'বাংলাদেশে ১৩ বছর ধরে কয়লা চুরি হলেও তা এতদিন গোপন ছিল'

'বছরের পর বছর ধরে কয়লা চুরির ব্যাপারে কোনো রেকর্ড বা হিসাব রাখা হয়নি' (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, BARAPUKURIA COAL MINE COMPANY

ছবির ক্যাপশান, 'বছরের পর বছর ধরে কয়লা চুরির ব্যাপারে কোনো রেকর্ড বা হিসাব রাখা হয়নি' (ফাইল ছবি)
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের বড়পুকুরিয়ার খনি থেকে কয়লা চুরির ঘটনা কেন এতদিন গোপন রাখা হয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করতে বলেছে।

দিনাজপুরের ঐ খনি থেকে প্রায় দেড় লাখ টন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার খবর সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে এনিয়ে তোলপাড় চলছে।

সরকারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এতো কয়লা রাতারাতি গায়েব হয়ে যেতে পারে না।

কর্মকর্তারা বলছেন, গত ১৩ বছর ধরেই এসব কয়লা বড়ুপুকুরিয়া থেকে চুরি হয়েছে। কিন্তু এর কোন রেকর্ড খনির কাগজপত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।

এতো বিপুল পরিমাণ কয়লা কীভাবে গায়েব হয়ে গেল এবং এর সাথে কারা জড়িত- এনিয়েই এখন তদন্ত চলছে।

কয়লা চুরির কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পেট্রোবাংলা আলাদা আলাদাভাবে প্রাথমিক তদন্ত করেছে।

আরও পড়ুন:

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দু'টি তদন্তেই দেখা গেছে যে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কাগজপত্র অনুযায়ী সর্বশেষ ১লাখ ৪৭ হাজার টন কয়লা মজুদ থাকার কথা ছিল।কিন্তু মজুদ আছে মাত্র তিন হাজার টনের মতো।বাকি কয়লা নেই।

ফলে এই বিপুল পরিমাণ কয়লা গায়েব বা চুরি হওয়ার বিষয় কাগজপত্রে হিসাবে না রেখে গোপন করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, এত কয়লা চুরির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগেছে। কিন্তু সেই তথ্য কেন গোপন রাখা হয়েছে? তদন্তে সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজা হচ্ছে।

"তারা স্টকটাকে কেন আমাদের কাছে হাইড করলো? দেড় লাখ টন কয়লা, এটিকে যদি ট্রাকে করে নিতে হয়, তাহলে ১৫,০০০ ট্রাক লাগবে। এটা রাতারাতি সম্ভব নয়। যদি বছরে ১০০০ ট্রাকে করে নেয়া হয়, তাহলে ১৫ বছর লাগবে। তো দেখতে হবে, ঘটনাটি কী? অনেকগুলো বছর পার হয়েছে।একই স্টকতো বছর বছর দেখিয়েছে, সেটাওতো জানা দরকার।"

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি -ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, BARAPUKURIA COAL MINE COMPANY

ছবির ক্যাপশান, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি -ফাইল ছবি।

কয়লা খনির পক্ষ থেকে সিস্টেম লসের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই খনিতে উৎপাদন শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে।

তের বছর ধরেই সিস্টেম লসের কথা তাদের কাগজপত্রে নেই।

ফলে এতদিন ধরেই চুরি হচ্ছে বলে প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কয়লা উৎপাদন এবং মজুদ রাখার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস হয়। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ কয়লা না থাকার বিষয়কে সিস্টেম লসে নষ্ট হতে পারে না বলে তারা মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেছেন, তদন্তে কারিগরি দিকটা দেখা হচ্ছে না।

"খনি কর্তৃপক্ষ বলেছে যে সিস্টেম লস। এখন কয়লা উন্মুক্তভাবে রেখে দিলে, তখন এর কিছু পরিবর্তন হয়। আপনা আপনি কিছু অংশ পুড়ে যায়। তারপর বৃষ্টিপাতের মধ্যে রাখলে কিছু গুঁড়া সরে যাবে। তেমনি, খরাতে রাখলে ডাস্ট হয়ে কিছু উড়ে যাবে। এছাড়া কয়লা উঠানোর সময় কিছু পানি থাকে। প্রথমে ওজন করলে পানির ওজনও আসবে।"

"কিন্তু সিস্টেম লস যে হয়েছে, তার কোনো রেকর্ড তারা দেখাতে পারেনি। এখানেই হয়েছে সমস্যা।"

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ অবশ্য বলেছেন, পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটি বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়েছে কারিগরি দিকটা দেখার জন্য।

পেট্রোবাংলা প্রাথমিক তদন্তের প্রতিবেদন জ্বালানি মন্ত্রনালয়কে দিয়েছে।

এখন তারা বিস্তারিত তদন্ত করছে।

ঘটনার ব্যাপারে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তা মিলিয়ে ১৯জনের বিরুদ্ধে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থানায় একটি মামলা হয়েছে।

জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন এখন এই মামলায় তদন্ত করবে।

কিন্তু এই চুরির কেলেঙ্কারি ঘটনা সামাজিক নেটওয়ার্কে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে।

তবে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে এই চুরির ঘটনা এখন যে ধরা পড়েছে, সেটিকে তিনি তাদের সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখেন।

এদিক কয়লার অভাবে খনিটির পাশে ৫২৫ মেগাওয়টের বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি চালু করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কয়লা আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

এছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে এক মাসের মধ্যে আবার কয়লা উত্তোলন শুরুর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।