চীন কি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ?

ছবির উৎস, Ministry of Public Security, China
চীনের জনশৃঙ্খলা বিষয়ক পরিচালক লি জিংশেং এর দাবি, চীন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি।
২০১৮ সালে সালে নাকি চীনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে মিস্টার লি এই পরিসংখ্যান ঘোষণা করছেন। ভিডিওটি দশ লাখ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে।
চীন সরকারের এসব তথ্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য? বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে চীন আসলে কতটা নিরাপদ?
অপরাধের পরিসংখ্যান
চীন সরকার বলছে, ২০১২ সাল হতে ২০১৭ সালের মধ্যে চীনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ম্যাকাও এর অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড: জু জিয়ানহুয়া বলেন, "আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ চীনেই হয়তো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। কারণ চীনে আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে অন্যান্য অপরাধের সংখ্যাও কম।"

ছবির উৎস, Getty Images
চীনের এসব পরিসংখ্যানকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেন বিশেষজ্ঞরা। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক বোর্গে বাকেন চীনের পরিসংখ্যান নিয়ে বেশ সন্দিহান।
"এর মধ্যে মিথ্যে আছে, নির্জলা মিথ্যে আছে আর আছে চীনা অপরাধ পরিসংখ্যান। এটি একেবারেই প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। চীনের একেবারে থানা পর্যায় থেকে শুরু করে পুলিশের একেবারে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি করা হয়," বলছেন তিনি।
তবে পরিসংখ্যান যদি অতটা নির্ভরযোগ্য নাও হয়ে থাকে, তারপরও চীনে অপরাধ কম ঘটার কিছু কারণ আছে।
চীনে কারও ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র রাখা বেআইনি। আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করার জন্য চীন সরকার ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে।
কেবল গত বছরই পুলিশ ১ লাখ ৪৬ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে দাবি করা হচ্ছে।
বাকী বিশ্বের অবস্থা
ইউরোপ এবং আমেরিকার অপরাধের পরিসংখ্যান অনেক সহজেই পাওয়া যায়, অন্তত চীনের তুলনায়।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৩১ টি হত্যাকান্ড, ডাকাতি এবং হামলা হয়েছে, যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই তথ্য দিয়েছে এফবিআই।

ছবির উৎস, AFP
ঐ একই বছরে যুক্তরাজ্য এবং জার্মানিতে এ ধরণের অপরাধের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬ হাজার ৩৭৫ এবং ৮ হাজার ৯৩৫টি।
চীনের পরিসংখ্যানের সঙ্গে এসব পরিসংখ্যান হয়তো সরাসরি তুলনা করা যাবে না। কিন্তু এটা বোঝা কঠিন নয়, চীনা গণমাধ্যম কেন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধের খবর ফলাও করে প্রচার করে এবং সেখানে নগরগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ সেটা মনে করিয়ে দেয়।
তবে অনেক দেশেই অপরাধের পরিসংখ্যান যেভাবে সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হয়, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
মানুষ অপরাধের কথা পুলিশকে জানাচ্ছে কীনা এবং অপরাধের সংজ্ঞা কি, সেটার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে অপরাধের পরিসংখ্যান।
চীনা গণমাধ্যমে অপরাধের খবর
চীনের সরকারি ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলিতে প্রতিদিনই কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে সংঘটিত অপরাধের খবর থাকে- গোলাগুলি, যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে ছুরি মারামারি, এরকম খবর।
তবে ব্রডশিট সংবাদপত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে গোলাগুলির খবরগুলিই বেশি প্রাধান্য পায়।
আরও পড়ুন:
এসব খবরের মোদ্দা কথা একটাই- পশ্চিমা দুনিয়া মোটেই নিরাপদ নয়। গত জুলাইতে ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাস থেকে চীনা পর্যটকদের এই বলে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল, তারা যেন পারতপক্ষে রাতের বেলায় একা বাইরে বেড়াতে না যান।
চীন তার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে চায়, তবে একই সঙ্গে আসলে চীন তাদের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতির সুফলের কথা তুলে ধরতে চায়। যদিও বলা হয় এসব নীতির লক্ষ্য নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়া, একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও এর উদ্দেশ্য।
আর চীনে সরকার যেভাবে ব্যাপক নজরদারি চালায়, সেটাও অপরাধের হার কম হওয়ার একটা কারণ।
২০১৫ সালে বেইজিং এর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিলেন, তাদের নগরীর প্রতিটি রাস্তার মোড়ের ওপর তাক করা আছে পুলিশের ক্যামেরা। আর চীনের সরকারী গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ পুরো চীন জুড়ে 'ফেসিয়াল রিকগনিশন' প্রযুক্তি চালু হয়ে যাবে। এই প্রযুক্তি দিয়ে ক্যামেরায় যে কোন মানুষের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্ণিত করা যাবে ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি দিয়ে।
চীনে অপরাধ দমনে এখন এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। গণমাধ্যমে প্রায়শই খবর থাকে কিভাবে এই প্রযুক্তি দিয়ে কোন অপরাধ ঠেকানো গেছে।
রাজনৈতিক চাপ

ছবির উৎস, Getty Images
তবে চীনে রাজনৈতিক চাপের কারণে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অপরাধের পরিসংখ্যান বদলে ফেলা হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
চীনে প্রথমে অপরাধের খবর জানাতে হয় শহরের পুলিশকে, এরপর প্রাদেশিক পর্যায়ে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে।
কোন শহরে যখন অপরাধের হার কমে, তখন সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ে, বলছেন ড: জু জিয়ানহুয়া।
তবে অপরাধের হার সম্পকির্ত পরিসংখ্যানে কিছু গরমিলের কথা উল্লেখ করছেন তিনি।
"যেমন ইমার্জেন্সী হটলাইনে যে পরিমান ফোন কল আসে, তার সঙ্গে সরকারের প্রকাশিত অপরাধের পরিসংখ্যানে অনেক গরমিল চোখে পড়ে। ৯০ শতাংশ ইমার্জেন্সী কলের কোন উল্লেখ নেই অপরাধের পরিসংখ্যানে। যদিও এটা বলা যাবে না যে সব ইমার্জেন্সী কলের ক্ষেত্রেই কোন অপরাধ আসলে ঘটেছিল।"
চীনে অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে হয়তো অনেক প্রশ্ন আছে, কিন্তু এমন একটি ধারণা আছে যে চীনের নগরীগুলো সহিংস অপরাধ থেকে অনেক নিরাপদ।








