ভারতের কাশ্মীর ঘটনার জের: যুদ্ধের বিরোধিতা করে পশ্চিমবঙ্গে অপমান আর হেনস্থার শিকার অনেকে

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে আত্মঘাতী হামলায় চল্লিশ জনেরও বেশি ভারতীয় আধা-সেনার মৃত্যুর পর গত কয়েকদিনে যারা সোশ্যাল মিডিয়াতে 'যুদ্ধবিরোধী' পোস্ট দিয়েছেন, এমন অনেকের বিরুদ্ধেই সংঘবদ্ধ জনতা হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গেও বেশ কয়েকটি ঘটনাতে এমন অনেককে ভারতের জাতীয় পতাকা মুড়িয়ে রাস্তায় ঘোরানো হয়েছে, কিংবা 'ভারতমাতা কি জয়' স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

এমন কী অনেককে দেওয়া হচ্ছে ধর্ষণ বা খুনের হুমকিও।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও এদিন অভিযোগ করেছেন বিজেপি ও আরএসএসের লোকজনরাই পাকিস্তান-প্রেমের অভিযোগ এনে এই সব হামলা চালাচ্ছে - যদিও বিজেপি নেতৃত্ব তা অস্বীকার করছেন।

বস্তুত ভারতের অন্যতম প্রগতিশীল রাজ্য বলে পরিচিতি পশ্চিমবঙ্গেও গত আটচল্লিশ ঘন্টাতে দেশবিরোধিতার অভিযোগ এনে যত হামলা চালানো হয়েছে, তা প্রায় নজিরবিহীন।

দুর্গাপুরে কৃষ্ণেন্দু সেনগুপ্ত নামে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা জীবন বিমা নিগমের এক কর্মীকে ভারতবিরোধী পোস্ট করার অভিযোগে সাসপেন্ড পর্যন্ত করা হয়েছে।

কোচবিহারের অনীক দাস নামে এক যুবক ফেসবুকে লিখেছিলেন তিনি যুদ্ধ সমর্থন করেন না - তাকে ক্ষুব্ধ জনতা ঘিরে ধরে 'পাকিস্তান মুর্দাবাদ' স্লোগান দিতে বাধ্য করেছে।

ঘটনাস্থলে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয় কিছু লোকজন অনীকের ওপর চড়াও হয়ে কৈফিয়ত দাবি করতে থাকেন, তিনি কেন ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কথা বলেছেন?

ওই যুবক বলার চেষ্টা করছিলেন, তিনি শুধু এটুকুই জানাতে চেয়েছিলেন উগ্র দেশপ্রেমের নামে যা সব বলা হচ্ছে তিনি তা সমর্থনও করেন না, আবার বিরোধিতাও করেন না।

কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত না-করে জনতা তার জামাকাপড় খুলিয়ে হাতে ভারতের তেরঙা পতাকা ধরিয়ে দেয়। তাকে বাধ্য করা হয় 'হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ' ও 'পাকিস্তান মুর্দাবাদ' স্লোগান দিতে।

একই রকম ঘটনার খবর পাওয়া গেছে শিলিগুড়ি, শ্রীরামপুর বা পশ্চিমবঙ্গের আরও নানা জায়গা থেকেও।

হাবড়াতে অর্ণব রক্ষিত নামে একজন সতেরো বছরের ছাত্র তার মিছিলের ছবি ফেসবুকে দিয়ে পুলিশের হাতে আটক পর্যন্ত হয়েছেন।

অর্ণবের প্রতিবেশী শম্ভু সরকার বিবিসিকে বলছিলেন, "ওদের সংগঠন একটা মিছিল বের করেছিল - যাতে অর্ণবের হাতে ধরা একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল পুলওয়ামার শহীদদের প্রতি যেমন, তেমনি কাশ্মীরিদের প্রতিও আমাদের সমবেদনা আছে।"

"সেই ছবি ফেসবুকে দেওয়ার পরই কিছু লোকজন ওর বাড়িতে চড়াও হয়ে দাবি করতে থাকে ওই পোস্ট মুছে ফেলে ওকে ক্ষমা চাইতে হবে।"

"ওদের করা এফআইআরের ভিত্তিতেই পুলিশ গতকাল অর্ণবকে হেফাজতে নেয়। পরে আজ আবার ওকে জুভেনাইল হোমে পাঠানো হয়েছে", বলছিলেন তিনি।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এদিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, বিজেপি ও আরএসএসের নেতা-কর্মীরাই পাকিস্তান-প্রেমের মিথ্যা অভিযোগ এনে কিছু মানুষকে দেশদ্রোহী সাজাতে চাইছে।

তিনি বলেন, "এই রাজ্যের আরএসএস নেতারাও মেসেজ ছড়াচ্ছেন - আমার কাছেও যার কপি এসেছে - যে পুলওয়ামার ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে যেমন শাস্তি দিতে হবে, তেমনি দেশের ভেতর লুকোনো পাক-প্রেমীদেরও খুঁজে বের করতে হবে।"

"তো এই পাক-প্রেমী বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে? আরএসএস, বিজেপি আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাইরে ভারতে যারা আছেন তাদের সবাইকে কীভাবে পাকিস্তান-প্রেমী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে?"

"আমি তো বলব পাকিস্তানের লোকই যদি পুলওয়ামার ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তাহলে তোমরা তাদের তা করতে দিলে কেন?"

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ খারিজ করে বলছেন, জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই।

তিনি বলেন, "বিজেপি ও আরএসএস একটি জাতীয়তাবাদী শক্তি। ফলে তাদের লোকজনই যে জাতীয় পতাকা নিয়ে পথে নামবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। মুখ্যমন্ত্রী কেন নামছেন না, ওনার কীসের কষ্ট - বরং সেটাই আমাদের প্রশ্ন!"

"রাষ্ট্রের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সুরে গলা মেলানো কি কোনও অপরাধ না কি? কোথাও কি নিষেধাজ্ঞা আছে আরএসএসের লোকরা পথে নামতে পারবে না? ওরা বেরিয়েছে, ঠিক করেছে", বলছেন দিলীপ ঘোষ।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বিভাগের প্রধান অনুজ শর্মা এদিন বিকেলে জানান, রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকেই দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে - আর পুলিশ এগুলো ঠেকাতে কড়া ব্যবস্থা নেবে।

তবে পুলওয়ামার ঘটনার জেরে কোনটা দেশপ্রেম আর কোনটা নয় - তাকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গেও যে জনমতে পরিষ্কার বিভক্তি দেখা যাচ্ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।