সংসদ নির্বাচন: কোন্দলে জর্জরিত দল, কেমন হবে মেহেরপুরের গাংনীর নির্বাচন

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

খুলনা থেকে ট্রেনে চুয়াডাঙ্গা এবং সেখান থেকে সড়ক পথে গাংনী উপজেলা সদরে যাওয়ার সময় গ্রামগুলোতে চোখে পড়েছিলো শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নৌকা প্রতীকের পোস্টার।

রাস্তাঘাটগুলোয় গ্রামবাংলার শ্বাশত রূপ। তবে বাড়িঘরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ছাপ রয়েছে। প্রায়শই চোখে পড়ছিল পাকা দালান।

সাথে থাকা চুয়াডাঙ্গার সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম বলছিলেন যে এখানকার অধিকাংশ মানুষই কৃষক এবং তারা নিজের জমিতে যেমন চাষাবাদ করেন, তেমনি আবার অন্যের জমিতে কাজ করেও অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেন।

এ অঞ্চলটি সবজির জন্য বেশ বিখ্যাত।

মাঠগুলোতে দেখা গেলো একবার ফসল তোলার পর এখন দ্বিতীয় দফায় ফসলের প্রস্তুতি চলছে।

এই গাংনীই একসময় শিরোনাম হতো চরমপন্থীদের কারণে, যদিও গত দেড় দশকে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করলেন স্থানীয়দের অনেকে।

কোন্দলে জর্জরিত দলগুলো

মেহেরপুরের এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিলো মাত্র দু হাজার চারশো ভোটের ব্যবধানে।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন কমপক্ষে এক ডজন করে নেতা, যাদের ঘিরে ওই উপজেলায় দল দুটি নানা উপদলে বিভক্ত দীর্ঘকাল ধরেই।

যদিও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পেয়েছেন স্থানীয় পর্যায়ের দুজন নতুন নেতা। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ কে এম শফিউল আলম বলছেন, "এখন দেখার বিষয় নতুন দুই প্রার্থী কোন্দলকে পাশ কাটিয়ে নিজ দলের সবাইকে কতটা সক্রিয় করতে পারে। তাহলেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এ আসনে"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আওয়ামী লীগের আগের প্রার্থী ছিলেন আব্দুল খালেক। আবার তাকে পরাজিত করে ২০১৪ সালে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন মকবুল হোসেন। তাদের দুজনকেই বাদ দিয়ে এবার মনোনয়ন দেয়া হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ সাহিদুজ্জামান খোকনকে।

অন্যদিকে বিএনপির হয়ে ২০০১ সালে জিতেছিলেন এম এ গণি আর ২০০৮ এ জিতেছিলেন আমজাদ হোসেন। তাদের দুজনকেই বাদ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির একজন সহ সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন।

আইনজীবী নেতা শফিউল আলম বলছেন স্থানীয় এসব হেভিওয়েটদের প্রার্থীরা কতটা কাজে লাগাতে পারেন সেটিই হবে দেখার বিষয়।

গাংনীর নির্বাচনের ইতিহাস

গাংনীতে ১৯৭৩ ও ৮৬ সালের নির্বাচন ছাড়া কখনোই নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হতে পারেনি আওয়ামী লীগ । ২০১৪ সালের বিএনপি-বিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মকবুল হোসেন জিতেছেন, তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।

আবার ২০০১ সালে বিএনপি থেকে যিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি পরে দল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন এলডিপিতে।

পরে অবশ্য আবার বিএনপিতে ফিরে এসেছেন।

আর ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন আমজাদ হোসেন। তিনি দলে আছেন এবং মনোনয়ন চেয়েও পাননি।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী কোন্দল সামাল দিতে পারবেন ?

গত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ খালেক এখন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

এবারের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে আছেন।

তাকে বাদ দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ সাহিদুজ্জামান খোকনকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে মিস্টার খালেক বলেন, "আগে কোন্দলের কারণে এই আসনটি আমরা পাইনি। এবার সেই সমস্যা নেই। সরকারের উন্নয়নের কারণে নৌকার ভোট বেড়েছে। তাই আমরাই পাবো আসনটি"।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

বিএনপি প্রার্থী কোন্দল সামাল দিতে পারবেন?

গাংনীতে বিএনপির দুজন হেভিওয়েট নেতা এম এ গণি ও আমজাদ হোসেন। ২০০১ ও ২০০৮ এর নির্বাচনে তারা জিতেছেন।

কিন্তু এবার তারা মনোনয়ন পাননি।

যদিও তাদের কর্মী অনুসারী অনেক রয়েছেন এলাকায়।

বিএনপি প্রার্থী জাভেদ মাসুদ মিল্টন দাবি করেছেন যে জাতীয় রাজনীতির বাস্তবতায় এখন আর কোন্দল নেই তার দলের নেতাদের মধ্যে।

তিনি বলেন, "এখানকার মানুষ ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে"।

তবে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

তারা বলছেন আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিতেও নেতারা তুমুল কোন্দলে লিপ্ত এবং তাদের বিশ্বাস এ কারণেই দুটি দল থেকেই নতুন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রত্যাখ্যান

বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে বিএনপি প্রার্থী জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলেছেন প্রশাসন ও সরকারি দলের বাধার কারণে তিনি প্রচার কার্যক্রম চালাতে পারছেননা।

কিন্তু এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ খালেক।

তিনি বলেছেন কোন প্রার্থীকে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে কোনো বাধা দিচ্ছে না কেউ।

তবে গাংনীতে প্রায় সর্বত্র নৌকা প্রতীকে পোস্টার চোখে পড়লেও ধানের শীষের পোস্টার কিংবা ব্যানার খুব একটা চোখে পড়েনি।

এবার কেমন হবে ফল?

২০০৮ সালে এ আসনে ভোটের ব্যবধান ছিলো দুই হাজার চারশো।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ কে এম শফিউল আলম বলছেন তার ধারণা এবারের নির্বাচনেও কারও জয় সহজ হবে না।

আওয়ামী লীগ নেতা এম এ খালেক বলছেন এবার তারা সহজেই জয় পাবেন বলে মনে করছেন।

আর বিএনপির জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলছেন, "নির্বাচন কিছুটা সুষ্ঠু হলেও ধানের শীষ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে"।

স্থানীয় সাংবাদিক মাজেদুল ইসলাম মানিক বলছেন নির্বাচনে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরে স্থানীয় কিছু বিষয়ও শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং সেটিও হয়ে উঠতে পারে জয় পরাজয়ের নিয়ামক।

২০০৮ সালের ফল

আমজাদ হোসেন (ধানের শীষ) ৮৬৭৬৮ ভোট

মকবুল হোসেন ( নৌকা) ৮৪২৭৯ ভোট

উদ্বেগ ভোট নিয়ে

যদিও নির্বাচনী এলাকাটির যেখানেই যত ভোটারের সাথে কথা হয়েছে প্রকাশ্যে বলতে না চাইলেও তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি আসলে কেমন হয় তা নিয়েই উদ্বেগ দেখা গেছে।

অবশ্য এ বিষয়ে তারা একমত যে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে মেহেরপুর-২ আসনে একটি জমজমাট লড়াইয়েরই আশা করছেন তারা।

সব প্রার্থীরা : (মেহেরপুর-২)

আলিমুজ্জামান মো:আব্দুল কাদের (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)

মোহাম্মদ সাহিদুজ্জামান (আওয়ামী লীগ)

মোহা: কেতাব আলী (জাতীয় পার্টি)

মো: আলী আকবর (জাকের পার্টি)

মো: জাবেদুর রহমান (বাংলাদেশ মুসলিম লীগ)

মো: জাভেদ মাসুদ (বিএনপি)

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: