ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ: 'প্রচণ্ড শব্দে গ্লাস ভাঙ্গলো আর পাথর লাগলো আমার কপালে, জখম অবস্থায় বাসায় এলাম'

ছবির উৎস, Getty Images
প্রিয়াঙ্কা তরফদার বৃষ্টি বছর তিনেক আগে শ্রীমঙ্গলে তার গ্রামের বাড়ি থেকে ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন।
সেসময় রাজনৈতিক সংকটের জের ধরে একটি রাজনৈতিক দলের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ঢাকায় ফেরার জন্য রেল ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিলোনা তার কাছে।
কিন্তু সে যাত্রায় অল্পের জন্যই বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।
বিবিসি বাংলাকে প্রিয়াঙ্কা তরফদার বলেন, "রাত বারটার দিকে সম্ভবত ট্রেনটা শ্রীমঙ্গলে থেকে ছাড়ে। ট্রেনে অনেক ভিড় ছিলো কারণ সব স্টেশন থেকেই অনেক লোক উঠেছিলো। ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া আসার পর কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হচ্ছিলো জানালা বন্ধ করার জন্য। জানালা বন্ধ করতে যাবো তখনি ঢিল আসে আমাকে লক্ষ্য করে। ভাগ্য ভালো হাতে থাকা মোবাইলে এসে লাগে ঢিলটি আর বেঁচে যাই আমি"।
কিন্তু ঢাকার মিরপুরের রূপনগর এলাকার শরীফ মোস্তফা কামালের ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিলোনা। বরং আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য তার প্রিয় রেলে উঠে জীবন বিপন্ন হতে বসেছিলো তার।
"২০১২ সালের শীতকালের ঘটনা। আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছিলাম। ঢাকার কাছে পুবাইলের কোনো জায়গায় আসার পর হঠাৎ করে ট্রেন চলন্ত অবস্থায় প্রচণ্ড শব্দে জানালার গ্লাস ভেঙ্গে গেলো। এক কেজি ওজনের পাথর এসে আমার কপালে লাগলো। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। পরে যাত্রীরা আমার স্ত্রী ও মেয়েকে খবর দেয়। আমি জখম অবস্থায় বাসায় আসলাম"।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, রেলওয়ে ফ্যান গ্রুপের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া
বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথ দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় এ ধরণের পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রায়শই ঘটে। গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
২০১৩ সালে চট্টগ্রামে প্রীতি দাশ নামের একজন প্রকৌশলী নিহত হবার পর বেশ শোরগোল হয় বিষয়টি নিয়ে। গত বছর নিহত হয় রেলেরই একজন পরিদর্শক। আবার এ বছরের মে মাসে জিসান নামে একটি শিশুর আহত হবার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনায় আসে রেলে পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে পাথর ছুড়ে ২,০০০ বেশি জানালা-দরজা ভাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা -সিরাজগঞ্জ রুটে নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াত করেন মো: আব্দুল আজিজ। তিনি বলছেন রেল যাত্রায় এ কারণে কতটা সতর্ক থাকেন তিনি।
"আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া।কমলাপুর থেকে ট্রেনেই আসা যাওয়া করি। মাঝে মধ্যে ট্রেনে ঢিল বা পাথর ছোড়া হয়, বিশেষ করে রাতে। আমরা পরিবারসহ যখন যাই তখন জানালা বন্ধ রাখি। যদিও ইদানিং কিছু ট্রেন এসেছে তাতে জানালা একটু উপরে থাকায় সরাসরি যাত্রীর গায়ে লাগার সুযোগ কম। তারপরেও আতঙ্কিত থাকি। বিশেষ করে যখন পরিবার নিয়ে যাই"।
কর্মকর্তারা বলছেন লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইল সহ বিশটি জেলায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। এমনকি নতুন আনা ট্রেনগুলো রেহাই পাচ্ছেনা।

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা
একের পর এক ঘটনার জের ধরে এসব নিয়ে কাজ করে রেল বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্পট হিসেবে ৬৫টি স্থানকে চিহ্নিত করলেও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা যাচ্ছেনা কেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে রেলের পশ্চিমাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক মো: হারুণ অর রশীদ বলছেন বেশ কিছু ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও ঘটনার পর জড়িতদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
তিনি বলেন, "ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার ও সদর দপ্তর থেকেও বেশ কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মাইকিং করা হয়েছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে। দু একটি ঘটনায় ব্যবস্থাও হয়েছে। কিন্তু পাথর যারা ছোড়ে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। শাস্তি দেয়াও কঠিন। কারণ ছেলেপেলেরা খেলার ছলে পাথর ছোড়ে"।
রেলওয়ে আইনে ট্রেনে পাথর ছোড়ার জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধানের পাশাপাশি কারও মৃত্যু হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও এসব আইনে কারও শাস্তির নজির নেই।
যদিও রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলছেন, তারা মনে করেন ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মানুষকে সচেতন করার অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা অনেক কমে এসেছে"।
কিন্তু ঘটনাগুলো একেবারে বন্ধ করা যাচ্ছেনা কেন এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন গ্রামের রাস্তা দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় শিশু কিশোররা কৌতুহলবশত এসব ঘটায় আর এ কারণেই তারা স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
রেল পুলিশ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে যে জনসচেতনতার পাশাপাশি যেসব জায়গায় রেল বেশি আক্রান্ত হয় সেসব জায়গায় পুলিশী নজরদাড়িও বাড়ানো হয়েছে। ফলে গত এক মাসে কয়েকটি জায়গায় পাথর নিক্ষেপের সময় ধরাও পড়েছে কয়েকজন।








