন্তু, তার মতে, মি. ট্রাম্প এবং মি. যেলেনস্কির আলাপের মধ্যে এমন কিছু নেই, যেজন্য সেটাকে চরম গোপনীয় বলা যেতে পারে।
''ওই আলাপকে চরম গোপনীয় হিসাবে তালিকাভুক্তির কোন কারণ আমি দেখি না,'' বলছেন মি. মিলার। ''একমাত্র রাজনৈতিক কারণেই এটা করা হয়েছে।''
টেলিফোন আলাপ 'চরম গোপনীয়' তালিকাভুক্ত করা হলে কী ঘটে?
কোন টেলিফোন আলাপকে 'চরম গোপনীয়' মাত্রা দেয়া হলে সেটা শুধুমাত্র মার্কিন সরকারের শীর্ষ কয়েকজন ব্যক্তি দেখার সুযোগ পাবেন, যাদের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমতি রয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করে বলছেন, জয়েন্ট ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টেলিজেন্স কমিউনিকেশন সিস্টেম নামের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব ট্রান্সক্রিপ্ট সংরক্ষণ করা হয়, যেখানে শুধুমাত্র ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসে কর্মরত লোকজন প্রবেশ করতে পারে।
এসব তথ্য যদিও বিশেষ একটি স্থানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার অস্বাভাবিক পাহারা থাকে না।
যেসব টেলিফোন আলাপ শুধুমাত্র 'গোপনীয়' হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়, সেগুলোর বিষয় সম্পর্কে কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ করতে পারেন। তবে অবশ্যই শুধু তারাই আলাপ করতে পারেন, যারা সরকারে কাজ করে।

ছবির উৎস, Getty Images
এই ঘটনায় কি গোপনীয়তার নিয়ম মানা হয়েছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরামর্শদাতারা বলছেন, এই টেলিফোন আলাপে কোন সমস্যা নেই-সুতরাং ট্রান্সক্রিপ্টের ব্যবস্থাপনা নিয়েও কোন প্রশ্ন নেই। তারা তথ্য ফাঁসকারীর দাবি জোরালো ভাবে নাকচ করে দিচ্ছেন। কিন্তু অন্যরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টেলিফোন এবং সেটি ঘিরে গোপনীয়তা প্রমাণ করছে যে, এখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে।
''নিরাপত্তা গোপনীয়তার বিষয়টি তৈরি করা হয়েছে জীবন রক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে,'' বলছেন ওবামা প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তা ব্রেট ব্রয়েন।
''হঠাৎ করে যদি সেটা রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক অবস্থানকে রক্ষা করার কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তাহলে আর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গোপনীয় কোন গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা থাকবে না।''
এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত মি. মিলার। তিনি বলছেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বসের টেলিফোন আলাপের বিস্তারিত গোপনীয় করে রাখার মানে হলো এই পদ্ধতিটি বাজে ভাবে ব্যবহার করা।
যারা হোয়াইট হাউজে কাজ করেন, তাদের একটি শপথ নিতে হয় যে, তারা প্রেসিডেন্টকে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে সমুন্নত রাখবেন।
''আপনার প্রাথমিক আনুগত্য দেশির প্রতি হওয়া উচিত- কোন ব্যক্তির প্রতি নয়।'' তিনি বলছেন।








