ভারতে বিজেপি এবার ব্যাঙ্গালোরে 'অবৈধ বাংলাদেশী' তকমা দিয়ে বাঙালি খেদানোর তোড়জোড় শুরু করেছে

বিজেপির এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর কলকাতায় বিক্ষোভ - অগাস্ট ২০১৮

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের অজুহাতে আসামে লক্ষ লক্ষ মূলত মুসলমানকে রাজ্য ছাড়া করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালোরে হাজার হাজার গরিব বাংলাভাষীকে 'অবৈধ বাংলাদেশী'র তকমা দিয়ে উচ্ছেদ করার অভিযান শুরু করেছে শহরের পুর কর্তৃপক্ষ, যেখানে ক্ষমতায় আছে বিজেপি।

উচ্ছেদ-আতঙ্কে থাকা এই বাঙালিদের বেশির ভাগই মুসলিম, এবং তাদের দাবি তারা আসলে পশ্চিমবঙ্গেরই লোক।

নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করার মতো পরিচয়পত্র তাদের সঙ্গে থাকলেও রাজ্যে বিজেপির নেতা-বিধায়করা অবশ্য বলছেন সেগুলো বেশির ভাগই জাল এবং তাদের কর্নাটক থেকে তাড়াতেই হবে।

এদিকে এই বাঙালিদের ব্যাঙ্গালোর থেকে তাড়ানোর জন্য আজ সোমবার চূড়ান্ত সময়সীমা ধার্য থাকলেও বামপন্থীদের আন্দোলনের মুখে সেই 'ডেডলাইন' আরও দুদিন বাড়ানো হয়েছে।

ভারতের আসামে এনআরসি-র চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশের পর থেকেই দেশের নানা প্রান্তে "অবৈধ বিদেশি"দের তাড়ানোর যে হিড়িক পড়েছে, সেই তালিকায় সবশেষ সংযোজন হল ব্যাঙ্গালোর।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

বঙ্গীয় ইমাম পরিষেদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর বিক্ষোভ

মাসতিনেক আগে ভারতের প্রথম সারির একটি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ব্যাঙ্গালোরের নানা বস্তিতে হাজার হাজার ''বাংলাদেশী'' অবৈধভাবে বাস করছেন - এবং তারা প্রায় প্রত্যেকেই বেআইনিভাবে জুটিয়ে নিয়েছেন এ দেশের নানা পরিচয়পত্র।

ওই চ্যানেলের স্টিং অপারেশনে একজন বাঙালিকে বলতে শোনা গিয়েছিল, বাংলাদেশে জমি-জায়গা-কাজকারবার নেই বলেই তারা বাধ্য হয়ে সপরিবারে ভারতে চলে এসেছেন, পয়সা দিয়ে জোগাড় করে নিয়েছেন ভারতের আইডি।

স্রেফ পেটের দায়ে এসেছেন, ফেরার কোনও ইচ্ছে নেই - এবং নির্বিবাদে থাকলে ভারতে পাঁচ-দশ বছর, কী আজীবন থাকাও যে কোনও সমস্যা নয় সে কথাও বলেছিলেন তারা।

এর পর থেকেই ব্যাঙ্গালোরে বাংলাদেশী খেদানোর অভিযান ধীরে ধীরে তুঙ্গে ওঠে - যাতে নেতৃত্ব দিতে থাকেন মহাদেবপুরার বিজেপি এমএলএ ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরবিন্দ লিম্বাভালি।

আরএসএসের এই প্রচারক কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবেই বরাবর পরিচিত, এমনকী তার নামে গান পর্যন্ত বাঁধা হয়েছে কীভাবে তিনি হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সফল করবেন।

এহেন মি: লিম্বাভালি দু-তিনদিন আগে টুইট করে ঘোষণা করেন ''অবৈধ বাংলাদেশীরা'' ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি - কোনও শিল্পমালিক তাদের কারখানায় বা সাইটে কাজে লাগালে কড়া শাস্তি পেতে হবে।

কথিত বাংলাদেশী আবাসস্থলে অরবিন্দ লিম্বাভালি

ছবির উৎস, Aravind Limbavali Twitter page

ছবির ক্যাপশান, অরবিন্দ লিম্বাভালি পুলিশ ও কর্মকর্তাদের নিয়ে কথিত বাংলাদেশীদের আবাসস্থল পরিদর্শনে যান।

এদের তাড়ানোর জন্য শহরের সোনডেকোপ্পাতে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়ে দেন।

কর্নাটক বিজেপির মুখপাত্র ড: ভামান আচারিয়া বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আসলে আগে আমাদের রাজ্যে অভিবাসী শ্রমিকরা আসতেন বিহার বা ওড়িশা থেকে - কিন্তু গত দুতিন বছর ধরে যারা আসছেন তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী।"

"সীমান্ত পেরিয়ে তারা প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে আসেন, সেখান থেকে পাড়ি দেন দক্ষিণ ভারতে। কিন্তু পুলিশ এখন দেখতে পাচ্ছে তাদের বেশির ভাগ পরিচয়পত্রই জাল, তারা এদেশে অবৈধভাবে বাস করছেন।"

ইতোমধ্যে ব্যাঙ্গালোরের পুর-কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, ৩রা ডিসেম্বরের মধ্যেই শহরে কথিত অবৈধ বাংলাদেশীদের সব বস্তি ভেঙে তাদের কলকাতার ট্রেনে তুলে নেওয়া হবে।

আতঙ্কিত বাঙালিরা যোগাযোগ করেন পশ্চিমবঙ্গে তাদের এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে, যাদের একজন রায়গঞ্জের সিপিএম এমপি মহম্মদ সেলিম।

মি: সেলিম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "এরা আসলে নদীয়া-মালদা-মুর্শিদাবাদ এই সব জেলারই লোক। কিন্তু যখন থেকে বিজেপি সভাপতি উইপোকা-র মতো ফ্যাসিস্ট ভাষা ব্যবহার করে বাঙালিদের আক্রমণ করা শুরু করেছেন তখন থেকেই এদের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। ছোটবড় বিজেপি নেতারাও চরম উৎসাহে বাঙালি খেদাতে নেমে পড়েছেন।"

"বিজেপিই কলকাঠি নেড়ে ব্যাঙ্গালোরের মিউনিসিপাল কর্পোরেশনকে দিয়ে এই উচ্ছেদ করাতে চাইছে। অথচ এদের প্রায় সবারই আধার কার্ড, গ্রাম পঞ্চায়েতের পরিচয়পত্র বা ঠিকানার প্রমাণ সবই আছে - এবং এদের বেশির ভাগই অত্যন্ত গরিব মুসলিম।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ব্যাঙ্গালোরে একটি কথিত বাংলাদেশী বস্তি

ছবির উৎস, S Basu

ছবির ক্যাপশান, বিজেপির দাবি, কর্নাটকে না কি অন্তত চার লক্ষ ''অবৈধ বাংলাদেশী'' বাস করছেন । ব্যাঙ্গালোরে এরকম একটি কথিত বাংলাদেশী বস্তি

এদিন ব্যাঙ্গালোরে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রতিবাদ সমাবেশের জেরেই অবশ্য এই বাঙালিদের সাময়িক স্বস্তি মিলেছে।

মি: সেলিম বলছিলেন, "আমাদের শ্রমিক শাখার লোকজন ও ব্যাঙ্গালোরের আইটি সেক্টরের বহু অ্যাক্টিভিস্ট এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিশাল জমায়েত করে দুদিন বাড়তি সময় আদায় করেছেন। এর মধ্যে আমরা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলে কী করা যায় দেখছি।"

তবে বিজেপির দাবি, কর্নাটকে না কি অন্তত চার লক্ষ ''অবৈধ বাংলাদেশী'' বাস করছেন ও স্থানীয় মানুষের রুটিরুজিতে ভাগ বসাচ্ছেন - তাই এই ইস্যুতে আপস করা সম্ভব নয়।

মাসতিনেকের মধ্যেই ভারতে সাধারণ নির্বাচন, অন্তত তার আগে পর্যন্ত যে রাজ্যের গরিব অভিবাসী বাঙালিদের কপালে চরম দুর্ভোগ আছে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।