বাংলাদেশে গণপরিবহনের চালকদের ইয়াবা গ্রহণের কারণ কী

ইয়াবা গ্রহণের কারণ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার গাড়িচালকদের প্রায় অর্ধেকই ইয়াবার মতো মাদকাসক্ত বলে অভিযোগ করছেন পরিবহন মালিকরা।
    • Author, ফারহানা পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিবহন মালিকদের সংগঠন বলছে, ঢাকা শহরের পরিবহন শ্রমিকদের প্রায় ৫০ শতাংশই মাদক সেবন করে। এর বেশির ভাগই আবার ইয়াবা খাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে আহ্বান জানিয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকায় বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

এর প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর নাট্যমঞ্চে পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং ঢাকা মহানগর মেট্রোপলিটান পুলিশের একটি যৌথ সভা হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি উঠে আসে।

মাদকসেবী চালকদের সংখ্যা বাড়ছে?

ঢাকায় পরিবহন মালিকদের সংগঠন বলছে, ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে গণপরিবহন রয়েছে ৫ হাজার।

সংগঠনটির জেনারেল সেক্রেটারি খন্দকার এনায়েতুল্লাহ সেখানে বলেন, ঢাকা শহরে প্রায় ৫০ হাজার পরিবহন শ্রমিক রয়েছে যার ৫০ শতাংশই মাদকাসক্ত।

"বাংলাদেশে ইয়াবা এখন অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে। যেখানে সেখানে ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। ইয়াবা আসক্ত হয়ে যাচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা," তিনি বলছেন।

মি. এনাতুল্লাহ ইয়াবা গ্রহণকারী চালকদের ধরে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগের প্রতি।

তবে ফুলবাড়িয়া পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নূরুল আমিন নূরু বলছেন, শ্রমিকদের মাদক সেবনের অভিযোগ সত্য, তবে এটা এখনো মহামারীর আকার নেয় নি।

তিনি বলেন, কিছু শ্রমিকের মধ্যে মাদকাসক্তি আছে এটা ঠিক, তবে 'আশি শতাংশ ড্রাইভার, কন্ডাকটর, হেল্পার এখনো ভালো আছে।'

"তারা বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে কোন চালক মাদকসেবী হলে তাকে গাড়ি চালানো থেকে বিরত রাখতে, বা বিশ্রাম দিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছেন," তিনি জানান।

ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিকের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মীর রেজাউল আলম বলছিলেন, যদি অ্যালকোহল গ্রহণ করে চালকরা তাহলে তা যন্ত্রের সাহায্যে সঙ্গে সঙ্গে সনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু ইয়াবা গ্রহণ করলে রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে - যেটা সময়সাপেক্ষ।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

বাংলাদেশ পরিবহন মাদকাসক্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরিবহন মালিকরা বলছেন, প্রায় অর্ধেক পরিবহন শ্রমিকই মাদকাসক্ত

গাড়ি চালানোর সময় ইয়াবার প্রভাব কী?

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন শ্রমিকরা নানা রকম চাপের মধ্যে থেকে গাড়ি চালান, এবং এর সাথে ইয়াবা গ্রহণ যোগ হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

একজন গাড়িচালক যদি ইয়াবা সেবন করেন তাহলে তার ওপর এর কেমন প্রভাব পড়তে পারে জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের একজন শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ সাইফুন নেওয়াজের কাছে।

তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশের চালকরা মূলত কাজ করেন অনেকরকম চাপের মধ্যে। সেখানে যদি একজন চালক ইয়াবা সেবন করে গাড়ি চালায়, তাহলে তা অ্যাকসিডেন্টের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলছিলেন, "একজন চালক যদি ইয়াবা সেবন করে গাড়ি চালায় তাহলে সে নিজেকে খুব অ্যাক্টিভ বোধ করবে। সে নিজেকে অতি আত্মবিশ্বাসী বোধ করবে। এর ফলে সে বিপদজনকভাবে অন্য গাড়িকে ওভারটেক করতে পারে। রাস্তার ঝুঁকিগুলোকে তার ঝুঁকি মনে না-ও হতে পারে"।

মি. নেওয়াজ আরো বলছিলেন, "তার পারসেপশন রিয়্যাকশন টাইমটা বেড়ে যাবে। অর্থাৎ একটা ঝুঁকি দেখার পর তার প্রতিক্রিয়া হবে একটু দেরিতে - দেখা যাবে ব্রেক চাপছে বা গাড়িটা কন্ট্রোল করছে একটু দেরিতে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশ পরিবহন মাদকাসক্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার একটি ব্যস্ত রাস্তায় বিশৃঙ্খলভাবে চলছে বিভিন্ন যানবাহন

'বেশি ট্রিপ দেয়ার তাড়া'

এদিকে অনেকে অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশে চালকদের কোন নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা বা নিয়োগ পদ্ধতি না থাকায় যে যত বেশি ট্রিপ নিতে পারে সেটাই তাদের লাভ।

এটাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাদক হিসেবে ইয়াবা নিতে সহায়ক কারণ হিসেবে কাজ করে।

চালকদের কর্মঘন্টাকে এখনো কোন একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা হয়নি কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবহন মালিকদের সংগঠন - জেনারেল সেক্রেটারি খন্দকার এনাতুল্লাহ দেশের পরিবহন ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন।

"ইউরোপ, আমেরিকার কর্মঘন্টার সাথে যদি আপনি বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরকে মেলাতে যান, তাহলে সেটাতো আপনি পারবেন না। একটি বাস বা ট্রাক উত্তরবঙ্গে যেতে গেলে কত ঘণ্টা লাগে? সেখানে কি কর্মঘন্টা ঠিক রাখা সম্ভব" বলছিলেন তিনি।

ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ বলছে, চালক যদি ইয়াবা সেবন করে সেটা দ্রুত সনাক্ত করার জন্য ব্যবস্থা কী নেয়া যেতে পারে - তার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

এদিকে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বলছে, ২০১৭ সালে পরিবহন খাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেছে, যার সংখ্যা ৩০৭ জন।