গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে কেমন ছিল প্রথম ভারতীয় সংবাদপত্রের লড়াই

ভারতে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্রটিতে ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের কিছু চিত্র তুলে ধরা হতো। ওই পত্রিকাটির ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যাবে স্বৈরশাসকরা কিভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকে এবং একটি নিরপেক্ষ সংবাদপত্র কিভাবে তার জন্যে কাল হয়ে উঠতে পারে। এবিষয়ে লিখেছেন সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ এন্ড্রু ওটিস।

ভারতে ১৭৮০ সালে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকাটির নাম ছিল 'হিকিজ বেঙ্গল গেজেট', বাংলা করলে 'হিকির বেঙ্গল গেজেট।' এর নির্ভীক প্রকাশক জেমস অগাস্টাস হিকির নামেই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল যা ভারতে তখনকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে তাদের পিছু নিয়েছিল।

শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই

অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই পত্রিকাটি তাদের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়তো এবং তার জের ধরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ নেওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হতো।

এরকম বহু অভিযোগের একটি ছিল ভারতে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছিল যে তিনি ভারতীয় সু্প্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে উৎকোচ দিয়েছেন।

পত্রিকাটিতে আরো অভিযোগ তোলা হয় যে ওয়ারেন হেস্টিংস ও তার প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় ঘনিষ্ট ব্যক্তিরা ভারতে অবৈধভাবে স্বৈরশাসনের সূচনা করেছিলেন, জনগণের সাথে আলাপ আলোচনা না করে তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তারা খর্ব করেছিলেন।

হিকিজ বেঙ্গল গেজেটে একইসাথে ইউরোপীয়ান নাগরিক ও ভারতীয় দরিদ্র মানুষের জীবনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হতো। ফলে পত্রিকাটির সাথে ঔপনিবেশিক সমাজের একেবারে নিচের স্তরে যারা বসবাস করতেন তাদের একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

বিশেষ করে ভারতীয় সৈন্যদের সাথে, যারা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং ওই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ক্ষমতা যখন একচ্ছত্র ছিল তখন তারা ভারতের একটি বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো তাদের নিজেদেরই সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে। কিন্তু ১৮৫৭ সালে এই বাহিনীর ভেতরে থাকা ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে কোম্পানিটি ভেঙে দেওয়া হয়।

হিকিজ বেঙ্গল গেজেট পত্রিকাটি বস্তুত ভারতীয় সৈন্যদেরকে বিদ্রোহ করার জন্যেও ডাক দিয়েছিল।

আরো পড়তে পারেন:

কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে পত্রিকাটির এসব সমালোচনা যখন তীব্র হয়ে উঠলো তখন একটা পর্যায়ে সরকার আর সেসব সহ্য করতে পারছিল না। তখন ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা পত্রিকাটির সাথে যারা জড়িত তাদের সুনামহানি করতে উদ্যত হলো।

পত্রিকাটির মৃত্যু হলো যেভাবে

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন হিকিজ বেঙ্গল গেজেটের প্রতিদ্বন্দ্বী একটি কাগজের পেছনে অর্থের যোগান দিতে শুরু করলো। উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিরুদ্ধে করা সমালোচনা ও মতামতকে নিয়ন্ত্রণ করা। হিকির পত্রিকাটিকে তারা উল্লেখ করলো 'উদ্ধত' সংবাদপত্র হিসেবে এবং এই পত্রিকায় যারা লেখালেখি করতো তাদেরকে চিহ্নিত করা হলো 'দুর্বৃত্ত' হিসেবে।

শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাত (নাম গোপন করা) এক লেখক পত্রিকাটিতে লিখলেন "লোকজন আর মেনে চলতে বাধ্য নয়" কারণ সরকার জনগণের কল্যানের ব্যাপারে তাদের সাথে আর আলাপ আলোচনাও করে না। এরকম এক লেখার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিল।

ওয়ারেন হেস্টিং নিজে বেশ কয়েকবার হিকির বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে আদালতে মামলা করেছিলেন। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত বিচার বিভাগের কাছে হিকির টিকে থাকার সুযোগ ছিল খুবই কম।

তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন কিন্তু তারপরেও তিনি জেলের ভেতরে থেকে আরো ন'মাস পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

তখন সুপ্রিম কোর্ট থেকে বিশেষ আদেশে পত্রিকাটির ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে নির্দেশ দেওয়া হলো এবং তার সাথে সাথেই চিরতরে মৃত্যু ঘটলো ভারতের প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্রটির।

পত্রিকাটি যা করতে পেরেছিল

কিন্তু ভারতে ওয়ারেন হেস্টিংসের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এসে পৌঁছালো ইংল্যান্ডে। হিকির বেঙ্গল গেজেটে যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করলেন পার্লামেন্টের সদস্যরা।

সেই তদন্তের ফলাফল ছিল এরকম: তৎকালীন ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের ইমপিচমেন্ট বা তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভারত থেকে তাদেরকে প্রত্যাহার করে নেওয়া।

তৎকালীন ভারতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চাপ গড়ে তুলতে হিকির বেঙ্গল গেজেট এবং পরে ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

আরো পড়তে পারেন:

ভারতের প্রথম সংবাদপত্রটির বেলায় যেরকম হয়েছে এরকমটি হচ্ছে বর্তমান সময়েও। এখনকার স্বৈরাচারী শাসকরাও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে চেষ্টা করেন সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠ চেপে ধরতে।

শাসকরা মনে করেন তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি অস্ত্র হলো- জনগণ পত্রপত্রিকায় যা পড়েন সেসব নয়, বরং তারা যা বলেন সেসবই যাতে বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন।

বর্তমানের সোশাল মিডিয়া

এরকম রাজনীতিক, যারা স্বৈরশাসক হয়ে উঠতে চান, তারাও যেন বর্তমান কালে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন।

নাগরিকদের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করার জন্যে তাদের হাতে আছে নতুন নতুন হাতিয়ার- ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের মতো আরো কিছু সামাজিক মাধ্যম। কারণ এসব মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা সেসব জিনিসই গ্রহণ ও শেয়ার করেন যেগুলো তারা আগে থেকেই বিশ্বাস করতেন।

এর ফলাফল যা হয়েছে সেটা হলো- সারা বিশ্বেই মানুষ এখন ক্রমশই ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ছে কারণ রাজনীতিবিদরা এসব সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি তাদের নাগরিকদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হচ্ছেন।

যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়শই টুইট করে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক সংবাদকে 'ফেইক নিউজ' এবং কিছু সংবাদ মাধ্যমকে 'জনগণের শত্রু' বলে উল্লেখ করে থাকেন।

ভারতে এই সোশাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাবও চোখে পড়েছে সম্প্রতি। বাচ্চাদের অপহরণ করা হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া এরকম একটি ভুয়া খবরের জেরে দেশটির বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।

অনলাইনের মাধ্যমে দেশটিতে ছড়িয়ে পড়ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণাও। ভারতে গত অগাস্ট মাসে যেসব সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সোশাল মিডিয়াতে তাদের গায়ে 'জাতীয়তাবাদবিরোধী' তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ তারা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করছে।

সোশাল মিডিয়ার জবাবদিহিতা

এরকম একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে গুগল, ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসার সময় এসেছে। কারণ সমাজে তাদের কর্মকাণ্ডের বড় রকমের প্রভাব পড়ছে। একারণে সংবাদপত্রগুলো দশকের পর দশক ধরে যেসব নীতিমালা মনে চলছে তাদেরকেও এখন সেরকম কিছু নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

এসব সোশাল মিডিয়া কোম্পানির দায়িত্ব মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনাকে ত্বরান্বিত করা, বিভেদ কিম্বা ঘৃণা ছড়ানো নয়।

ভারতে ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো স্বৈরশাসক আরো এসেছেন এবং গেছেন। তারা এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে গেছেন, যার উপর ভিত্তি করে ব্রিটিশদের শাসন শুরু হয়েছিল। তাদের মাধ্যমেই কোটি কোটি মানুষের একটি উপমহাদেশকে শাসন করে গেছে মাত্র কয়েকশো মানুষকে নিয়ে গঠিত একটি কোম্পানি।

তারা শুধু তরবারির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতার বৈধতা আদায় করেননি, তাদের বিষয়ে যারা লেখালেখি করতে পারেন তাদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও তারা সেটা করেছেন।

বর্তমানেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনীতিকরা আছেন যারা ওই একই পন্থায় সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছেন। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তারা মুক্ত সংবাদ মাধ্যমকে খাটো করার চেষ্টা করেন এবং এক দল নাগরিককে দাঁড় করিয়ে দেন আরেক দল নাগরিকের বিরুদ্ধে।

আজকের দিনে আমরা যে লড়াইটা দেখছি সেটা হেস্টিংস ও হিকির লড়াই থেকে ভিন্ন কিছু নয়। শুধু লড়াই করার হাতিয়ারের পরিবর্তন হয়েছে।