পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা চরম নির্যাতনের শিকার : ইউরোপীয় পার্লামেন্টের রিপোর্ট

আসিয়া বিবির ফাঁসির দাবিতে পাকিস্তানে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসিয়া বিবির ফাঁসির দাবিতে পাকিস্তানে বিক্ষোভ

পাকিস্তানে খ্রিষ্টান, শিখ, হিন্দু বা আহমদিয়াদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যে কী চরম দুর্দশা ও নির্যাতনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তা নিয়ে একটি তীব্র সমালোচনামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা।

বাস্তব জীবন থেকে একের পর এক উদাহরণ তুলে ধরে তারা দেখিয়েছেন, কীভাবে সেখানে সংখ্যালঘু সমাজের নারী বা বাচ্চা মেয়েরা পর্যন্ত ধর্ষণ ও অপহরণের শিকার হচ্ছেন। তাদের প্রতিনিয়ত খুনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হওয়ার কারণে তাদের ওপর নানাভাবে বৈষম্য করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মদতেই।

পাশাপাশি মন্তব্য করা হয়েছে, সুন্নি মুসলিম-গরিষ্ঠ পাকিস্তানি সমাজ এই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হিংসা, গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ কিংবা জোর করে ইসলামে ধর্মান্তর করে চলেছে নির্বিচারে।

ব্রাসেলসে সোমবার প্রকাশিত এই রিপোর্টটি সংকলন করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পাঁচজন সদস্য - আলবার্তো সিরিও, ফুলভিও মার্তুসিয়েলো, রিজার্ড জারনেকি, ইনড্রেক ট্যারান্ড এবং হেইনজ কে বেকার।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন বন্ধ না-হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে পাকিস্তানকে দেওয়া যাবতীয় আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার কথা ভাবতে বাধ্য হবে, স্পষ্ট ভাষায় সেই হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে ইসলামাবাদকে।

দিনকয়েক আগেই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫১জন সদস্য পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে চিঠি লিখে তার দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করার আর্জি জানিয়েছিলেন।

পাকিস্তানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয়

সেই চিঠিতেও প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরে বলা হয়েছিল এই পরিস্থিতির অবসান না হলে পাকিস্তান যেমন ইউরোপ থেকে পাওয়া সব ভর্তুকি হারাবে, তেমনি ইউরোপ পাকিস্তানের বাণিজ্য-সুবিধাও প্রত্যাহার করার কথা বিবেচনা করবে।

সেই চিঠির মাত্র দিনদশেকের মধ্যে নতুন এই রিপোর্ট পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বস্তুত ইউরোপীয় এমপি-দের সংকলিত ওই রিপোর্টে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা যেমন মর্মান্তিক, তেমনি চূড়ান্ত অমানবিক।

মাত্র বারো বছরের নাবালিকা মেয়ে বর্ষার কথাই যেমন ধরা যাক।

পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের তান্দো আল্লাইয়ার জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের এই বাচ্চা মেয়েটিকে নিজের বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে।

বর্ষার বাবা শিবা যখন স্থানীয় থানায় মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে অভিযোগ জানাতে যান, তখন তদন্তের আশ্বাস দিয়ে পুলিশ তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

পরদিন তাকে জানানো হয় থানায় এসে কোনও লাভ নেই, কারণ তার মেয়ের তখনও কোনও খোঁজ মেলেনি।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ওই রিপোর্টের প্রচ্ছদ

ছবির উৎস, European Parliament

ছবির ক্যাপশান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ওই রিপোর্টের প্রচ্ছদ

১১ সেপ্টেম্বর পুলিশ বর্ষার বাবাকে জানায় তার মেয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম নিয়েছে এবং তার নতুন নাম হল সায়রা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রমাণ হিসেবে তাকে একটি 'সার্টিফিকেট'ও ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বর্ষার পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস, মুহাম্মদ আয়ুব জান ফারুকি নামে স্থানীয় একজন মুসলিমই তাদের নাবালিকা মেয়ের অপহরণ, ধর্ষণ ও জোর করে ধর্মান্তরের জন্য দায়ী।

বর্ষার ধর্মান্তরণের 'সার্টিফিকেটে'ও এই মুহাম্মদ আয়ুব জান ফারুকির নাম ছিল।

মেয়েটির পরিবার যখন ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে বর্ষাকে হাজির করানোর দাবি জানায়, তখনও সে ছিল অনুপস্থিত। এরপর থেকে বর্ষাকে আর কেউ কখনও দেখেনি।

বর্ষার বাবা মনে করেন, মুহাম্মদ আয়ুব জান ফারুকির হাতেই তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

আর তারা সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণে এই ঘটনায় পুলিশ এখনও কারও বিরুদ্ধে কোনও আইনি পদক্ষেপই শুরু করেনি।

ইউরোপীয় এমপি-দের রিপোর্টে শুধু বর্ষাই নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ের মনিকা, শিখ সম্প্রদায়ের হরিন্দর, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সোনিয়া বা অনিলা-র মতো কিশোরী বা নারীদের ওপর চরম নির্যাতনের ঘটনাও বর্ণনা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের করাচিতে একটি হিন্দু মন্দির

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের করাচিতে একটি হিন্দু মন্দির

এদের কাউকে অস্ত্রশস্ত্র ও বন্দুক নিয়ে এসে দুষ্কৃতীরা বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গেছে।

ষোলো বছরের কিশোরী হরিন্দরকে সরকারি হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর দুজন ব্যক্তি ধর্ষণ করছিল - যে দৃশ্য দেখতে পেয়ে যান তার নিকটাত্মীয় মহিন্দার সিং।

তবে পাকিস্তানে এই সব ঘটনায় প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, এমন কি এফআইআর নিতেও অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তান জুড়ে ইসলাম অবমাননা আইনের (ব্লাসফেমি অ্যাক্ট) চরম অপব্যবহার হচ্ছে বলেও এমইপি-রা মন্তব্য করেছেন।

ব্লাসফেমি অ্যাক্টে যাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল আন্তর্জাতিক স্তরে বহুল-আলোচিত সেই আসিয়া বিবি-র কথাও তারা রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টারিয়ানদের মতে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এই চরম বৈষম্যকে কার্যত পাকিস্তানের সংবিধানই বৈধতা দিয়েছে।

তবে এই রিপোর্ট শুধু সংখ্যালঘুদের দুর্বিষহ অবস্থা বর্ণনা করেই থেমে যায়নি, এর প্রতিকার না-হলে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সহায়তা খোয়াতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।