কেন উত্তেজনা বরাকের বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের হাইলাকান্দিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পর সোমবার সকালেও সেখানে কারফিউ বহাল ছিল, জেলার বিভিন্ন এলাকাতে সেনাবাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চও জারি আছে।
গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সেখানে স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন মুসলিম ব্যক্তি নিহত হন, আহত হন দুই সম্প্রদায়েরই আরও অনেকে।
আসামের যে বরাক উপত্যকায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বহু বছর ধরে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিমরা পাশাপাশি বাস করছেন - সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাও সেখানে খুবই বিরল।
কিন্তু কেন সেখানে হঠাৎ এ ধরনের উত্তেজনা মাথাচাড়া দিচ্ছে?
হাইলাকান্দিতে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষের পরই আসামের বিজেপি সরকার সেখানে পরিস্থিতি তদারকির জন্য পাঠায় রাজ্যের বনমন্ত্রী ও দলের বাঙালি নেতা পরিমল শুক্লবৈদ্যকে।

ছবির উৎস, Getty Images
সোমবার বিকেলে তিনি হাইলাকান্দি থেকে বিবিসিকে বলছিলেন, এলাকায় লুটপাট চালানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কিছু লোক ধর্মকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল - আর উত্তেজনার সূত্রপাতও সেখান থেকেই।
পরিমল শুক্লবৈদ্য বলেন, "আসলে এখানে কিছু দুষ্কৃতী ধর্মকে সামনে রেখে দোকান লুট, অগ্নিসংযোগের মতো কাজে লিপ্ত হয়েছিল। গন্ডগোল বাঁধিয়ে দিয়ে লুঠতরাজ চালানোটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।"
"অবশ্যই তাদের পেছনে কিছু ক্ষমতাশালী লোকের মদত ছিল - আর সেই মদতদাতারা ধর্মীয় পরিবেশটাকেই পুঁজি করেছিল।"
"তারা ভেবেছিল শুক্রবার নামাজের পর যদি একটা 'সিচুয়েশন' তৈরি করা যায় তাহলে অবশ্যই কিছু লোকের মুনাফা হবে।"
কিন্তু সেই 'সিচুয়েশন' নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াতেই পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয় বলে বনমন্ত্রী জানাচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
পুলিশের ওই গুলি চালনাকে খোলাখুলি সমর্থন করছেন স্থানীয় বিজেপি নেতারাও। তারা বলছেন, "মসজিদ থেকে বেরিয়ে কেউ যদি দোকানপাটে হামলা চালায় তাহলে পুলিশ তো বসে বসে দেখবে না।"
তবে ঘটনা হল, বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি-কাছাড় বা শিলচরে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ বহু বছর ছিল না।
আসামে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা সমিতির উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরী মনে করেন, তিন বছর আগে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সেই পরিবেশ বিষিয়ে যাচ্ছে।
মি চৌধুরীর কথায়, "বরাক ভ্যালিতে কিন্তু হিন্দু-মুসলিম টেনশন বহুকাল ছিল না। এককালে অবশ্য হত, একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে অনেকবারই হয়েছে, কিন্তু সেসব ইতিহাসও হয়ে গেছে।"
"কিন্তু ইদানীং এই সরকার আসার পরই দেখছি সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের মদতেই কিছু লোক বাড়াবাড়ি শুরু করেছে - যাদের হিন্দু বা মুসলিম কিছুই বলা উচিত নয়, তারা হল মিসক্রিয়্যান্ট বা দুষ্কৃতকারী।"

ছবির উৎস, Getty Images
"সমস্যা হল যদি মুসলিম দুষ্কৃতীরা কোনও কান্ড ঘটায় তাহলে আমরা মুসলমানরা নীরব থাকি। আবার হিন্দু দুষ্কৃতীরা কিছু করলে হিন্দুরা চুপ থাকেন," বলেন হাফিজ রশিদ চৌধুরী।
তবে হাইলাকান্দির ঘটনার পর যেভাবে দুই সম্প্রদায়ের নেতারা এগিয়ে এসে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তাতে কিছুটা আশার আলোও দেখছেন তিনি।
বরাক উপত্যকার শিলচর থেকে নির্বাচিত এমপি ও কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র সুস্মিতা দেব আবার বিবিসিকে বলছিলেন হাইলাকান্দির ঘটনা যত না সাম্প্রদায়িক - তার চেয়েও বেশি পুলিশ-প্রশাসনের ব্যর্থতা বলেই তার ধারণা।
তার কথায়, "আসলে যে কোনও ধর্মের মানুষের জন্যই বরাক ভ্যালি কিন্তু খুব শান্তিপূর্ণ এলাকা। তবে তারপরও সব জায়গাতেই কিছু সমস্যা তৈরির এলিমেন্ট তো থাকেই!"
"হাইলাকান্দির ঘটনায় আমি বলব যখন নমাজ পড়ার সময় মুসলিমদের মোটরসাইকেলের সিট ছেঁড়ার ঘটনা ঘটল, তখন তিনদিনেও কেন অপরাধীদের ধরা গেল না?"

ছবির উৎস, Getty Images
"যদি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ অ্যারেস্ট করতে পারত, তাহলে প্রথমেই তো পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যায়। অথচ দেখা গেল কারফিউর পরও হাঙ্গামা হচ্ছে - তাহলে এটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যর্থতা ছাড়া আর কী?"
তবে বাকি ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বরাক উপত্যকাতেও যে সাম্প্রদায়িকতার আঁচ লাগছে তা স্বীকার করতে তার দ্বিধা নেই।
"গত পাঁচ বছরে পুরো দেশই সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলছে। এই ধরনের পরিবেশে কমিউনাল পার্টির লাভ হয়, আর ক্ষতি হয় সেকুলার পার্টিগুলোর - কাজেই বরাকেও সেই চেষ্টা হচ্ছেই", বলছিলেন সুস্মিতা দেব।
এদিকে হাইলাকান্দির পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে, নতুন করে আজ কোনও সংঘর্ষেরও খবর নেই।
তবে বরাকের বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিমের সহাবস্থান যে আগের মতো সহজ ও স্বাভাবিক থাকছে না সেই ইঙ্গিতও কিন্তু স্পষ্ট।








