বিশ্বকাপ ফুটবল: ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন যে খেলোয়াড়রা

ছবির উৎস, Getty Images
কিছু বিশ্বকাপ আছে যা একেকজন তারকার নামের সাথে মিশে গেছে।
উনিশশ' আটান্ন আর সত্তুরের বিশ্বকাপ হয়ে গেছে পেলের বিশ্বকাপ, ১৯৮৬-র বিশ্বকাপ দিয়েগো মারাডোনার, ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপ যেমন জিনেদিন জিদানের, ২০০২-এর বিশ্বকাপও বলা যায় ন্যাড়ামাথা ব্রাজিলিয়ান রোনাল্ডোর।
এ যুগের সবচেয়ে বড় দুই তারকা আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, আর পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। হয়তো এদের কাছাকাছি ব্রাজিলের নেইমার।
কিন্তু এদের কেউই এখনো বিশ্বকাপ জেতেননি। তাই এদের কারো নামের সাথেই এখনো একটি বিশেষ বিশ্বকাপের স্মৃতি মিশে নেই।
আরো পড়ুন:
লিওনেল মেসি
সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেসি - গত বিশ্বকাপে। কিন্তু আর্জেন্টিনা ফাইনালে হেরে যায় জার্মানির কাছে।
এবার বিশ্বকাপে কারা হবেন ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়া খেলোয়াড়? এ প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে প্রথমেই মনে আসবে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির নাম। বিশ্বকাপ না জিতলেও - শুধু ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে তার খেলা দেখেই - অনেক ফুটবল পন্ডিত যাকে শুধু এ যুগের নয়, 'সর্বকালের সেরা' ফুটবলারদের একজন বলতে চান।
লিওনেল মেসির বয়স এখন প্রায় ৩১ - হয়তো এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, গতি, সৃষ্টিশীলতা, অসাধারণ পাসিং আর গোল করার ক্ষমতা মিলিয়ে তিনি এখনো যে কোন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবার মতোই খেলোয়াড়, কোন সন্দেহ নেই।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো
পর্তুগালের রোনাল্ডো - প্রকৃতপক্ষে এ দুজনের মধ্যে মেসি বড় খেলোয়াড়, নাকি রোনাল্ডো, এই বিতর্ক বোধ হয় কোনও দিনই শেষ হবে না।
রোনাল্ডো পর্তুগালকে ইউরো জিতিয়েছেন। কিন্তু রোনাল্ডো কি এই পর্তুগাল দলটিকে নিয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারবেন? পারলে তা হবে এক অসামান্য অর্জন - মারাডোনার ১৯৮৬র বিশ্বকাপ জেতার মতোই।
কিন্তু রোনাল্ডোর পর্তুগালের চাইতে দল হিসেবে হয়তো মেসি-র আর্জেন্টিনাই এগিয়ে, এমনটাই মনে করেন বেশির ভাগ ফুটবল পন্ডিত।
কিন্তু একা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবার ক্ষমতায় রোনাল্ডো মেসির চাইতে একটুও কম নন - একথাই বলবেন সবাই।

ছবির উৎস, NELSON ALMEIDA
নেইমার
একা ম্যাচ বের করে আনার ক্ষমতা রাখেন ব্রাজিলের নেইমারও - এবং তার সাথে আছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্রাজিল দল, এবং এবারের ব্রাজিল দলটি গত বিশ্বকাপের চাইতেও ভালো - বলছেন বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশ্লেষক পিয়ের ভিকারি।
"গত বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে ব্রাজিলের হারার কথা কেউই ভুলে যেতে পারবেন না। কিন্তু ওটা একবার ঘটেছে, খুব সম্ভবত: আর ঘটবে না। গতবারের দলটি যেমন নেইমারের ওপর নির্ভরশীল ছিল - এবার তা নয়।
কথাটা সত্যি। কারণ নেইমারের পেছনে মিডফিল্ডার হিসেবে ব্রাজিল দলে আছেন ফেলিপ কুতিনিও, উইলিয়ান, কাসেমিরো, ফার্নান্দিনিও, ফ্রেড বা ডগলাস কস্তার মতো অসাধারণ সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডাররা - যারা নেইমারকে বল যোগান দেবেন।"
কথাটা সত্যি। কারণ নেইমারের পেছনে মিডফিল্ডার হিসেবে ব্রাজিল দলে আছেন ফেলিপ কুতিনিও, উইলিয়ান, কাসেমিরো, ফার্নান্দিনিও, ফ্রেড বা ডগলাস কস্তার মতো অসাধারণ সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডাররা - যারা নেইমারকে বল যোগান দেবেন।
"ম্যানেজার হিসেবে চিচি দায়িত্ব নেবার পর থেকে ব্রাজিল ক্রমাগত উন্নতি করেছে, আর নেইমারের এখন যা বয়েস তাতে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়ের কাছাকাছি আছেন বলা যায়। তাই এবারের ব্রাজিল দলটি হয়তো নেইমারের সেরা খেলাটা খেলার উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে দেবে" - বলেন পিয়ের ভিকারি।

ছবির উৎস, Getty Images
লুইস সুয়ারেজ
বার্সেলোনায় একসময় ত্রিমুখী আক্রমণভাগ গড়ে উঠেছিল মেসি-নেইমার-সুয়ারেজকে নিয়ে। উরুগুয়ে দলে সেই লুইস সুয়ারেজ প্রধান ভরসা, এবং সবচাইতে বড় তারকা। তার সাথে আছেন এডিনসন কাভানি।
লুইস সুয়ারেজ মাত্র ১৯ বছর বয়েসে ইউরোপে প্রথম খেলতে আসেন । ইউরোপে তার শুরু ডাচ ক্লাব গ্রোনিংগেন, এর পর আয়াক্স, লিভারপুল এবং সেখান থেকে বার্সেলোনায়। শুরু থেকেই তিনি তার সহজাত গোল করার ক্ষমতা দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন।
এ ছাড়া আলোচিত হয়েছেন অন্তত: তিন বার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কামড়ে দিয়ে।
উরুগুয়ে এবার বিশ্বকাপ জিততে পারে এমন কথা কোন ফুটবল পন্ডিতই বলছেন না। তবে লুইস সুয়ারেজ এমন একজন খেলোয়াড় - যাকে উরুগুয়ের সব প্রতিপক্ষই সমীহ করে চলবে, কারণ তিনি যে কোন পরিস্থিতিতে গোল করে খেলার ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন।

ছবির উৎস, Getty Images
টমাস মুলার আর মেসুত ওজিল
বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে জার্মানি - তাদের দলে তারকারও অভাব নেই। কিন্তু কেন যেন জার্মান তারকারা অন্যদের মত অতটা বর্ণময় নন।
জার্মানদের দলীয় সংহতি আর খেলার শৃংখলা এমনই যে হয়তো একক প্রতিভার দ্যুতি সেভাবে আলাদা করে চোখে পড়ে না।
কিন্তু টমাস মুলার বা মেসুত ওজিলের মত তারকারা যে কোন ম্যাচের মোড় ঘুরিযে দিতে পারেন।
বায়ার্ন মিউনিখের টমাস মুলার বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ১০টি গোল করেছেন। কে জানে, এবার জ্বলে উঠলে তিনি হয়তো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬টি গোলের যে রেকর্ড এখন আরেক জার্মান মিরোস্লাভ ক্লোসার দখলে - তা ভেঙে দিতেও পারেন।

ছবির উৎস, TF-Images
মিডফিল্ডার মেসুত ওজিল খেলেন ইংলিশ লিগে আর্সেনালের হয়ে ।
দেখা গেছে, যেদিন ওজিল ভালো খেলেন সেদিন তিনিই মাঠের রাজা। আবার একেক দিন এমন হয় যে ওজিল যে মাঠে আছেন এটাই বোঝা যায় না।
তাই ওজিল ফর্মে থাকলে প্রতিপক্ষের জন্য তিনি বিরাট বিপদ।

ছবির উৎস, Soccrates Images
কেভিন ডি ব্রাইনা
বেলজিয়াম দলে এডিন আজার্ড, আর রোমেলু লুকাকু দুই নামী ইংলিশ ক্লাব চেলসি আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলার জন্য সবার পরিচিত তারকা।
কিন্তু বেলজিয়াম দলের মিডফিল্ডের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটি কেভিন ডি ব্রাইনা - যার আছে মাঠের যে কোন জায়গা থেকে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করার মতো পাস দেবার ক্ষমতা, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে বলকে এনে দেয় স্ট্রাইকারের পায়ে।
সেদিক থেকে বেলজিয়াম এবার কি করতে পারে তার অনেকখানিই নির্ভর করে কেভিন ডি ব্রাইনা কেমন খেলেন তার ওপর।

ছবির উৎস, Simon Stacpoole/Offside
পল পগবা
ফ্রান্সের পল পগবা জুভেন্টাসে থাকার সময়ই বিশ্বমানের তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন - কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এসে তিনি এখনো হয়তো ফ্যানদের সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেন নি।
কিন্তু ফ্রান্সের হয়ে মাঠে হয়তো ভিন্ন এক পগবাকে দেখা যেতে পারে। ফ্রান্স এবার দারুণ এক দল। তাদের স্ট্রাইকারদের মধ্যে আছেন আঁতোয়াঁ গ্রিজম্যান, কাইলিয়ান এমবাপ্পি, ওসমান ডেমবেলে, অলিভার জিরু, বা টমাস লিমারের মতো তারকারা।
মিডফিল্ডার হিসেবে এদের বল যোগান দেয়া, প্রতিপক্ষের সামনে যাওয়া ঠেকানো আর আক্রমণে সহায়তা দেয়া - সব ক্ষেত্রেই ফ্রান্স দলে পল পগবাই হচ্ছেন কেন্দ্রবিন্দু।
পগবা ফর্মে থাকলে ফ্রান্স হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য এক দল।
ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে এটলেটিকো মাদ্রিদের উত্থানের পেছনে ফ্রান্সের আঁতোয়াঁ গ্রিজম্যানের ভুমিকা অনস্বীকার্য। তিনি, এবং দুই উঠতি স্ট্রাইকার উসমান ডেমবেলে আর কাইলিয়ান এমবাপ্পি - এদের যে কেউ এবার বিশ্বকাপের আসরে নিজেদের বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন।

ছবির উৎস, EVARISTO SA
সেরজিও এগুয়েরো
আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির জন্য কারো কারো হয়তো এগুয়েরোর কথা মনে না পড়তে পারে। কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা বছরের পর বছর দেখিয়েছেন তার গোল করার ক্ষমতা। তিনি দারুণ ফিনিশার অর্থাৎ গোলমুখে এসে ভুল করেন খুব কম।
এমন হতে পারে যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা মেসিকে আটকাতেই বেশি ব্যস্ত থাকলে এগুয়েরোর সামনেই হয়তো বেশি গোলের সুযোগ আসতে পারে।
তাই এগুয়েরো হয়ে উঠতে পারেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া খেলোয়াড়। তার সাথে আরো আছেন গনজালো হিগুয়াইন আর পাওলো দিবালা - যারা ক্লাব স্তরে জুভেন্টাসে খেলেন।

ছবির উৎস, Robbie Jay Barratt - AMA
মোহাম্মদ সালাহ
এবার আফ্রিকা মহাদেশের দলগুলো গ্রুপ পর্ব ছাড়িয়ে খুব বেশি দূর যাবে এমনটা অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন না। সাবেক নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড পিটার ওদেমউই্ঙ্গি বলছিলেন, তার মতো আফ্রিকান ফুটবল নিয়ে ১৯৯০এর দশকে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা পিছিয়ে গেছে। কিন্তু এবার বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে তিনটি উত্তর আফ্রিকান দেশ তিউনিসিয়া, মরক্কো আর মিশরকে - যাদের ফুটবলাররা ওদেমউইঙ্গির ভাষায় 'বেশি বুদ্ধিমান' এবং শারীরিকভাবেও বেশি হালকাপাতলা, দ্রুতগতি সম্পন্ন।
এর সেরা উদাহরণ বোধ হয় মিশরের মোহাম্মদ সালাহ। তার দেশ মিশর বিশ্বকাপে খেলছে ২৮ বছর পর। মোহাম্মদ সালাহ লিভারপুলের হয়ে ইউরোপ মাতিয়েছেন এ মওসুমে, করেছেন একটার পর একটা বুদ্ধিদীপ্ত সব গোল।
মোহাম্মদ সালাহ এখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের চোট থেকে সেরে ওঠার পথে। তিনি কি মিশরকে কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? মিশরের গ্রুপে আছে উরুগুয়ে, সৌদি আরব আর স্বাগতিক রাশিয়া।
অনেকেই হয়তো বলবেন, অসম্ভব নয়।
ইসকো

ছবির উৎস, Antonio Villalba
স্পেন ও রেয়াল মাদ্রিদের ইসকোকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। তিনি এবার এমন একটি স্পেন দলের অন্যতম সদস্য - যাতে তারকার ছড়াছড়ি।
স্পেন ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দাভি দা হে' অনেকের মতেই পৃথিবীর সেরা গোলরক্ষক । তার সাথে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির দাভিদ সিলভা, এ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের দিয়েগো কস্তা, বার্সেলোনার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জেরার্ড পিকে, জর্ডি আলবা, আর সেরজিও বুসকেট, আর রেয়াল মাদ্রিদের মার্কো আসেনসিও, সেরজিও রামোস, আর ড্যানি কারভায়াল।
এত তারকার মধ্যেও ইসকোকে মানা হয় স্পেনের ভবিষ্যত উজ্জ্বল তারকা হিসেবে । তার ড্রিবলিং ও পাসিং দক্ষতা এবং খেলার গতিপথ বুঝতে পারার ক্ষমতার মধ্যে অনেকে জিনেদিন জিদানের ছায়া দেখতে পান।
স্পেন এবার রয়েছে পর্তুগাল. মরক্কো আর ইরানের সাথে। ২০১০-এর বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন আর ইউরোজয়ী পর্তুগাল এক গ্রুপে - তাই এটিকেই বলা হচ্ছে 'গ্রুপ অব ডেথ'।
হয়তো এক্ষেত্রে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন ইসকো।

ছবির উৎস, Tottenham Hotspur FC
হ্যারি কেন
ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন প্রিমিয়ার লিগে টটেনহ্যামের হয়ে তিন মৌসুমে ১৫০টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১০৮টি , ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ২৪টি আতর্জাতিক ম্যাচ - গোল করেছেন ১৩টি।
তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক অসাধারণ স্ট্রাইকার হিসেবে - যাকে নিয়ে টটেনহ্যাম গত মৌসুমে রেয়াল মাদ্রিদের মত দলকে হারিয়েছে। গোলস্কোরার হিসেবে হ্যরি কেনের শুটিং এবং হেডিং দুটোই সমান কার্যকর।
রেয়ালের ম্যানেজার এবং ফুটবল কিংবদন্তী জিনেদিন জিদানের মত লোকও বলেছেন, হ্যারি কেন একজন পূর্ণাঙ্গ খেলোয়াড়।
ইংল্যান্ডকে নিয়ে কোন ফুটবল পন্ডিতই বেশি কিছু আশা করেন না - কিন্তু এবারের দলটি নিয়ে ইংলিশ ফুটবল ভক্তরা গোপনে গোপনে একটা ভালো কিছুরই আশা করছেন।
সে আশার পেছনে একটা বড় কারণ যে হ্যারি কেন - তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:










