বাংলাদশে সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকানোর কমিটির প্রধানের পদে শাজাহান খান কেন?

- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে সরকার যে কমিটি করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঐ কমিটিতে শাজাহান খানের নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা, বিদ্রূপের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কারণ সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে মি: খানের নানা মন্তব্য বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে ।
"সড়কে বিশৃংখলা বা দুর্ঘটনার ব্যাপারে প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধার সৃষ্টি করেছেন যিনি, তার হাতেই কেন এই দায়িত্ব দেয়া হলো?" এ প্রশ্ন করেছেন একজন বিশ্লেষক। সংসদেও একজন এমপি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে, সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের হাতে অনেক সুপারিশ থাকার পরও এখন আবার নতুন একটি কমিটি কেন গঠন করা হলো - তা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন একজন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।
বিবিসি বাংলায় এ সম্পর্কিত আরো খবর:

গত বছর ঢাকায় বাসের চাপায় দু'জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল গত বছর। সে সময় শাজাহান খান হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া দেয়ার পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।সেজন্য তাঁকে দু:খপ্রকাশও করতে হয়েছিল।
এর পর সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে তাঁর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করার পর আবার মি. খানকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
রাজধানীর বনানী এলাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা হচ্ছিল।
তারাও গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তারা এমন কমিটি গঠনের জন্য সরকারের আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
এই শিক্ষার্থীদের একজন বলছিলেন, "সড়কে সত্যিকার সমাধান চাইলে বিতর্ক এড়াতে শাজাহান খানকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্বে দিতে পারতো।"
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
আরেকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য হচ্ছে, এই কমিটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বা কতটা সঠিকভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবে, এসব প্রশ্ন থেকে যায়।"
এই কমিটির প্রধানকে ঘিরে বিতর্ক সংসদ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম সংসদে প্রশ্ন তোলেন যে, এই কমিটি দিয়ে সড়কে নিরাপত্তা দেয়া কতটা সম্ভব হবে? এমন কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিরাপদ সড়কের ইস্যুতে গুরুত্ব না দেয়া বা কারও দায়িত্ব এড়ানোর বিষয় আছে কিনা, এসব প্রশ্নও তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুলতানা কামাল বলছিলেন, সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সড়ক এবং পরিবহন মন্ত্রণালয়ের।
সেখানে এ সম্পর্কিত কমিটির দায়িত্ব অন্য কাউকে দেয়ার বিষয়টিও সন্দেহ তৈরি করে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
"সবার মনে খটকা লেগেছে যে, এতদিন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থেকে সবার মনে দৃঢ় ধারণা যে, সড়কে বিশৃংখলা বা দুর্ঘটনার ব্যাপারে প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধার সৃষ্টি করেছেন যিনি, এখন তার হাতেই কেন এই দায়িত্ব দেয়া হলো, সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়," - বলেন সুলতানা কামাল।

ছবির উৎস, AFP
গত বছর ঢাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন একটা বড় ধাক্কা ছিল।
এরপরও সড়কে অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ বাড়ছেই এবং দুর্ঘটনা কমেনি।
যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী একটি বেসরকারি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত বছর সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি বলে সংগঠনটি বলছে।
এ বছরেও প্রথম এই দেড় মাসে বেশ কয়েকটি সড়ক দুঘটনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশ্লেষকরা নতুন করে সুপারিশ তৈরির এই পদক্ষেপ বা কমিটি গঠন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শামসুল হক বলছিলেন, সরকারের কাছে বহু সুপারিশ আছে, সেগুলোই বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
"অনেক কমিটি হয়েছে, আমিও কয়েকটা কমিটিতে ছিলাম। ফলে সড়কে সমস্যা এবং করণীয় সম্পর্কে সরকারের কাছে সব তথ্য আছে। এর কোন ঘাটতি নেই। ঘাটতিটা হচ্ছে, এসব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।"
সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়নি। তবে সংসদে তিনি বলেছেন, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে সড়ক পরিবহন খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছেন। তার সেই ভূমিকার বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, এই কমিটি সড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
"শাজাহান খানকে এই দায়িত্ব দেয়ার পিছনে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। যেমন ধরুন, সড়ক পরিবহনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে হলে এই খাতে যারা শ্রমিক আছে,তাদের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ আছে, তাকে বাদ দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। একারণেই হয়তো এই দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছে।"
এই ইস্যুতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তিনিও সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন।
তার বক্তব্য হচ্ছে, "এই কমিটিতে শাজাহান এককভাবে নয়, কমিটি ১৫ জন সদস্য মিলে সুপারিশ ঠিক করবে। সেখানে তিনি কোন সমস্যা দেখেন না।"








