আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বিশেষ যে কারণে হোটেলে মিলবে আধাগ্লাস পানি
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনেতে সম্পূর্ণভাবে নিরামিষভোজীদের জন্য পরিচিত কালিঙ্গা রেস্তোরাতে এসে বসা মঙ্গেশকর দম্পতিকে রেস্তোরায় কর্মী জানতে চাইলেন "পানি চাই কিনা?"
গৌরীপুজা মঙ্গেশকর বলেন, "আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে সে আমাকে অর্ধেক গ্লাস পানি দিয়ে যায়। এটা দেখে আমি তো বিস্মিত হয়ে গেলাম যে আমার একার সাথেই এমনটা করা হচ্ছে। পরে দেখলাম সে আমার স্বামীর জন্যও অর্ধেক গ্লাস জল ঢেলে দিয়েছে।"
এক মুহূর্তের জন্য, মিসেস মঙ্গেশকার আশ্চর্য হয়েছিলেন যে তার গ্লাসের অর্ধেকটা পূর্ণ না-কি খালি ছিল!
শহরের অনেকগুলো হোটেল বা রেস্তোরায় এভাবেই অতিথিদের সার্ভ করা হচ্ছে কেবল আধা-গ্লাস পানি।
পৌর কর্তৃপক্ষের প্রায় ৪০০রেস্টুরেন্ট পানির ব্যবহার কমাতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ভারতের অনেক শহর যেভাবে পানির সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রমী এই উপায়ে সমস্যাটিকে মোকাবেলার চেষ্টা করে যাচ্ছে পুনে।
পুনে রেস্তোরা এবং হোটেল ব্যবসায়ীদের এসোসিয়েশনের সভাপতি গণেশ শেঠি বিবিসিকে বলেন, পানি সংরক্ষণের জন্য তারা ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমরা কেবল আধা-গ্লাস পানিই দিচ্ছি টেবিলে এবং কেউ না চাইলে সেটা আর রিফিল করা হয়না। তাদের ব্যবহারের পর বেঁচে যাওয়া পানিও কাজে লাগানো হয়। পুন:নবায়নের জন্য পানি শোধনাগারে চলে যায় এবং মেঝে পরিষ্কারে কাজে ব্যবহার করা হয়।
কালিঙ্গাতে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ জন গ্রাহক আসেন এবং কেবল আধা-গ্লাস পানি সার্ভ করার মধ্য দিয়ে রেস্তোরাটি দৈনিক প্রায় ৮০০ লিটার পানি বাঁচাতে পেরেছে।
"প্রতিটি ফোঁটা মূল্যবান এবং যদি ভবিষ্যতের জন্য বাঁচাতে চাই তাহলে এখনই কাজ শুরু করতে হবে"।
৮৩ বছরের পুরনো স্থাপনা পুনা গেস্ট হাউজের মালিক কিশোর সরপোদ্দার জানান তারা যে আধা-গ্লাস পানি দিচ্ছেন শুধু তা-ই নয়, সেটা দিচ্ছেন আগের চেয়ে ছোট আকারের গ্লাসে।
পুনে শহরকে শিক্ষার এবং সংস্কৃতির কেন্দ্র বলা হয় । ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু একে বর্ণনা করেছিলেন, "ভারতের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ"।
৪০ লাখ লোকের শহরটিতে বর্তমানের পানির সঙ্কট তীব্র।
মিস্টার শেঠি বলেন, শহরটিতে সবচেয়ে প্রথম বড় ধরনের পানির অভাব দেখা দেয় দুইবছর আগে।
"ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ এই দুই মাস আমাদের পানির সরবরাহ কমে অর্ধেকে নেমে আসে। দুইদিনে আমরা একবার পানির দেখা পাই"।
সরবরাহ করা পানি কি কাজে ব্যবহার করা যাবে আর কি কাজে করা যাবে না সে বিষয়ে নগর কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশনা জারি রয়েছে।
দুইমাসের জন্য নগররে সমস্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ ঘোষণা হয়েছিল।
শহরটিতে পানিবিহীন হোলি উৎসব উদযাপন করা হয়। ক্লাব এবং ওয়াটার রিসোর্টগুলোতে জনপ্রিয় রেইন ড্যান্স ইভেন্ট এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল এবং সুইমিং পুলগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
পানির অপচয় হচ্ছে কি-না তা তদারকি করা হতো এবং ধরা পড়লে জরিমানা গুনতে হতো।
পুনের পানি সংরক্ষণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কর্নেল শশিকান্ত ডালভি বলেন, "বিষয়টি ছিল খুবই গুরুতর। এই বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ কিভাবে যে সামলাবো আমরা?"
এই বছরের শুরুর দিকে সরকারের রিপোর্টে বলা হয়, ভারত সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে বাজে পানির সংকটে ভুগছে। ৬০০ মিলিয়ন মানুষ এর কারণে কোন না কোনভাবে সমস্যার শিকার।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। সতর্ক করে বলা হয়েছে ২০২০ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি ফুরিয়ে যাবে ২১টি শহরে। মে মাসে জনপ্রিয় পর্যটন শহর শিমলা পানিশূন্য হয়ে যায়। গতবছর ব্যাঙ্গালোর শহর জলহীন হয়ে যাওয়ার খবর আসে।
মহারাষ্ট্র যেখানে পুনে অবস্থিত সেখানে পানির সঙ্কট এবং প্রতিবছর গ্রীষ্মের মৌসুমে জেলার কৃষক, গ্রামবাসী, শহরে বাসিন্দা, বস্তিবাসী, সবার জন্যই শুরু হয় পানির যুদ্ধ।
এবছরও আলোচনা শুরু হয়েছে। আর এখন কেবল শীতের শুরু। অনেক এলাকা এরইমধ্যে তীব্র খরা আর পানির সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে।
এবছর অক্টোবর মাসে পুনের পৌর কর্পোরেশন সবার জন্য ১০% সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়।
কর্নেল ডালভি প্রশ্ন তোলেন "এবছর জুলাইর শেষ পর্যন্ত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে, বাধ পরিপূর্ণ ছিল, সেই পানি কোথায় গেল?
বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকে দোষারোপ করবেন। বন উজাড় করা এবং দ্রুত শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পানির স্বল্পতার প্রধান কারণ। তাছাড়া খাদাখোয়াসালা বাধ পুন:খনন করা হয়নি কখনোই যার ফলে এর পানি-ধারণ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে রোজ।
২০২৫ সালে ভারত হবে বিশ্বে সবচেয়ে জনবহুল দেশ। তাই কর্নেল ডালভি একটি উপায় বের করে দিয়েছেন পানির স্বল্পতা মোকাবেলার জন্য।
লিকেজ বন্ধ করতে হবে, ভূর্গস্থ পানির অতিরিক্ত নিষ্কাশন বন্ধ করতে হবে, ছাদের ওপর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পানির পুন-ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। তা নাহলে এই পানি-স্বল্পতা আরও জটিল রূপ নেবে" তিনি বলেন।
রেস্তোরায় আধা-গ্লাস পানি দেয়াটা কি কেবল একধরনের কৌশল? জানতে চাইলে তিনি বলেন, "মোটেই না। এটা কোনও কৌশল নয়, এটা একটা দারণ আইডিয়া।"