ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০১৯: যে কারণে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার চেয়েও এগিয়ে গেলেন ব্রাজিলের নারী ফুটবলার মার্তা

একদিকে ক্রিকেট প্রেমীরা যেখানে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে মাতোয়ারা, ঠিক সেসময়ই ফুটবল বিশ্বের সমর্থকরা নজর রাখছেন ফিফা নারী ফুটবল বিশ্বকাপের একেকটি রোমাঞ্চকর ম্যাচের দিকে।

ফ্রান্সে চলছে নারী ফুটবল বিশ্বকাপের আসর এবং দলগুলোর মধ্যে এখন চলছে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই।

এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল, তবে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড করেছেন ব্রাজিলের নারী ফুটবলার মার্তা।

পুরুষদের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডের মালিক মিরোস্লাভ ক্লোসাকেও ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

ফ্রান্সে চলমান নারী ফুটবল বিশ্বকাপে গত মঙ্গলবার যখন ইতালির গোলকিপার লরা গিলানিকে বোকা বানিয়ে ১৭তম গোলটি করেন তারপর থেকে সামাজিক মাধ্যমে তার ভূয়সী প্রশংসা শুরু হয়ে যায়।

নারী ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনি নিজেকে সবচেয়ে সফল খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন কিন্তু ইতালির বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের পর এটাই প্রমাণ হয় যে এবার এই রেকর্ডের অধিকারী পুরুষ ফুটবলার জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি।

ক্লোসা ২০০২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চারটি আসরে করেছিলেন মোট ১৬টি গোল।

কিন্তু দুজনের মধ্যে এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ অনেক সমর্থকদের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করেছে এবং রাজনৈতিক শুদ্ধতার অভিযোগ এনেছেন।

তাদের দাবি হচ্ছে, পুরুষদের বিশ্বকাপ নারীদের টুর্নামেন্টের চেয়ে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ, কারণ যেহেতু সেখানে অনেক বেশি দল এবং বহু দশকের বিনিয়োগ এবং পেশাদারিত্ব রয়েছে সেখানে।

গড় গোলের হিসাব

মিরোস্লাভ ক্লোজা জার্মানির হয়ে দারুণ রেকর্ড করেন। দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের মালিক তিনি। ১৩৭ ম্যাচ খেলে ৭১ গোল করেন তিনি যার গড় প্রতি খেলায় ০.৫১।

বিশ্বকাপে তার 'সুইট সিক্সটিন' এ পৌঁছাতে ২৪টি ম্যাচ খেলতে হয়েছে। যার ফলে টুর্নামেন্টে তার গোল গড় দাঁড়ায় ০.৬৬। ২০১৬ সালে জার্মান এই খেলোয়াড় অবসর নেন।

মার্তার জন্য নতুন

ব্রাজিলের এই নারী ফুটবলারের ১৩৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১১৯ গোলের অনানুষ্ঠানিক রেকর্ড রয়েছে-ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশন নারী দলের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।

প্রতি ম্যাচে গড়ে তার গোল পরিসংখ্যান ০.৮৮। অধিকাংশ ফুটবল পরিসংখ্যান সাইট যারা মূলত বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এবং প্রীতি ম্যাচের তথ্য সংরক্ষণ করছে যেখানে ৬১ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ৩৪।

তাহলে তার ম্যাচ প্রতি গড় অনেক নিচে অর্থাৎ ০.৫৫।

ফ্রান্স বিশ্বকাপ মার্তার জন্য পঞ্চম আসর। তার ১৭ গোল ২০টি ম্যাচ থেকে এসেছে যার গড় রেট প্রতি ম্যাচে ০.৮৫।

ক্লোসা হচ্ছেন পুরুষদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় খেলোয়াড় যিনি অন্তত চারটি বিশ্বকাপের আসরে গোল করার নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। আর মার্তা এক্ষেত্রে অনন্য, কেননা তিনি হচ্ছেন একমাত্র যে কিনা পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করেছেন।

টুর্নামেন্ট জয়

ক্লোসা হয়তো একটি কৃতিত্বের জন্য গর্ব করতে পারেন: তিনি ব্রাজিলে জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ী দলের একজন সদস্য ছিলেন।

মার্তা কখনোই এই শিরোপা তুলে ধরতে পারেননি যদিও ২০০৭ সালে ব্রাজিল শিরোপার খুব কাছ গিয়েও জয় করতে পারেনি জার্মানির কাছে ফাইনালে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে -যদিও দুটো অলিম্পিক রৌপ্য মেডাল ঝুলিতে রয়েছে।

দলে প্রভাব

জার্মান কিংবদন্তী ক্লোসা যিনি 'পোচার' ধরনের খেলোয়াড়দের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ, যে স্ট্রাইকার যেকোনো পরিস্থিতিতে গোল বের করে আনতে পারেন। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের সতীর্থদের সেভাবে সাহায্য করতে পারেননি: ক্লোসা বিশ্বকাপে গোল তৈরিতে সহায়তা করেছেন পাঁচবারের মতো।

মার্তাও একই সংখ্যক গোল তৈরি সুযোগ করে দিয়েছেন সতীর্থদের। কিন্তু দলের ভেতরে সবোর্চ্চ গোলদাতা এবং মুল প্লেমেকার হিসেবে তার প্রভাব বিশাল।

ক্লোসার অংশ নেয়া চারটি বিশ্বকাপে জার্মানি ৬২টি গোল করে।

আর ২০০৩ সালে মার্তার বিশ্বকাপের আসরে অভিষেক হওয়ার পর থেকে ৪৫টি গোল করেছে তার দল ব্রাজিল। তার মানে হল, নিজ দলের গোল এবং সহায়তার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ব্যাপকভাবে জড়িত।

প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য

পুরুষদের বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের তুলনায় নারীদের আসর বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকে পিছিয়ে আছে এবং অনেক দেশে তা নানা প্রতিকূলতার শিকার, যেমন ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের মতো দেশে নারীদের ক্লাব পর্যায়ে ফুটবল বহু দশক নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯১ সালে প্রথম মেয়েদের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল মূল পুরুষদের বিশ্বকাপের ৬১ বছর পরের ঘটনা।

দেশে দেশে এই খেলার অর্থায়ন এবং উন্নতির তারতম্য রয়েছে এবং বিষয়টি পুরুষদের খেলার সাথে মেয়েদের ফুটবলের ঐতিহাসিকভাবে বিশাল এক গুণগত বৈষম্য তৈরি করেছে ।যদিও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা সমান।

ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্পোর্ট ইকনোমিকস, ফিন্যান্স এবং ম্যানেজমেন্টের লেকচারার ডক্টর নিকোলাস স্কেলস, ১৯৯০ সাল থেকে নারী এবং পুরুষ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর বিশ্লেষণ করে আসছেন প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য খুঁজে বের করতে।

১৯৯০ সালের পুরুষ ফুটবলের টুর্নামেন্ট এবং ১৯৯১ সালের নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের সম্পূর্ণ ভিন্ন মূল্যবোধ ছিল: ৯০% পুরুষদের এবং ৬৪ %ছিল নারীদের জন্য।

যাইহোক, এই চিত্র ২০১৪ এবং ২০১৫ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে খুবই আলাদা: ৮৭% পুরুষদের জন্য এবং ৮১ % নারীদের জন্য।

"আমার গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে যে, ঐতিহাসিকভাবে নারীদের বিশ্বকাপ সবসময়ই পুরুষদের তুলনায় কম ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই বৈষম্য যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।

প্রতিপক্ষের দক্ষতা

এটা হয়তো সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়: কখন একটি গোল সবচেয়ে মূল্যবান?

এর উত্তর নির্ভর করবে অনেক গুলো বিষয়ের ওপর যার মধ্যে আছে সময়, ফলাফল এবং প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তার বিষয়।

মিরোস্লাভ ক্লোসার সমালোচকরা উদাহরণ হিসেবে ২০০২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের কথা স্মরণ করবেন নিশ্চয়ই, যে ম্যাচে ৮-০ গোলের ব্যবধানে জিতেছিল জার্মানি। এবং সেই টুর্নামেন্টে তার বাকি দুটি গোল এসেছিল আয়ারল্যান্ড এবং ক্যামেরুনের মত দলের বিপক্ষে।

কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি জার্মানির জয়ে ভূমিকা রেখেছেন যেমন নক-আউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে (২০০৬ এবং ২০১০), ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (২০১০) এবং ব্রাজিলের বিপক্ষে (২০১৪)।

কিন্তু নারীদের খেলায় মার্তাও অনেকগুলো টুর্নামেন্টে যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিধর দেশগুলোর বিপক্ষে গোল করেছেন, যে দলটি এ পর্যন্ত প্রতিটি নারী বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে।

শেষ ষোলোর লড়াইয়ে যদিও ফ্রান্সের কাছে হেরে গেছে ব্রাজিল।

তবে কোনও কোনও বিশ্লেষক ক্লোসা এবং মার্তার তুলনাকে সহজভাবে নিচ্ছেন না।

শিক্ষক স্কেলস বলেন, "আমি মার্তা এবং ক্লোসার এই তুলনার সমর্থক নই, কারণ তাদের দুজনের মদ্যে এই তুলনা সত্যিকারেই কঠিন। খেলাগুলোর সংখ্যা এবং পিচের ওপর সময় অতিবাহিত হওয়ার বিষয়টি আরও বিশদভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, খেলাগুলো ভারসাম্যপূর্ণ ছিল কিনা এবং বিভিন্ন খেলায় কখন গোলগুলো হয়েছে সেসবও পর্যবেক্ষণ করতে হবে"।

তবে এই নিবন্ধের জন্য এসব বিষয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে যাচাই করা সম্ভব নয় কিন্তু একটি দিকে মার্তা এগিয়ে ক্লোসার দিক থেকে, সেটি হল ব্যক্তিগত সম্মাননা প্রাপ্তি।

কখনোই বিশ্বকাপ জয় করতে না পারলেও, ছয়বার বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মার্তা। তবে ক্লোসা যেটা কখনোই পারেননি।একদিকে ক্রিকেট প্রেমীরা যেখানে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে মাতোয়ারা, ঠিক সেসময়ই ফুটবল বিশ্বের সমর্থকরা মগ্ন ফিফা নারী ফুটবল বিশ্বকাপের একেকটি রোমাঞ্চকর ম্যাচ নিয়ে। ফ্রান্সে চলছে নারী ফুটবল বিশ্বকাপের আসর এবং দলগুলোর মধ্যে এখন চলছে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াই।