নাইকির জুতোয় “আল্লাহু” এবং আরো পাঁচটি লোগো বিতর্ক

ছবির উৎস, Change.org
যেকোন লোগোর নকশা করার আগে প্রচুর গবেষণা করতে হয়, ঢালতে হয় অনেক অর্থ।
কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিভাবে এই কাজ অনেক সময় উল্টো ফলাফল বয়ে আনতে পারে, যেটা দেখা গেছে নাইকি'র সর্বশেষ পণ্যকে ঘিরে বিতর্কের ক্ষেত্রে।
ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক এই কোম্পানি কিছু মুসলমানের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের সম্মুখীন হয়েছে, কারণ তাঁরা দাবি করছে যে নাইকি'র নতুন জুতোর নিচ বা সোল এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যার সঙ্গে আরবীতে লেখা "আল্লাহ" শব্দটির সাদৃশ্য রয়েছে।
নাইকির নতুন ট্রেইনার 'এয়ার ম্যাক্স ২৭০' বাজারে ছাড়ার পর দুই সপ্তাহ আগে এ ব্যাপারে একটি অনলাইন আবেদনে স্বাক্ষর নেয়া হয় শুরু হয়, এবং ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে ১৭,০০০-এর বেশী স্বাক্ষর যোগাড় হয়েছে বলে জানাচ্ছে ব্লুমবার্গ বার্তা সংস্থা।
এক বিবৃতি প্রকাশ করে নাইকি বলেছে যে লোগোটি 'এয়ার ম্যাক্স' ট্রেডমার্ককে প্রতিনিধিত্ব করছে।
"অন্য যেকোন ধারণাকৃত অর্থ কিংবা বর্ণনা অনিচ্ছাকৃত," নাইকির বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
"নাইকি সব ধর্মকে সম্মান করে এবং আমরা এ ধরণের উদ্বেগকে গুরুত্বের সাথে নিই"।
যেসব ব্রান্ড ডিজাইনারদের এই ধরণের ব্যবসায় অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন যে বাজারে একবার পণ্য বেরিয়ে গেলে আসল অভিপ্রায়ের বাইরেও একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
লন্ডন অলিম্পিকস নিয়ে বিভ্রান্তি
ব্র্যান্ডিং কিভাবে ভুল রাস্তায় যেতে পারে তার একটি উদাহরণ হলো লন্ডন অলিম্পিকস। এই শহরটি ১৯০৮ এবং ১৯৪৮ সালে পৃথিবীর সেরা এই ক্রীড়াযজ্ঞের আয়োজন করেছিল। তাই অলিম্পিকস গেমসের লন্ডনে ফেরা নিয়ে যে ডিজাইনটি বাছাই করা হয়েছিল, সেটিই পরে মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল।
২০০৭ সালে লোগোটি প্রকাশ করার পরই এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়। এটি কিছুটা অপ্রথাগত ছিল, যে ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল বেশ র্যাডিকাল এবং মূল রং হিসেবে যা বেছে নিয়া হয়েছিল - গোলাপী - তা ছিল বেশ অস্বাভাবিক।
অনেকে মুখ টিপে হেসেছেন - তারা ভেবেছেন লোগোটি দেখতে অনেকটা পর্নোগ্রাফির মতো।
ইরানের অলিম্পিক কর্তৃপক্ষ '২০১২' কে ব্যাখ্যা করেছিল "জায়ন" শব্দটির প্রতিরূপ হিসেবে।
এ নিয়ে ব্রিটিশ জনগণ আরো বেশী হৈচৈ শুরু করে যখন গণমাধ্যমে খবর বেরোয় যে ব্র্যান্ড পরামর্শক উলফ ওলিনস-এর ডিজাইন করা লোগোটির পেছনে খরচ হয়েছে ৬ লক্ষ পাউন্ডেরও বেশী।
তবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিকস কমিটি পরে জানিয়েছে যে ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকস ওই বিতর্কিত লোগো নিয়েই পণ্যের বিজ্ঞাপন বাবদ ১২ কোটি ডলার আয় করেছিল - অলিম্পিকসের ইতিহাসে যা ছিল দ্বিতীয় সবোর্চ্চ।

ছবির উৎস, P&G
সাবানে 'শয়তানের কুণ্ডলী'
১৯৮০ দশকে মার্কিন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিষয়ক পণ্য উদপাদনকারী কোম্পানি প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলকে 'শয়তানী'র অভিযোগ মোকাবেলা করতে হয়েছিল।
সে সময়ে তাদের লোগো ছিল একটি দাঁড়িওয়ালা বুড়ো, সঙ্গে ১৩টি তারা - ১৮৫১ সাল থেকে যা কোম্পানিটি ব্যবহার করছিল।
একশো' বছরেরও বেশী পরে একটি গুজব ছড়ায় যে এর সঙ্গে শয়তানের সম্পর্ক রয়েছে, এবং কোম্পানিটি শয়তানে বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলোকে গোপণে অর্থ দিয়েছিল।
এই রটনার একমাত্র কারণ ছিলো যে অতীব কল্পনাশক্তির কিছু মানুষ ওই বুড়ো লোকের দাঁড়ি এবং চুলকে শিংওয়ালা শয়তানের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল, আর বলেছিল তারাগুলোর সঙ্গে শয়তানের সংখ্যা হিসেবে পরিচিত '৬৬৬'-এর সংযোগ রয়েছে।
পিঅ্যান্ডজি ১৯৯১ সালে ওই লোগো পরিবর্তন করে। তবে তাদের শেষ হাসিটি ছিল ২০০৭ সালে, যখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি অ্যামওয়ের বিরুদ্ধে এক কোটি ৯০ লক্ষ ডলারের ক্ষতিপূরণের মামলা জেতে - এটা প্রমান হয়েছিল যে অ্যামওয়ে ওই গুজব ছড়ানোর পেছনে ছিল।

ছবির উৎস, University of California
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া
প্রতিষ্ঠানের ইমেজ আধুনিক করার মার্কিন এই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চেষ্টা ভেস্তে গিয়েছিল ২০১২ সালে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা এবং লেটারহেডের জন্য একটি নতুন ট্রেডমার্ক তৈরি করা হয়েছিল যাতে এটিকে বেশ আধুনিক লাগে।
কিন্তু মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা এটিকে ডাকতে শুরু করে 'টয়লেট বোল' হিসেবে, আর পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই প্রতীকটিকে নিয়ে শুরু হয় হাস্যরস।
সুতরাং এটিকে যখন দ্রুতই বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই কেউ খুব একটা আশ্চর্য হয়নি।

ছবির উৎস, Tokyo 2020/Theatre de Liege
অলিম্পিকে কুম্ভীলকবৃত্তি
অলিম্পিককে ঘিরে আরেকটি সুপরিচিত এবং সাম্প্রতিক ঘটনা।
টোকিয়োতে অলিম্পিক হবে ২০২০ সালে। তবে এর অর্গানাজিং কমিটি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রতিযোগিতার লোগো বাতিল ঘোষণা করে - অভিযোগ, এক্ষেত্রে চুরিবিদ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল।
বেলজিয়ামের ডিজাইনার অলিভিয়ের ডেবি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেন এই অভিযোগে যে তাঁর জাপানী সহকর্মী কেনজিরো সানো তাঁরই করা একটি প্রতীক "তুলে" নিয়েছেন। তাঁর দাবি, বছর দুয়েক আগে তিনি বেলজিয়ামের একটি থিয়েটারের জন্য ওই প্রতীকটি তৈরি করেছিলেন।
কেনজিরো এবং টোকিয়ো ২০২০ কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
কিন্তু এক বছর পরেই ওই লোগো বাদ দিয়ে আসায়ো তোকোলোর তৈরি করা নতুন একটি প্রতীক ব্যবহার শুরু করে টোকিয়ো ২০২০ কর্তৃপক্ষ।

ছবির উৎস, Tropicana
বিস্বাদ ফলের রস
২০০৯ সালে বিশ্বখ্যাত ফলের রস প্রস্তুতকারক কোম্পানি ট্রপিকানা তাদের সুপরিচিত কমলার রসের জন্য নতুন একটি লোগো চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের জন্য সেটি শেষ পর্যন্ত বিস্বাদের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের পুরানো লোগো ছিল 'কমলা ফলের মধ্যে একটি স্ট্র', আর নতুন লোগো হিসেবে বেছে নেয়া হয় 'রসভর্তি একটি গ্লাস'।
নিজেদের সবচেয়ে বড় বাজার উত্তর আমেরিকায় নতুন এই লোগোটি পরিচিত করার জন্য কোম্পানিটি লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে।
কিন্তু নতুন প্যাকেট বাজারে আসার পর ভোক্তারা এটি পছন্দ করেনি।
বিক্রি কমে যায় প্রায় ২০ শতাংশ, ফলে খুব বেশী দেরী না করেই ট্রপিকানা তাদের পুরানো লোগোতে ফিরে যায়।
ট্রপিকানার একজন ম্যানেজার পরে স্বীকার করেন যে "আসল প্যাকেটের সঙ্গে ভোক্তাদের যে একটি আবেগের বন্ধন তৈরি হয়েছিল, সেটির তাঁরা অবমূল্যায়ন করেছিলেন"।








