আধুনিক শহরের পেছনে ভূমিকা রাখছে প্রাচীন সভ্যতা

অতীত ব্রিটেন থেকে শুরু করে ব্যাবিলন, এরকম অনেক প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন নিয়ে গড়ছে উঠেছে আমাদের আধুনিক বড় বড় শহরগুলো। সেই সব প্রাচীন সভ্যতার অনেক কিছুই ভুমিকা রাখছে এসব শহরের আর ভবনের পরিকল্পনায়। এখানে তার কয়েকটি উদাহরণ:

১. প্রাচীন মিশর এবং পিরামিড

প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বড় নিদর্শন পিরামিডগুলো, যার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে আধুনিক স্থাপত্যকলায়, যার উদাহরণ প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ভবনের নকশায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বড় নিদর্শন পিরামিডগুলো, যার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে আধুনিক স্থাপত্যকলায়, যার উদাহরণ প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ভবনের নকশায়

প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বড় নিদর্শন পিরামিডগুলো, যার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে আধুনিক স্থাপত্যকলায়, যার উদাহরণ প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ভবনের নকশায়।

বিশ্ব জুড়ে অনেক ভবনে পিরামিডের আদল দেখা যাবে। যেমন মেমফিসের পিরামিড অ্যারেনা, লাস ভেগাসের লুক্সর ক্যাসিনো এন্ড হোটেল, জাপানের নিমা স্যান্ড মিউজিয়াম, এসব ভবন পিরামিডের আদলে নকশা করা হয়েছে।

প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বারও পিরামিডের মতো নির্মাণ করা হয়েছে।

২. রোমান সাম্রাজ্যের পথ

রোমানরা পাথরের ভিত্তি স্থাপন করে এবং পথের ওপরও পাথর বসিয়ে দেয়, যাতে ভারী ঘোড়ার গাড়ী এবং সৈন্যবহরের চাপেও রাস্তা ঠিকঠাক থাকে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোমানরা পাথরের ভিত্তি স্থাপন করে এবং পথের ওপরও পাথর বসিয়ে দেয়, যাতে ভারী ঘোড়ার গাড়ী এবং সৈন্যবহরের চাপেও রাস্তা ঠিকঠাক থাকে

সব পথই রোমে গিয়ে ঠেকেছে!

এই প্রবচনটি হয়তো পুরোপুরি সত্যি নয়, কিন্তু প্রাচীন যুগের রোমানরা অবশ্যই তাদের সম্পর্কে দুইটি বিষয় ভালোভাবে জানতো।

রোমানদের আগে শহর ও নগরগুলোয় যাতায়াতের সহজ কোন পথ ছিল না। কার্যকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা আর বাণিজ্য পথের গুরুত্ব তারা বুঝতে পেরেছিল।

এ কারণে সবচেয়ে ভালো পথ নির্মাণ করতে বড় আকারে জরিপ করা হয়, যাতে পথে কোন প্রতিবন্ধকতার তৈরি না হয় এবং পথটি সোজাসাপ্টা হয়।

তারা পাথরের ভিত্তি স্থাপন করে এবং পথের ওপরও পাথর বসিয়ে দেয়, যাতে ভারী ঘোড়ার গাড়ী এবং সৈন্য বহরের চাপেও রাস্তা ঠিকঠাক থাকে।

খৃষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগের এই প্রযুক্তি এখনো সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। রোমানদের তৈরি করা বেশ কিছু পথ এখনো ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সড়ক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৩. ব্যাবিলনের পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা

প্রাচীন ব্যাবিলনের অবশিষ্ট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাচীন ব্যাবিলনে পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০০ বছর আগে।

প্যারিসে প্রথম পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা চালু হয় ১৮৫০ সালে। লন্ডনে চালু হয় ১৮৬৬ সালে।

কিন্তু ব্যাবিলনে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০০ বছর আগে। কিন্তু সেটি গ্রহণ করতে বাকি বিশ্বের এতো বেশি সময় কেন লাগলো?

ধারণা করা হয়, প্রাচীন ব্যাবিলনেই প্রথম কাদা মথিত করে পাইপের আকার দেয়া হয়, যার মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে পয়ঃবর্জ্য বের করে দেয়া হতো।

বেল এট নিপ্পুর এ হাজার হাজার বছর আগের এরকম পাইপ এবং টি-জয়েন্টের নমুনা পাওয়া গেছে।

৪. প্রাচীন গ্রিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা

কাদা মাটি ব্যবহার করে গ্রিকরা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করেছিল খৃষ্ঠপূর্ব আঠারো শতকে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কাদা মাটি ব্যবহার করে গ্রিকরা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করেছিল খৃষ্ঠপূর্ব আঠারো শতকে

এককথায় বলা চলে, প্রাচীনে গ্রিকরা ছিল পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রথম উদ্ভাবক।

প্রাচীন ক্রেটান- মিনোয়ান্সরা প্রথম কাদাকে পাইপ বানিয়ে মাটির নীচে বসিয়ে দেয়। তাদের রাজধানী কোনোসোসে পরিষ্কার পানি নিয়ে আসা আর ময়লা পানি বের করে দেবার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।

তারা বড় আকারে ঘরবাড়ি গরম রাখার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল এবং টয়লেটে ফ্লাশিং ব্যবস্থা করেছিল। কার্বন পরীক্ষা দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি চালু হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব আঠারোশো শতকে।

৫. পৌত্তলিক ব্রিটেন এবং সূর্য উপাসনা

ব্রিটেনের আধুনিক শহর মিল্টন কেইনেসের অনেক কিছুই প্রাচীন ব্রিটেনের ইতিহাসকে বহন করছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রিটেনের আধুনিক শহর মিল্টন কেইনেসের অনেক কিছুই প্রাচীন ব্রিটেনের ইতিহাসকে বহন করছে

মিল্টন কেইনেস হয়তো ব্রিটেনের সবচেয়ে সুন্দর শহর নয়, কিন্তু শহরটি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়, সজ্ঞানে আর নিশ্চিতভাবে একটি আধুনিক শহর।

গৃহ সমস্যা মেটাতে যদিও এটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৬০ সালে, কিন্তু শহরটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে ব্রিটেনের ইতিহাস নানাভাবে ফুটে উঠেছে।

পৌত্তলিক ব্রিটেনের প্রথা আর বিশ্বাসের নানা বিষয় শহরের নকশায় ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে।

স্টোনহেজের মতো শহরের প্রধান সড়কটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, গ্রীষ্মের সময় সেটি উদিত সূর্যের সমান্তরাল থাকে।

৬. প্রাচীন রোমান স্থাপত্য

রোমের টেম্পল অফ স্যাটুর্ন, যা খৃষ্টপূর্ব ৪৯৭ সালে নির্মিত হয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রাচীন রোমের টেম্পল অফ স্যাটুর্ন, যা খৃষ্টপূর্ব ৪৯৭ সালে নির্মিত হয়েছিল

রোমের সড়কের কথা এর আগে এসেছে। এবার আলোচনায় আনা যাক আরেকটি বিষয়: 'রোম একদিনেই নির্মিত হয়নি'।

শহরের নানা তোরণের ঘুরপ্যাঁচ, কলাম এবং গম্বুজগুলো যেভাবে স্থাপন করা হয়েছে, তাতে ওই প্রবাদ বাক্যটি সঠিক বলেই প্রমাণিত হয়।

রোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্য নমুনা এখনো বিশ্বজুড়ে দেখা যাবে।

যখন উনিশ শতকে নেপোলিয়ন তার নিজস্ব সাম্রাজ্য তৈরি করছিলেন, তিনি বেশ কয়েকটি পার্সিয়ান অবকাঠামো নির্মাণের আদেশ দেন, যা আসলে রোমানদের কাছ থেকেই ধার করা। উদাহরণ হিসাবে আর্ক ডে ট্রায়োম্ফ এবং প্যালেস ভেনডোমের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজের দিকেও একবার তাকিয়ে দেখুন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির এই বাসভবনের কলাম এবং তোড়ন পরিষ্কারভাবে প্রাচীন রোমেরই প্রতিনিধিত্ব করছে।