বিশ্বের কোন দেশে কীভাবে বকশিশ দেয়া হয়?

ওয়েটারদের জন্য রেখে যাওয়া বকশিশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ওয়েটারদের বকশিশ যাতে মালিক নিয়ে নিতে পারেন, তার বিরুদ্ধে আইন করার কথা ভাবছে ব্রিটেন।

রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে বিল দেয়ার সময় কি বকশিশ দিতে হবে? যদি দিতেই হয়, কতটা?

যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যান, এটা নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তিতে ভোগেন।

ব্রিটেনে রেস্টুরেন্টে খাবার পর বকশিশ দেয়াটাই দস্তুর। এই বকশিশ দেয়ার প্রথাটা আসলে ব্রিটিশদেরই চালু করা। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ অভিজাতরা তাদের চেয়ে 'নীচু শ্রেণীর' লোকজনের জন্য এই উপহার দেয়ার প্রথা চালু করে।

কিন্তু ব্রিটেনে রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মীদের জন্য যে বকশিশ রেখে যান খদ্দেররা, সেটা মালিকরা নিজেদের পকেটে পোরেন বলে অভিযোগ বহুদিনের। আর এ কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি নতুন আইন নিয়ে আলোচনা চলছে যাতে কর্মীদের জন্য রেখে যাওয়া বকশিশে মালিকপক্ষ হাত দিতে না পারেন।

বকশিশের ব্যাপারে নানা দেশে আছে নানা রীতি। কোথাও বকশিশ না দেয়াটা খুবই দৃষ্টিকটু। আবার এমন দেশও আছে, যেখানে বকশিশ দেয়াটাকে রীতিমত অপমানজনক বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাক বকশিশের ব্যাপারে কোন দেশে কী নিয়ম প্রচলিত:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আমেরিকার বহুল প্রচলিত একটা কৌতুক হল একমাত্র কর রিটার্ন ফাইল করার ব্যাপারটিই বকশিশের চেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর।

আমেরিকায় বকশিশ দেয়ার প্রথাটা চালু হয়েছিল উনিশ শতকে, যখন ধনী আমেরিকানরা ইউরোপে বেড়াতে যাওয়া শুরু করেছে। শুরুতে এই বকশিশ দেয়ার ব্যাপারটা নিয়ে অনেকে ভ্রু কুঁচকাতো। অনেকে এটিকে 'অগণতান্ত্রিক' বলে সমালোচনা করতেন। তাদের ভাষায়, এটি আমেরিকায় এমন একটি শ্রেণী তৈরি করছে যারা 'দয়ার কাঙ্গাল।'

কিন্তু একুশ শতকে এসেও আমেরিকায় এই বকশিশ দেয়ার ভালো-মন্দ দিক নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। তবে বকশিশ যে দিতেই হবে, সেটা মোটামুটি এখন আমেরিকানরা মেনে নিয়েছে। অর্থনীতিবিদ অফের আজার হিসেব করে দেখেছেন ২০১৭ সালে শুধুমাত্র রেস্টুরেন্ট ব্যবসাতেই সেবাকর্মীরা ৪২ বিলিয়ন ডলার বকশিশ পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে সবাই বকশিশ আশা করে।

ছবির উৎস, Image copyrightGETTY IMAGES

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রে সবাই বকশিশ আশা করে।

চীন

এশিয়ার আরও অনেক দেশের মতো চীনে অবশ্য এই বকশিশের সংস্কৃতি নেই। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চীনে তো বকশিশ দেয়া নিষিদ্ধই ছিল। এটাকে ঘুষ দেয়ার সামিল বলে ভাবা হতো। আজকের দিনেও চীনে বকশিশ দেয়ার প্রথা তুলনামূলকভাবে বিরল।

স্থানীয় লোকজন যেসব রেস্টুরেন্টে যান, সেখানে বকশিশ রেখে যাওয়ার কোন প্রথা নেই। তবে যেসব রেস্টুরেন্টে বিদেশী বা পর্যটকরা যান, সেখানে ব্যতিক্রম। যেসব আন্তর্জাতিক মানের হোটেলে বিদেশিরা থাকেন, সেখানেও বকশিশ দেয়া যায়। তবে কেবলমাত্র যারা হোটেলের অতিথিদের লাগেজ টানেন, সেইসব হোটেল কর্মীদের।

আর ট্যুর গাইড এবং ট্যুর বাস ড্রাইভারদেরও বকশিশ দেয়া যায়।

জাপান

জাপানে নানা বিষয়ে যে জটিল সামাজিক রীতি-নীতি, বকশিশও তার বাইরে নয়। বিয়ে, শেষকৃত্য বা এরকম কোন বিশেষ অনুষ্ঠানের বেলায় হয়তো উপহার দেয়ার প্রথা চালু আছে। কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্রে বকশিশ দেয়া হলে সেটা অপমানজনক বলে গণ্য হতে পারে।

জাপানিরা সবচেয়ে বেশি যেটাকে গুরুত্ব দেয়, তা হলো, গুড সার্ভিস, বা ভালো সেবা। আর যেসব ক্ষেত্রে বকশিশ দেয়া যেতে পারে বলে মনে করা হয়, সেখানেও খামে ভরে খুব সুন্দর করে সেটা দেয়াটাই রেওয়াজ।

চীনে বকশিশ দেয়ার রীতি তেমন জনপ্রিয় নয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চীনে বকশিশ দেয়ার রীতি তেমন জনপ্রিয় নয়

ফ্রান্স

১৯৯৫ সালে ফ্রান্সে একটা আইন পাশ হয় সেখানে রেস্টুরেন্টে বিলের সাথে সার্ভিস চার্জ যোগ করা হয়। ফ্রান্সের এই নিয়ম পরে চালু হয়ে যায় প্রায় পুরো ইউরোপ জুড়ে এবং বিশ্বের আরও অনেক দেশে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রেস্টুরেন্টের ওয়েটারদের যেন বকশিশের ওপর নির্ভর করতে না হয় এবং এভাবে তাদের আয় যেন কিছুটা বাড়ানো যায়।

তবে এ সত্ত্বেও ফ্রান্সে বকশিশ দেওয়ার রেওয়াজ চালু আছে। যদিও তরুণদের মধ্যে বকশিশ দেয়ার প্রবণতা খুব একটা নেই। বকশিশ দেয়ার ব্যাপারে ফ্রান্সে অনীহা বাড়ছে। ২০১৪ সালে ফ্রান্সে ১৫ শতাংশ কাস্টমার বলেছিল, তারা কখনোই বকশিশ দেয় না। আগের বছরের তুলনায় এটা প্রায় দ্বিগুন।

ভারত

ভারতের অনেক রেস্টুরেন্টে খাবারের বিলের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ যোগ করে দেয়া হয়। কাজেই সেদেশে কেউ যদি বকশিশ রেখে না যায়, কেউ কিছু মনে করে না। তবে এমনিতে রীতিটা হচ্ছে মোট বিলের ওপর পনের হতে বিশ শতাংশ বকশিশ হিসেবে রেখে যাওয়া। বকশিশ না দেয়ার জন্য রেস্টুরেন্ট সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে- এমনটিও দেখা যায়। ২০১৫ সালে এক জরিপে দেখা যায় এশিয়ার দেশ গুলোর মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশি বকশিশ দেয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশ এবং থাইল্যান্ডের পেছনে।

জাপানে একজন ওয়েটারকে টিপস দেয়া অপমানজনক হতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাপানে একজন ওয়েটারকে টিপস দেয়া অপমানজনক হতে পারে।

সুইটজারল্যান্ড

সুইসদের বকশিশ দেয়ার অভ্যাস বেশ ভালো। তারা নাকি বিলের সঙ্গে বাড়তি টাকা যোগ করে দেয় যাতে করে কোন খুচরো পয়সার লেন-দেন করতে না হয়। হেয়ার ড্রেসার থেকে শুরু করে হোটেল কর্মী সবার জন্যই তারা কম-বেশি বকশিশ রেখে যায়। তবে সুইটজারল্যান্ডে ন্যূনতম মজুরি এত বেশি যে রেস্টুরেন্টের ওয়েটারদের আয় উপার্জন বেশ ভালো, মাসে তারা চার হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে। কাজেই তাদেরকে বকশিশের ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে হয় না।

আরও পড়ুন:

সিঙ্গাপুর

হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা ট্যাক্সিতে অল্প বকশিশ দিলে কেউ হয়তো আপত্তি করবে না, কিন্তু 'বকশিশ' ব্যাপারটা সিঙ্গাপুরে বেশ গোলমেলে ব্যাপার। সরকারী ওয়েবসাইটে তো হুঁশিয়ারিই দেয়া আছে-"বকশিশ এখানকার জীবনের অংশ নয়।"

মিশর

বকশিশ মিসরের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। স্থানীয়ভাবে এটাকে মিশরে 'বকশিশ'ই বলা হয়। সচ্ছল মিশরীয়রা বেশ দরাজ হাতেই বকশিশ দেয় সবাইকে- রেস্টুরেন্টের ওয়েটার থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্পের কর্মচারী। বকশিশকে বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করে সবাই, কারণ দেশটিতে রয়েছে বেকারত্বের উচ্চ হার এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকেই আসে দেশটির জিডিপির ৪০ শতাংশ।

ফ্রান্স প্রথম দেশ যারা সার্ভিস চার্জ চালু করেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফ্রান্সে রেস্টুরেন্ট বিলের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ জুড়ে দেয়ার রীতি প্রথম চালু হয়।

ইরান

ইরানে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা এক অদ্ভূত স্থানীয় রীতির মুখোমুখি হন। এটিকে বলা হয় তারুফ। বিনয়ের সঙ্গে প্রথমে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানায় তারা, সেটি ট্যাক্সি ভাড়া দেয়ার সময় থেকে শুরু করে যে কোন জায়গায় হতে পারে। কিন্তু যেই মাত্র তার সঙ্গে বকশিশ যোগ করে দেয়া হবে, সাথে সাথে কিন্তু তারা সেটি গ্রহণ করবে! বকশিশ ইরানীদের নিত্যদিনের জীবনের অংশ।

রাশিয়া

সোভিয়েত যুগে রাশিয়ায় বকশিশ দেয়ার কোন সুযোগই ছিল না। এটিকে গণ্য করা হতো শ্রমিক শ্রেণীকে অবমাননা করার সামিল। তবে তার মানে এই নয় যে রুশ সংস্কৃতিতে বকশিশের প্রচলন নেই। রুশরা বকশিশকে বলে 'চায়েভিয়ে', অর্থাৎ চা খাওয়ার জন্য। ২০০০ সালের পর বকশিশ ফিরে এসেছে রাশিয়ায়। তবে বয়স্ক লোকজন এখনো এই বকশিশ দেয়ার রীতিকে অপমানজনক বলেই মনে করে।

আর্জেন্টিনা

ভালো স্টেক আর মলবেক ওয়াইন দিয়ে ডিনার সারার পর আপনি যদি রেস্টুরেন্টের ওয়েটারকে বকশিশ দিতে চান, আর্জেন্টিনায় কেউ কিছু মনে করবে না। তবে ২০০৪ সালে যে আইন করা হয়েছে, তাতে কিন্তু হোটেল এবং ক্যাটারিং শিল্পে বকশিশ দেয়াকে বে-আইনি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বকশিশের প্রচলন আছে। আর্জেন্টিনার একজন ওয়েটারের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আয় হয়তো এই বকশিশ থেকেই আসে।