গ্রামীণফোনের নিষেধাজ্ঞা: বিটিআরসি কার্যকরের ১৯ দিনের মাথায় পিছু হটলো

গ্রামীণ ফোন নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে

ছবির উৎস, গ্রামীণফোন

ছবির ক্যাপশান, গ্রামীণ ফোন নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

গ্রামীণফোনকে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপি ঘোষণা করে দেয়া নির্দেশনাগুলো কার্যকরের ১৯ দিনের মাথায় প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন বা বিটিআরসি।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় এই টেলিকম কোম্পানিকে এসএমপি ঘোষণা করেছিলো বিটিআরসি। পরে গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি এসএমপির ক্ষেত্রে করণীয় বা বর্জনীয় বেশ কিছু বিষয় উল্লেখ করে গ্রামীণফোনকে চিঠি দেয়া হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিলো টেলিযোগাযোগ খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানটির একচ্ছত্র ব্যবসায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখা।

তবে তা পহেলা মার্চ থেকে কার্যকরের ১৯ দিনের মাথায় গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়েছে, আগের নির্দেশনাগুলো প্রত্যাহার সম্পর্কিত বিটিআরসির চিঠি তারা পেয়েছে।

কী ছিল আগের নির্দেশনায়?

বিটিআরসি গত ফেব্রুয়ারিতে যে নির্দেশনা দিয়েছিল সেখানে বলা হয়েছিলো গ্রাহকের জন্য গ্রামীণের লকিং পিরিয়ড হবে তিন মাসের বদলে একমাস আর প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে কোনো স্বতন্ত্র ও একক স্বত্বাধিকার চুক্তি করতে পারবেনা।

এছাড়া আর কোয়ালিটি অফ সার্ভিস বা সেবার মানের বিষয়ে মাসে কল ড্রপের পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ দুই শতাংশ।

আর কোনো ধরণের কোনো মার্কেট কমিউনিকেশনস অর্থাৎ মার্কেটিং সম্পর্কিত কোনো প্রচার করতে পারবেনা কোনো মাধ্যমেই।

মার্কেট কমিউনিকেশনস বলতে বোঝানো হয়েছিল যে কোনো মাধ্যমে মার্কেটিং সম্পর্কিত কোন প্রচার প্রচারণা চালানো যাবেনা। যেমন -অফার বা প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়া যাবেনা। এমনকি এসএমএস করে গ্রাহকদের যেসব অফার দেয় গ্রামীণ সেটিও আর করা যাবেনা।

বিটিআরসি মুখপাত্র জাকির হোসেন খান তখন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "আমরা একটা মার্কেট ব্যালেন্স করার জন্য, বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতকে সুশৃঙ্খল, প্রতিযোগিতামূলক ও সবার জন্য সমান করার জন্য এ পদক্ষেপ নিয়েছি"।

নির্দেশনা লঙ্ঘন হলে বিটিআরসি আইন অনুযায়ী জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রাখে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরো পড়ুন:

বিটিআরসির নতুন চিঠি

ছবির উৎস, বিটিআরসি

ছবির ক্যাপশান, বিটিআরসির নতুন চিঠি।

নতুন করে ২০ নির্দেশনা সম্পর্কে বক্তব্য চায় বিটিআরসি

এর আগে বিটিআরসি বিবিসিকে বলেছিলো যে তাদের নির্দেশনাগুলো পহেলা মার্চ থেকে কার্যকর হবে। আর নতুন করে তারা চিঠি প্রত্যাহারের চিঠি দিলো ১৯শে মার্চ।

চিঠিতে বলা হয়েছে, "...গত ১৮-০২-২০১৯ তারিখ জারিকৃত নির্দেশনা পত্র দুটি বাতিল করত: প্রত্যাহার করা হলো।"

তবে ১৯শে মার্চের চিঠিতে আগের নির্দেশনা বাতিল করলেও নতুন করে ২০টি বিষয়ে গ্রামীণফোনের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে এক বা একাধিক বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হবে।

এসব বিষয়ের মধ্যে আছে ভয়েস ট্যারিফ, এমএনপি লকড পিরিয়ড, তরঙ্গ মূল্য, অবকাঠামো শেয়ারিংর মতো বিষয়গুলোও।

এসব বিষয় গ্রামীণফোনের বক্তব্য থাকলে সেটি কমিশনকে জানাতে ১৫ দিনের সময় দেয়া হয়েছে।

বিটিআরসি মুখপাত্র জাকির হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গ্রামীণেফোনকে এসএমপি ঘোষণা বহাল আছে।

"আগে চিঠি প্রত্যাহার করে নতুন করে চিঠি দেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রবিধান মোতাবেক পরবর্তীতে নির্দেশনাগুলো আসবে।"

কেনো পিছু হটল বিটিআরসি?

বিটিআরসি বলছে, আইনি কিছু কারণে তারা আগের চিঠি প্রত্যাহার করে নতুন চিঠি দিয়েছে।

গ্রামীণফোনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিটিআরসির চিঠি পাওয়ার পর তারা বিষয়টি নিয়ে আদালতে গিয়েছিলেন।

তাদের বক্তব্য ছিলো যে নিয়মানুযায়ী নির্দেশনা দেয়ার আগে যে সময় দেয়ার কথা ছিলো সেটি তখন গ্রামীণফোনকে দেয়া হয়নি।

বিটিআরসি মুখপাত্র জাকির হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, আইনি কাঠামো আর শক্তিশালী করতেই আগের চিঠি বাতিল করে নতুন চিঠি দেয়া হয়েছে গ্রামীণফোনকে।

গ্রামীণফোনকে দেয়া বিটিআরসিরি চিঠির একাংশ

ছবির উৎস, বিটিআরসি

ছবির ক্যাপশান, গ্রামীণফোনকে দেয়া বিটিআরসিরি চিঠির একাংশ।

গ্রামীণফোন কেনো এসএমপি ঘোষণা করা হয়েছিলো কেনো?

বাংলাদেশে টেলিকম খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। সঙ্গত কারণেই গ্রাহক সংখ্যা ও রাজস্বের দিক থেকেও তারাই এগিয়ে আছে।

টেলিযোগাযোগ খাতে কেউ একচ্ছত্র ব্যবসা মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে। আর সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্যই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বিটিআরসি।

এর অংশ হিসেবেই গত নভেম্বরে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা (এসএমপি) প্রবিধান ঘোষণা করে বিটিআরসি।

ওই প্রবিধানের ৭/১১ ধারা অনুযায়ী, তিনটি নিয়ামকের একটি যদি ৪০ ভাগের বেশি থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এসএমপি ঘোষিত হবে।

নিয়ামক বা ক্যাটাগরি তিনটি হলো- গ্রাহক, অর্জিত রাজস্ব ও তরঙ্গ।

এরপর গত ১০ই ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোন বা জিপি কে এসএমপি ঘোষণা করা হয়, কারণ জিপির গ্রাহকসংখ্যা মোট গ্রাহকের ৪০ ভাগের বেশি।

এছাড়া অর্জিত রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও বাজারের মোট রাজস্বের ৪০ ভাগের বেশি এই কোম্পানিটির।

তবে তরঙ্গ ব্যবহারের দিক থেকে কোনো কোম্পানিই ৪০ভাগ অতিক্রম করতে পারেনি। তাই গ্রাহক ও রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে এসএমপি ঘোষণা করা হয় গ্রামীণফোনকে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংযোগ আছে ১৫ কোট ৩০ লাখের মতো এবং এর মধ্যে ৪৬ শতাংশই গ্রামীণফোনের। আর মোট রাজস্বের ৫০ ভাগেরও বেশি নরওয়ের এই কোম্পানিটির।

নতুন চিঠির বিষয়ে গ্রামীণ ফোনের বক্তব্য

গ্রামীণ ফোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ হাসান বিবিসি বাংলাকে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠিয়েছেন।

ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "গ্রামীণফোন এর উপর আরোপিত এসএমপি নির্দেশনাসমূহ প্রত্যাহার করায় বিটিআরসিকে স্বাগত জানাই।"

"গ্রামীণফোন বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে। সর্বোত্তম টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাব, যা সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: