ভারতের উত্তর প্রদেশে গো-রক্ষকদের সহিংসতা, খুন হলেন পুলিশ কর্মকর্তা

সুবোধ কুমার সিং

ছবির উৎস, COURTESY: SUMIT SHARMA

ছবির ক্যাপশান, সুবোধ কুমার সিং

ভারতে উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে কথিত গোহত্যাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতায় একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর চারজন অভিযুক্তকে এদিন গ্রেফতার করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সমর্থকরা সুবোধ কুমার সিং নামে ওই পুলিশ কর্মকর্তার গাড়িকে ধাওয়া করে তাকে কোণঠাসা করে ফেলে এবং তারপর গুলি করে ও পিটিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

'বজরং দল' নামে ওই গোষ্ঠীর স্থানীয় নেতা যোগেশ রাজকে এই হামলায় পুলিশ 'প্রধান অভিযুক্ত' বলে চিহ্নিত করেছে। ওই ব্যক্তি এখনও পলাতক, তবে বজরং দলের আরও তিনজন সমর্থককে আটক করা হয়েছে।

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, রাজ্যের বিজেপি সরকার গোরক্ষক বাহিনীকে মদত দিতে দিতে উত্তরপ্রদেশের আইন-শৃঙ্খলাকেই যে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে - এই ঘটনা তারই প্রমাণ।

গোহত্যাকে কেন্দ্র করে গত তিন-চার বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক সহিংসতা হয়েছে ও বহু মুসলিমকে পিটিয়ে মারা হয়েছে - কিন্তু কোনও পুলিশ কর্মকর্তাকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করার কোনও নজির নেই।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ইতিমধ্যেই ওই নিহত পুলিশ কর্মকর্তা সুবোধ কুমার সিংয়ের পরিবারের জন্য মোট পঞ্চাশ লক্ষ রুপির ক্ষতিপূরণ ও পরিবারের একজনের জন্য সরকারি চাকরির কথা ঘোষণা করেছেন - কিন্তু মি. সিংয়ের মেয়ে জানিয়েছেন তারা টাকা নয়, বরং বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি চান।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

রাতের বেলায় পাহারায় বেরিয়েছে গো-রক্ষকদের একটি দল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাতের বেলায় পাহারায় বেরিয়েছে গো-রক্ষকদের একটি দল

এই গোটা ঘটনার সূত্রপাত সোমবার, যখন বজরং দল অভিযোগ করে যে বুলন্দশহরের এক প্রান্তে একটি জঙ্গলে ঘেরা এলাকায় প্রায় পঁচিশটি গরুকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে গোহত্যা একটি দন্ডনীয় অপরাধ।

ওই গোষ্ঠীর লোকজন এই গোহত্যার বিরুদ্ধে পুলিশে এফআইআর করেই থামেননি, তারা একটি ট্রাক নিয়ে রাস্তা অবরোধও শুরু করে দেন।

তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে অবরোধ তোলার জন্য যে পুলিশ দলটি গিয়েছিল, তার মধ্যেই ছিলেন স্থানীয় থানার এসএইচও সুবোধ কুমার সিং।

পরে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এটাও দেখা গিয়েছে, তিনি অবরোধকারীদের শান্ত হতে অনুরোধ করছেন।

কিন্তু শত শত উত্তেজিত অবরোধকারী একটা পর্যায়ে পুলিশের দিকে তেড়ে যায়, তাদের দিকে পাথর ছুঁড়তে শুরু করে। তাদের কারও কারও কাছে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল বলে জানা যাচ্ছে।

ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়িতেও আগুন ধরাতে শুরু করে, তাদের ছোড়া ইঁট-পাথর এসে আঘাত করে সি মিংয়ের মাথাতেও। তার কপাল থেকে রক্তপাতও শুরু হয়ে যায়।

মি সিংয়ের চালক তখন তাকে নিয়ে ঝড়ের গতিতে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু কিছুদূর এগোতে-না এগোতেই একটি মাঠের কোণায় জনতা তাদের ঘিরে ফেলে। প্রাণভয়ে পালিয়ে যান তার ড্রাইভার।

লাঠি নিয়ে মোটরবাইকে করে টহল দিচ্ছে গোরক্ষকরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লাঠি নিয়ে মোটরবাইকে করে টহল দিচ্ছে গোরক্ষকরা

শিউরে-ওঠার মতো একটি মোবাইল ভিডিওতে পরে দেখা গেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওই পুলিশ কর্মকর্তার দেহ তার এসইউভি থেকে ঝুলছে। তার মাথাটা ঠেকে আছে মাটিতে, আর পা দুটো গাড়ির ভেতরে।

পেছনে শোনা যাচ্ছে গুলির আওয়াজ, আর জনতা চিৎকার করছে 'গোলি মারো'!

আক্রমণকারী জনতার মধ্যে থেকেই কেউ ওই ভিডিওটি তুলেছেন বলে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার ময়না তদন্তে রিপোর্টে দেখা গেছে, তার বাঁ দিকের ভ্রূ-র নিচে একটি বুলেট এসে বিঁধেছিল। সেই আঘাতেই তীব্র রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থল থেকে জনতা তার সার্ভিস রিভলভার ও মোবাইল ফোনটিও লুঠ করে নিয়ে যায়।

এদিকে পুলিশের ওপর এই হামলার বিরুদ্ধে ভারতে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝড় উঠেছে, অনেকেই একে 'বর্বর' ও 'বোধহীন' বলে বর্ণনা করছেন।

সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করছেন বহু ভারতীয়

ছবির উৎস, টুইটার

ছবির ক্যাপশান, সামাজিক মাধ্যমে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করছেন বহু ভারতীয়

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলা ওই সহিংসতায় ১৮ বছর বয়সী এক কিশোরও নিহত হয়েছে।

জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশ এই ঘটনার পর দাঙ্গা, হত্যাপ্রচেষ্টা ও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগে ৫০জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে।

বুলন্দশহর থেকে বিবিসির সংবাদদাতা নীতিন শ্রীবাস্তব জানাচ্ছেন, ওই এলাকায় স্কুল-কলেজ, দোকানপাট সব এদিন বন্ধ রয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে এক হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী।