আজকের ভারত: ভয়ের কবলে 'গণতন্ত্রের উৎসব'

মালবী গুপ্ত

ছবির উৎস, মালবী গুপ্ত

    • Author, মালবী গুপ্ত
    • Role, সাংবাদিক, কলকাতা

ইদানীং আমার কেবলই মনে হচ্ছে, আমরা সবাই যেন এক অদ্ভুত ভয়ের আবহে দিন কাটাচ্ছি। জীবনের সর্বত্রই ঘোর এক অনিশ্চয়তা আর অনিরাপত্তার বলয় আমাদের ঘিরে রেখেছে সর্বক্ষণ।

তাই কি পারিবারিক, কী সামাজিক, কী রাজনৈতিক জীবনে আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু - অযুত ঘটনা প্রবাহে নানাবিধ অদৃশ্য ভয় আমাদের ক্রমাগত তাড়া করে ফিরছে। এবং আমার মনে হচ্ছে, যে ভয় থেকে পরিত্রাণের কোনও দৃশ্যমান উপায়ও খুঁজে পাচ্ছি না আমরা।

যেমন চিরকাল দেখে আসছি, যে দলই শাসনদণ্ড হাতে নিক না কেন, সিংহাসনে যে মন্ত্রীই আসীন হন না কেন, সিংহাসনের 'মহিমা' বা 'কালিমা' বজায় রাখার সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

প্রতিনিয়ত দেখছি রাজনৈতিক দলের যে সব ছোট বড় নেতা, প্রাক্তন ও বর্তমান মন্ত্রীরা, সকাল সন্ধ্যে গলার শির ফুলিয়ে কথায় কথায় সংবিধানকে 'কোট' করছেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে আস্ফালন করছেন মিছিলে সমাবেশে, নিজেরা গণতন্ত্রের কত বড় পূজারি তার হিসেব দিচ্ছেন - তাঁরাই তত নির্লজ্জের মতো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে চলেছেন। এবং কেউ তা করছেন অত্যন্ত স্থূল ভাবে একেবারে ডাণ্ডা মেরে মাথা ফাটিয়ে, খুন খারাপি করে ( নাহ, অবশ্যই স্বহস্তে নয়)।

কেউ আবার খুব সূক্ষ্ম ভাবে নানা কৌশলে, আমজনতাকে বুঝতে না দিয়ে কেড়ে নিচ্ছেন সেই অধিকার। আর সেই কেড়ে নেওয়ার পদ্ধতিতেই ওতপ্রোত জড়িয়ে যাচ্ছে বিপুল হিংসা ও বিপুল ভয়।

মে মাসের ১৬ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে পুলিশ প্রহরায় ভোট গ্রহণ।

ছবির উৎস, DIPTENDU DUTTA

ছবির ক্যাপশান, নতুন পশ্চিমবঙ্গে পুরাতন সহিংসতা: ভোট কেন্দ্রে পুলিশ প্রহরা।

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত ভোট পর্বের দিকে একবার চোখ ফেরালেই বিষয়টির অনুধাবন সহজ হয়। দেখা গেল 'পরিবর্তিত' পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক হিংসা যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করেছে, তা যেন ছাপিয়ে গেছে সব কিছুকে। কেউ কেউ অবশ্য এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন আগের রাজত্বে ঘটে যাওয়া সব ভয় ও সব হিংসার কথা।

মনে পড়ছে বইকি। আগে কোথাও কোথাও মহিলাদের সাদা থান পাঠিয়ে দলের বিরুদ্ধে পুরুষদের ভোটে না দাঁড়াবার জন্য হুমকি দেওয়া হত। লাশও পড়ত। যা পরের দিন কাগজে উঠে আসতো।

তবে এখন আমাদের হিংসার একেবারে লাইভ শো' দেখতে হচ্ছে। দেখতে হচ্ছে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে যাওয়া মহিলা প্রার্থীদের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে প্রবল মারের দৃশ্যও। আবার একেবারে দা কাটারি পিস্তল নিয়ে ত্রাস সৃষ্টিকারী বাইক মিছিল, তাদের হাতে সরাসরি 'লাশ' হয়ে যাওয়ার ভীতিপ্রদ ছবিও দেখতে হচ্ছে।

তবে 'চুপ, শব্দ কর না', 'গণতন্ত্রের উৎসব' চলছে। হ্যাঁ, কে যেন বলেছিলেন, ভোট হল 'গণতন্ত্রের উৎসব'। উৎসবই বটে। আর কে না জানে আমাদের দেশে সেই প্রাচীন কাল থেকেই আজও পূজা-পার্বণ-উৎসবে বলির প্রথা চালু রয়েছে।

পশুবলির পাশাপাশি একসময় নরবলিও তো দেওয়া হত। মনে নেই - বঙ্কিম চন্দ্রের কপালকুণ্ডলা'য় নবকুমার তো প্রায় বলি হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন।

মে মাসের ১৭ তারিখে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর কলকাতার ভোট গণনা কেন্দ্রের বাইরে তৃণমূল সমর্থকদের বিজয় আনন্দ।

ছবির উৎস, DIBYANGSHU SARKAR

ছবির ক্যাপশান, ক্ষমতাসীনদের ভয় জয়: বিজয়ী তৃণমূল সমর্থকদের উল্লাস।

পশ্চিমবঙ্গে সেই প্রথা আজও ভক্তিভরে অনুসরণ করা হচ্ছে। কি শাসক দল, কি বিরোধী দল - নাহ, সেই ঐতিহ্যের অবমাননা কেউই করেনি। তাই 'গণতন্ত্রের উৎসব' পালনের সময় হলেই গ্রামে গঞ্জে শহরে কাড়া নাকাড়া বেজে ওঠে। খাঁড়া হাতে চ্যালা চামুণ্ডা 'বলি' খুঁজতে পথে বেরিয়ে পড়ে। ঠিক যেমন এবারের পঞ্চায়েত ভোটরঙ্গেও দেখলাম।

রীতিমত আগাম ঘোষিত 'বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত'র পুরস্কার পেতে, প্রাণ বাঁচানোর ভয়ে, অনেকেই প্রার্থী পদ তুলে নিয়ে শাসক দলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। অনেক বিরোধী দলের নেতা, কর্মী, পদ প্রার্থী আবার ভয়ে পাড়া ছাড়া, গ্রাম ছাড়া হয়ে আছেন। আর যারা পালাতে পারেন নি তাঁদের 'গণতন্ত্রের উৎসব'র যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়েছে।

হ্যাঁ, নিতান্ত নিরীহও কেউ কেউ মাঝপথে পড়ে যাওয়ায় বলি হয়েছেন বটে। অবশ্য তাতে কি? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এমন দু'চারজনের প্রাণ নিয়ে মাথা ঘামানো অনুচিত।

এবারের 'উৎসব'এ উৎসর্গীকৃত বলি কত তা নিয়ে অবশ্যই মতভেদ আছে। তবে সংখ্যা যাই হোক, আমার মনে হয় না ভারতের আর কোনো রাজ্যে 'গণতন্ত্রের উৎসব'র নামে এত হানাহানি, এত রক্তপাত, এত হত্যা, এমন দিগন্ত বিস্তৃত গা ছমছমে ভয়ের পতাকা ওড়ানো হয়।

পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতার প্রতিবাদ মে মাসের ১৭ তারিখে দিল্লির শিবাজী স্টেডিয়ামের সামনে সিপিএম সমর্থকদের বিক্ষোভ।

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, পুরাতন ক্ষমতাবানদের নতুন ভয়: এক সময়ের প্রতাপশালী সিপিএমও কি নতুন ক্ষমতাসীনদের ভয়ের চোখে দেখছে?

ইদানীং এও দেখা যাচ্ছে যে, শাসকদের কাজের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলে, সে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধে বা কার্টুনেই হোক, কিম্বা স্যোশাল মিডিয়াতেই হোক, বা তাদের কোনো অন্যায়, কোনো দুর্নীতি বা মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করলে, সমালোচনা করলে, এমনকি আদালতে সে ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন তুললেও, হয় 'মাওবাদী', নয় 'দেশদ্রোহী'র স্ট্যাম্প অনায়াসে তার গায়ে লাগিয়ে দেওয়া যায়।

তাতে 'তিনি' সতর্ক না হলে সরকারি পেয়াদা এসে 'তিনি' সমাজের পক্ষে 'বিপজ্জনক' বলে হাজতে পোরা যায় তাঁকে। নয়তো নানা হুমকি দিয়ে তাঁর চারপাশে মৃত্যুভয়ের জাল বিছিয়ে দেওয়া যায়। তাতেও পিছু না হটলে, যে কোনো জায়গায় যে কোনো দিন তাঁর মৃতদেহ পাওয়া আজ আর কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।

পিছন ফিরে তাকালে বিগত কয়েক বছরে সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, সমাজকর্মীর মতো বিশিষ্ট মানুষের জীবনে এমন বহু ভয়ের হুমকি, বহু খুনের ঘটনা চোখে ভেসে ওঠে। আসলে মনে হয় শাসনে যারা থাকেন সেই ক্ষমতাসীনদের এক দিকে থাকে ক্ষমতা হারানোর ভয়। আর অন্য দিকে ক্ষমতাহীনদের আবারও পরাজয়ের ভয়। ভয় আসলে সঙ্গ ছাড়ে না কারো।

কিন্তু ভয় যে নিতান্ত সাধারণ মানুষদেরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে।

যে ভয় জন্ম নেয় নানা অপ্রাপ্তি, নানা ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা ও নানা রকমের হিংসা থেকে। যে হিংসা কখনো ব্যর্থ প্রেম, প্রতিহিংসা, যৌন লালসা, অর্থের লোভ, বা পারিবারিক সম্মান রক্ষা'র হাত ধরে।

যে হিংসা কখনো হাত ধরে জাতি-বর্ণ-ধর্ম বিদ্বেষ'র। আর তাবৎ সংবাদ মাধ্যমে, স্যোশাল মিডিয়ায় প্রদর্শিত সেইসব হিংসাই তো গণপ্রহার, গণধর্ষণ ও হত্যার অস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের কেবলই ভয় দেখাতে থাকে।