মিরপুর বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড: 'পিন্ধনের কাপড়টা খালি বাঁচাইছি'

আগুনে পুড়ে যাওয়া মিরপুরের চলন্তিকা বস্তি
ছবির ক্যাপশান, আগুনে পুড়ে যাওয়া মিরপুরের চলন্তিকা বস্তি

বাংলাদেশে রাজধানীর মিরপুরে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে পঞ্চাশ হাজারের মতো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। তাদের তথ্য অনুযায়ী ঘর পুড়েছে ১৫ হাজারের মতো।

পুড়ে যাওয়া বস্তিতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন দমকল কর্মীরা। অধিবাসীদের অনেকেই খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন।

ঢাকার মিরপুর ৭ নম্বরের এই বস্তিটি চলন্তিকা বস্তি বলে পরিচিত ছিল।

সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেলো হাজারো মানুষের ভিড়। আশপাশ থেকে অনেকেই দেখতে এসেছেন।

কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের যেন আলাদা করে চেনা যায়। বিমর্ষ হয়ে বসে আছেন তারা। কেউ বিলাপ করছেন। কেউবা আবার পুড়ে কুঁকড়ে কালো হয়ে যাওয়া টিনের নিচে হাতড়ে দেখার চেষ্টা করছেন আগুন থেকে কিছু বেঁচে গেছে কিনা। নেয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট আছে কিনা।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ভিডিওর ক্যাপশান, ঢাকার বস্তিতে 'লুমকানি' ডিভাইস, ঠেকাতে পারবে আগুন?
পুড়ে যাওয়া চলন্তিকা বস্তির বাসিন্দা পোশাক কারখানার শ্রমিক ইয়াসমিন বেগম
ছবির ক্যাপশান, পোশাক কারখানার শ্রমিক ইয়াসমিন বেগম বলছেন তাদের এখন রাস্তায় থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই।

পেশায় গৃহকর্মী রহিমা বেগম বলছেন, পরনের কাপড় ছাড়া এখন আর কিছুই নেই তার। তিনি বলছেন, "প্রথমে আগুন দূরে ছিল। তারপর দেখি কাছে আসতে আসতে আইসা পড়ছে। একদম কিছু বাঁচাইতে পারি না। এই পিন্ধনের কাপড়টা খালি বাঁচাইছি।"

মূল সড়ক থেকে বস্তিটির অবস্থান একটু ঢালে। ভেতরে ঢোকার পথগুলো এতটাই সরু যে সেখানে দমকল বাহিনীর গাড়ি পৌঁছানো দুরূহ ব্যাপার।

পোশাক কারখানার শ্রমিক ইয়াসমিন বেগম বলছেন, তাদের এখন রাস্তায় থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। তিনি বলছেন, "বাচ্চা পোলাপাইন লইয়া আমরা সইরা গেছি। আমার ঘরদুয়ার সব পুইড়া গেছে। এখন এই যে রাস্তায় বইসা রইছি।"

গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে আগুনের সূত্রপাত। বস্তির বাসিন্দাদের অনেকেই ঈদের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে গিয়েছেন।

সম্ভবত সেই কারণেই বহু লোক প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু মাথার উপরে আশ্রয়সহ সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেকে।

বস্তির বাসিন্দা পোশাক শ্রমিক নারগিস আক্তার
ছবির ক্যাপশান, পোশাক শ্রমিক নারগিস আক্তার বলছেন, "বাচ্চা কোলে লমু না কি করমু কোন হুঁশ ছিল না।

আরেক পোশাক শ্রমিক নারগিস আক্তার বলছেন, "বাচ্চা কোলে লমু না কি করমু কোন হুঁশ ছিল না। যারা দেশে গেছে তারা আসবে। আইসা দেখবে সব জ্বইলা পুইড়া কালা হইয়া গেছে।"

হতাহতের ঘটনা সেভাবে না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে।

উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক, মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি বলছেন তারা এখনো উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কিভাবে আগুন লেগেছে সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

"এটি একটি আবদ্ধ জায়গা। ঢোকার পথ একটা। আপনারা জানেন যে বস্তি সাধারণত দাহ্য জিনিস দিয়ে তৈরি হয়। তাই আগুন খুব দ্রুত ছড়ায়," বলছিলেন রেজাউল করিম।

চলন্তিকা বস্তির সরু গলিপথ
ছবির ক্যাপশান, বস্তির এলাকাটি আবদ্ধ এবং দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি

তিনি আরও বলেছেন, "এখানে গ্যাসের লাইন নেয়া হয়েছিলো প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে। যখন আগুন লাগে তখন প্লাস্টিক পাইপ গলে গিয়ে গ্যাস লিক হয়ে এই আগুন ছড়াইয়া পড়ছে।"

ঢাকা উত্তরের মেয়র মোঃ আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন এই বস্তিতে অগ্নিকান্ডে পঞ্চাশ হাজারের মতো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলছেন, "তারাও এই মুহূর্তে বলছে তারা কই থাকবে। আমরা আপাতত কাছের স্কুলগুলোতে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছি। ওখানে যারা ছিল তারা কিন্তু বলেছে তারা ভাড়া ছিল। যারা বস্তির মালিক তারা বলেছে তার ঘরগুলো আবার ঠিক করে দেবে। কোন ধরনের সাহায্য লাগলে আমরা করবো।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের মোহাম্মদ রেজাউল করিম।
ছবির ক্যাপশান, উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক, মোহাম্মদ রেজাউল করিম।

কিন্তু আগুনে ঘর পুড়ে যাওয়া অনেকেই বলছেন এই সুযোগে তাদের উচ্ছেদ করে দেয়া হতে পারে তারা এমন আশংকা করছেন।

মেয়র ইসলাম বলছেন, "কেউ তাদের চলে যাওয়ার জন্য বলেনি।"

ওদিকে গ্রামের বাড়িতে বসেই আগুনের খবর পেয়েছেন চলন্তিকা বস্তির বাসিন্দাদের অনেকে। অনেকেই ফিরতে শুরু করেছেন। ফিরে এসে পেয়েছেন খালি দুমড়ানো কালো টিনের চাল।

বস্তির বাসিন্দারা বলছেন তারা সর্বস্ব হারিয়েছেন
ছবির ক্যাপশান, বস্তির বাসিন্দারা বলছেন তারা সর্বস্ব হারিয়েছেন