আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সংসদ নির্বাচন: গাইবান্ধা ৫ আসনে কেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে?
- Author, ফারহানা পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ডিসেম্বরের শুরুতেই উত্তরবঙ্গের এই জেলায় শীত অনুভূত হতে শুরু করেছে।
ছোট এই উপজেলায় বাজারের মধ্যে একটা বটতলা। সেখানেই সকালের নরম রোদে, চা হাতে অনেকের আলাপের বিষয় নির্বাচন, প্রার্থী, আরো অনেক বিষয়।
এবারেই প্রথমবারের মত ভোটার হয়েছেন আসিফ সাজ্জাদ। নতুন ভোটার হিসেবে তার উৎসাহের কমতি নেই। তবে তার প্রত্যাশা দুইটি।
তিনি বলছিলেন "পূর্বে দেখেছি ভোট দিতে যেয়ে একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে। আমি চাই আমার ভোটটা যেন আমি সুষ্ঠুভাবে দিতে পারি। আরেকটা বিষয় আমাদের একটা ব্রিজ দরকার যেটা দরকার বালাসি এবং বাহাদুরবাদে। যে এমপি-মন্ত্রী হোক না কেন তার কাছে আমাদের এটা প্রাণের দাবি। এটা করলে ফুলছড়ি, সাঘাটার বড় উপকার হবে"।
বটতলার এই চায়ের দোকানের মত দৃশ্য অনেক স্থানে দেখতে পেলাম। বাজারের বটতলা থেকে আমি হেঁটে গ্রামের মধ্যে যাই সেখানকার মানুষের এই নির্বাচনকে ঘিরে কী চিন্তা সেটা জানার জন্য।
একজন গৃহিণী জেসমিন আরা বেগম বলছিলেন সাঘাটায় কোন ভালো স্কুল -কলেজ নেই যেখানে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করে ভালো কিছু করতে পারে।
সংসদ নির্বাচনের ফলাফল: ১৯৯১-২০১৪ (বিজয়ী এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী)
আরো পড়ুন:
তিনি বলছিলেন "এই ফুলছড়ি এবং সাঘাটা খুব অবহেলিত। এখানে একটা ভালো কলেজ নেই। অনেক পরিবারের ছেলেমেয়ের পড়ালেখা এইচএসসির পর শেষ হয়ে যায়। অনেকে বাইরে টাকা দিয়ে পড়াতে পারে না। আমারো ছেলে মেয়ে আছে। তাই আমি চাই এখানে যেন একটা ভালো কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হোক। ছেলেমেয়ের চাকরির দরকার আছে। পড়াশোনা না করতে পারার কারণে সেটা হয়ে ওঠে নি"।
ফুলছড়ি উপজেলাটি অবস্থিত যমুনা নদীর মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। নদী ভাঙ্গন এলাকা হিসেবে পরিচিত।
তাই এখানকার মানুষের একটা বড় দাবী শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি। আমি একটা ধান খেতের পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি অদূরে যমুনা নদী।
ক্ষেতে কাজ করছিলেন বেশ কয়েকজন কৃষক। তাদের একজন খাজা মইনউদ্দিন। তিনি বলছিলেন এই নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে পারলেই অনেকে ভোট দেবে প্রার্থীদের।
তিনি বলছিলেন "পাঁচ বছর আগে শুনেছি এই নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে কাজ হবে কিন্তু এখনো পর্যন্ত কাজ হয়নি। তো যেই প্রার্থী আমাদের এই নদী ভাঙ্গন ঠেকানোর কাজ করবেন আমি তাকেই ভোট দেব। কারণ নদী ভাঙ্গনে আমাদের ফসলি জমি, ঘর-বাড়ি সব বিলীন হওয়ার পথে"।
তবে এই এলাকায় মানুষদের এবারের নির্বাচনে স্থানীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য ত্রিমুখী জটিলতায় পরতে হবে।
কারণ এখানে এবারে শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি নয় ,এখানকার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে জাতীয় পার্টির প্রার্থী।
২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪৩১৮ ভোটে আওয়ামী লীগ জিতে যায়।
সেবার জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশ ছিল। কিন্তু এবারে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা না হওয়াতে জাতীয় পার্টি নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে।
একদিকে বিএনপি অন্যদিকে জাতীয় পার্টি দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে কীভাবে সামাল দেবে আওয়ামী লীগ। শামসুল আরেফিন টিটু ৫ আসনের স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মি. টিটু বলছিলেন "ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার কারণে আসনটা আওয়ামী লীগের ফেভারে যাবে। গতবারের চেয়ে ভালোভাবে আওয়ামী লীগ জিতবে। কারণ জাতীয় পার্টি না থাকলে ভোট গুলো বিএনপির দিকে যেতে পারতো। সেটা এখন আর হবে না। আর প্রার্থী বিচারে আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রার্থী ডেপুটি স্পিকার, আর তিনি স্থানীয় উন্নয়নে কাজ করেছেন"।
এদিকে আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচন করায় নিজেদেরকে শক্তিশালী মনে করছে বিএনপি।
গাইবান্ধার এই আসনটি জাতীয় পার্টি সমর্থিত এলাকা। জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হওয়ার পর তাদের ভোটব্যাংক চলে যায় আওয়ামী লীগের দিকে।
ফলে জয়টা অনেকটা সহজ হয় তাদের জন্য। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তাতে করে বিএনপি মনে করছে এখন তাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ।
কারণ বিএনপির রয়েছে শক্ত প্রার্থী। তেমনটাই বলছিলেন গাইবান্ধার জেলা বিএনপির নেতা শহিদুল ইসলাম।
মি. ইসলাম বলছিলেন "এই এলাকা নদী ভাঙ্গন, চর এলাকা। এর আগের প্রার্থীরা অনেক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কোন কাজ করেনি। কিন্তু এখন মানুষ অনেক সচেতন। আগে আমাদের শক্ত প্রার্থী ছিল না, সব ভোট আওয়ামী লীগ অথবা জাতীয় পার্টিতে গেছে। এবারে তারা দুই ভাবে বিভক্ত আর আমাদের শক্ত প্রার্থী আছে। মানুষ যদি ভোট কেন্দ্র যেতে পারে তাহলে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে"।
তবে মহাজোট থেকে বের হয়ে জাতীয় পার্টির নির্বাচনে দাঁড়ানোটাকে অনেক স্থানীয় নেতা ভালো ভাবে দেখছেন না।
জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতা ইব্রাহিম খলিল বলছিলেন জোট থেকে বের হয়ে তাদের একটু দুর্বল অবস্থা তৈরি হতে পারে। তবে অতীত ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে তিনি নির্বাচনে ভালো একটা লড়াই এর প্রত্যাশা করছেন।
তিনি বলছিলেন "আসনটা জাতীয় পার্টির। বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির ছিলেন একসময়। আবার বিএনপি এবার বেশ জোরে শোরে নেমেছে, সব মিলিয়ে বলতে গেলে জাতীয় পার্টি একটু দুর্বল মনে হতে পারে কিন্তু আমরা আশাবাদী"।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কার্যালয়ের সামনে চলছে এই আলোচনা এবং নির্বাচন কেন্দ্রিক নানা তৎপরতা।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে যে ২৯ টি আসন দেয়া হয়েছে গাইবান্ধা ৫ আসন তার মধ্যে একটি।
এর সঙ্গে রয়েছে ২০০৮ সালের কম ব্যবধানের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস। সব মিলিয়ে এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই হবে, যেখানে আবারো জয়-পরাজয় হয়ত কম ভোটের ব্যবধানে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আসনের প্রার্থীরা হলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফজলে রাব্বী মিয়া, বিএনপির ফারুক আলম সরকার, জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল, এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির যজ্ঞেশ্বর বর্মন।
অন্যান্য খবর: