বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে 'অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম' এর ধারণা

সীতাকুন্ডের খৈয়াছড়া ঝরনায় র‍্যাপেলিং

ছবির উৎস, কাজী আরিফা সুলতানা

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম
    • Author, নাগিব বাহার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

পাহাড়, জঙ্গল বা সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে বিশ্রাম নেয়া বা অলসভাবে প্রকৃতির সঙ্গ উপভোগ করাটা আজকালকার অধিকাংশ তরুণদের মধ্যে খুব একটা জনপ্রিয় নয়।

পাহাড়ে নতুন নতুন পথ বা ঝরনা খুঁজে বের করা, এগুলোর উৎস অনুসন্ধান করা, দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কোনো গন্তব্যে যাওয়া, প্রতিকূল পরিবেশে তাঁবু গেড়ে থাকা, নানা ধরণের দু:সাহসিক বা একটু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ - যার মধ্যে একটা অভিযানে বের হবার আনন্দ বা রোমাঞ্চ আছে - সেগুলো করার ব্যাপারেই বর্তমানের তরুণ পর্যটকদের আগ্রহ বেশী।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে যারা দেশের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশই তরুণ।

আর এই তরুণদের সিংহভাগই আগ্রহী 'অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে'।

বাংলাদেশে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম: কতটা সম্ভাবনাময়?

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম ধারণাটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে সম্প্রতি।

পর্যটকদের মধ্যে পাহাড়ে ট্রেকিং বা হাইকিংয়ের জনপ্রিয়তা থাকলেও ঝরনা বেয়ে পাহাড়ে ওঠা-নামা করা, হ্রদের পানিতে নৌকা চালানো বা জঙ্গলের মধ্যে দড়ি বেয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে পারাপারের মত বিষয়গুলোর ধারণা বাংলাদেশে একেবারেই নতুন।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের ২০১৬-র হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের পর্যটকদের ৩৬ শতাংশই আগ্রহী অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে।

বাংলাদেশ সরকারও তাই অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে পর্যটকদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান পর্যটন কর্পোরেশনের একজন ব্যবস্থাপক জিয়াউল হক হাওলাদার।

মি. হাওলাদার বলেন, "বাংলাদেশে অনেক ঝর্ণা, পাহাড়ের অনেক ট্রেইল রয়েছে যেগুলো তরুণ পর্যটকরা নিজেদের উদ্যোগে আবিস্কার করেছে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণে সরকার এসব কাজ পরিচালনা করতে পারে না, কিন্তু পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য সহায়তা করার চেষ্টা করা হয় এসব উদ্যোগকে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

পাহাড়ে ক্যাম্পিং করে থাকার ব্যবস্থা

ছবির উৎস, বৃত্ত ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম

ছবির ক্যাপশান, পাহাড়ে ক্যাম্পিং করে থাকার ব্যবস্থা

মি. হাওলাদার জানান বিভিন্ন এলাকায় কায়াকিং (নদী বা হ্রদে 'কায়াক' জাতীয় নৌকা চালানো), জিপলাইনিং (উঁচু পাহাড় বা গাছে দড়ি বেধে চলাচল), র‍্যাপলিং-জুমারিং (দড়ির সাহায্যে পাহাড়ি পথে নামা/ওঠা) এর মত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই।

"পর্যটন কর্পোরেশন আর্থিকভাবে সহায়তা না করলেও প্রশাসনিক সাহায্য, গাইড সংক্রান্ত সহায়তা ও পর্যটনের প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মত সহায়তা দিয়ে থাকে", বলেন মি. হাওলাদার।

পাশাপাশি পর্যটকদের যেন বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে না পরতে হয় সেজন্য বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ে কর্মশালা, আলোচনা অনুষ্ঠানের মত কার্যক্রমও পর্যটন কর্পোরেশন পরিচালনা করছে বলে জানান মি. হাওলাদার।

কিন্তু নানা ধরণের অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ আসলে কতটা?

ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের ট্যুর আয়োজন করা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান এখন পর্যন্ত এই ধরণের ট্যুর আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশার অতিরিক্ত সাড়া পেয়েছেন তারা।

"অনেক সময় দেখা যায় যে আমাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ ট্যুরে যাওয়ার জন্য আগ্রহী থাকে।"

মি. তৌহিদুল ইসলাম জানান খুব শীঘ্রই রিভার ক্রসিং (পায়ে হেঁটে নদীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পারাপার) এবং র‍্যাফটিং (খরস্রোতা নদীতে নৌকা চালানো) এর ট্যুর আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এছাড়া বাংলাদেশে সম্প্রতি কেবল কার সুবিধা এবং ট্রি-হপিং (দড়ির সিঁড়ি দিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে চলাচল) এর ব্যবস্থাও হয়েছে বলে জানান মি.ইসলাম।

নারীরা আগ্রহী হচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে

ছবির উৎস, বৃত্ত ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম

ছবির ক্যাপশান, নারীরাও আগ্রহী হচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে

অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে আগ্রহী নারীরা

এই ধরণের আয়োজনে নারীদের উপস্থিতি সাধারণত কেমন থাকে - এই প্রশ্নের উত্তরে মি. ইসলাম বলেন শুরুর দিকে নারীদের অংশগ্রহণের হার খুব একটা বেশি না থাকলেও, বর্তমানে, কোনো কোনো ট্যুরে অধিকাংশ সফরকারীই থাকেন নারী।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নারীদের নিরপত্তার বিষয়টাই সাধারণত প্রধান চিন্তার বিষয় থাকে।

সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এধরণের ভ্রমণ পরিকল্পনার অংশ হতে নারীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত কামরুন নাহার ইতি জানান, মূলত ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমে এসব ট্যুর আয়োজিত হওয়ায় গ্রুপ সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকে তাদের সামনে।

এছাড়া আগের চেয়ে অনেক বেশি নারী এধরণের ট্যুরে অংশগ্রহণ করে বলে নারীরা এসব পরিকল্পনায় অংশ নিতে আরো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বলে জানান মি. ইতি।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন এই ধরণের পর্যটনের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পেতে সরকারকে এই খাতের উন্নয়নে আরো মনোযোগী হতে হবে।

আরো পড়তে পারেন: