ইন্দোনেশিয়ায় সুনামির পর লাশের গন্ধে ভারী হয়ে আছে পালুর বাতাস

    • Author, রেবেকা হেইঞ্চকি
    • Role, বিবিসি ইন্দোনেশিয়া

সাগরের তীর থেকে শত শত মিটার জুড়ে শুধু ধ্বংসস্তুপ।

ভাঙা কংক্রিট, ইট-সুরকি, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাড়িঘর, উল্টে যাওয়া মাছধরা নৌকো।

বাতাসে কেমন একটা গন্ধ। যদি আপনি নিকটবর্তী মেডিক্যাল ক্লিনিকটার দিকে যান, দেখবেন সেখানে সব মৃতদেহগুলো সার বেঁধে রাখা হচ্ছে। বুঝতে অসুবিধে হয় না, গন্ধটা এখান থেকেই আসছে ।

যে ভুমিকম্প থেকে এই সুনামি - সেটার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.৫। তার আঘাত কত জোরদার ছিল তা বোঝা যায় চারদিকের ধ্বংসের মাত্রায়, আর লাশের গন্ধে।

জীবিতরাও আছে। তাদের দেখা যাচ্ছে ধ্বংসস্তুপের মধ্যেই।

কেউ অপেক্ষা করছে তাদের কোন প্রিয়জনের যদি দেখা মেলে সেই আশায়। কেউ বা ধ্বংসস্তুপের একটি অংশ পাহারা দিচ্ছে - যা এই সেদিনও তার বাড়ি ছিল।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

একটা মৃতদেহ দেখা গেল - আর কিছু না পেয়ে লোকজন একটা ঢেউটিন দিয়েই সেটা ঢেকে দিয়েছে।

এই লোকজনের সাথে কথা বললে আপনি শুনবেন, কিভাবে নিমেষের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল।

কিভাবে তারা কয়েক মুহুর্তের মধ্যে সর্বস্ব হারিয়েছে, এবং তাদের যে করার কিছুই ছিল না - তাও।

এমন খুঁটিনাটি দিয়ে তারা আপনাকে ঘটনাটা বলবে যে বোঝা যায় - এভাবে বর্ণনা করেই যেন তারা একভাবে আত্মস্থ করতে চাইছে - যে তাদের জীবনে কি ঘটে গেছে।

বিবিসি বাংলায় এ সম্পর্কে আরো খবর:

এই লোকেরা বলছে, সুনামির ব্যাপারে তারা কোন সতর্কবার্তা, বা কোন এসএমএস - কোন কিছুই পায় নি।

একজন মৎস্যজীবী - যিনি তার পরিচয় দিলেন শুধু ববি বলে - বললেন, জোরালো ভুমিকম্পের পরই তিনি দেখেছিলেন সাগরের পানি হঠাৎ পিছিয়ে যাচ্ছে।

সেটা দেখেই তিনি বুঝেছিলেন কি ঘটতে যাচ্ছে।

সাথে সাথে তিনি তার পরিবার আর ছেলেমেয়েদের বললেন উঁচু জায়গার দিকে দৌড়াতে।

তিনি নিজে অবশ্য সেখানেই রয়ে গেছিলেন। কারণ তার চোখে পড়েছিল একাকী একটি শিশু। তাকে তিনি আঁকড়ে ধরে রাখলেন।

ঠিক সেই সময় সুনামির দ্বিতীয় ঢেউটা এলো, এবং এই ঢেউটার আঘাতেই সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল।

ঢেউটা তাকে একটা আমগাছের ওপর আছড়ে ফেললো, তার ওপর দিয়ে পানি চলে গেল, এবং কেমন করে যেন তিনি আর তার ধরে-থাকা শিশুটি - দুজনেই বেঁচে গেলেন।

ববি এখন বসে আছেন ভাঙা ইট-সুরকির স্তুপের ওপর।

তিনি ক্ষুব্ধ যে তিনি কোন ত্রাণ পান নি। কি ভাবে দিন কাটাচ্ছেন - তিনি এই প্রশ্ন করায় তিনি কাঁদতে শুরু করলেন।

পালুর মামবোরো স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দেখা গেল পাঁচ বছরের একটি মেয়েকে ভাঙা পা নিয়ে শুয়ে থাকতে। তার পরিবারের অন্যরা নিখোঁজ। একজন ডাক্তার বললেন, মেয়েটিও মনে করতে পারছে না যে সে কোথায় থাকতো।

গাড়িতে পালু শহরের ভেতর দিয়ে যাবার সময় এটা স্পষ্ট হলো যে জেলেদের ছোট ছোট বাড়িগুলো একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু একটু অবস্থাপন্ন জেলেদের বাড়ি যেগুলো কংক্রিট-সিমেন্টের তৈরি - তার অনেকগুলোই টিকে আছে।

সুনামির ঢেউটা ছিল খুবই শক্তিশালী। পালুর চারদিকেই উঁচু পাহাড়ি জায়গা - কিন্তু শহরটা গড়ে উঠেছে সমভূমির ওপর। তাই সুনামির ঢেউয়ের সামনে তা ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত।

অনেক পরিবারের পুরুষরা ধ্বংসস্তুপের ওপর বসে ভাঙা ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছে। তার স্ত্রী আর সন্তানরা চলে গেছে ত্রাণকেন্দ্রে। অনেকে এখনো আত্মীয়স্বজনদের খুঁজছে।

শহরটিতে এখন বিশুদ্ধ পানি, খাবার এবং পেট্রোলের তীব্র অভাব। এসব সামগ্রীর জন্য লম্বা লাইন পড়ছে। কোথাও কোথাও খাবার নিতে আসা লোকজনের মধ্যে মারামারি হচ্ছে, দু-এক জায়গায় লুটপাটও হয়েছে।

তবে এটাও ঠিক যে লোকজনের মধ্যে সহমর্মিতা এবং পরস্পরকে সাহায্য করার মানসিকতাও দেখা যাচ্ছে। যে যেভাবে পারছে দুর্গতদের সাহায্য করছে।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত ত্রাণের ব্যবস্থা না করতে পারে তাহলে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠতে পারে - এটা স্পষ্ট।