ভারতে শিশু ধর্ষণের সাজা ফাঁসি, কাজে দেবে?

শিশু ধর্ষণ নিয়ে ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিশু ধর্ষণ নিয়ে ভারতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা শনিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও শিশুকে ধর্ষণ করার জন্য এবার থেকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হবে। আইন সংশোধন করতে একটি অর্ডিন্যান্স জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এমন এক দিনে শিশু-ধর্ষণের জন্য ফাঁসির সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মন্ত্রীসভা, যেদিন মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে ৮ মাস বয়সী এক সদ্যোজাত কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগে একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

ইন্দোরের পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোর রাতে শহরের অভিজাত এলাকার ফুটপাথে যখন ওই সদ্যোজাত কন্যা-শিশুটি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়েছিল, তখনই তাকে অপহরণ করে এক যুবক। তাকে একটি হোটেলের বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। বেলার দিকে ওই কন্যা-শিশুর দেহ খুঁজে পাওয়া যায়। এই ঘটনায় ওই শিশুটিরই এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভারতে সম্প্রতি শিশু ধর্ষণের বেশ কয়েকটি ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরে ৮ বছরের এক কন্যা-শিশুকে সাতদিন ধরে অপহরণ করে গণধর্ষণ ও তারপরে হত্যা করার ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্ডিন্যান্স জারি করে 'পকসো আইন' বা শিশুদের ওপরে যৌন নির্যাতন রোধী আইন সংশোধন করা হবে। একই সঙ্গে বদল ঘটানো হবে ভারতীয় দণ্ডবিধিতেও।

বর্তমানে আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হল আজীবন কারাবাস, আর সর্বনিম্ন শাস্তি ৭ বছরের জেল। তবে ধর্ষণের পরে যদি নির্যাতিতা মারা যান বা চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়েন, সেই সব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য বছর কয়েক আগে আইন বদল হয়েছে।

ধর্ষণের জন্য ফাঁসির দাবিতে কাশ্মীরে বিক্ষোভ মিছিল

ছবির উৎস, TAUSEEF MUSTAFA

ছবির ক্যাপশান, ধর্ষণের জন্য ফাঁসির দাবিতে কাশ্মীরে বিক্ষোভ মিছিল

ধর্ষিতা শিশুর জীবন নাশের হুমকি বাড়বে?

যদিও শনিবার মন্ত্রীসভা আইন বদল করে শিশু-ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হিসাবে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে এ নিয়ে ভারতে বিতর্কও রয়েছে।

দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল গত আটদিন ধরে অনশন করছেন ধর্ষকদের জন্য ফাঁসির সাজা দেওয়ার দাবীতে। নির্যাতিতাদের পরিবারগুলিও প্রায় সবক্ষেত্রেই দাবী করে থাকে যে ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক।

অন্যদিকে অনেক নারী ও শিশু অধিকার কর্মীরা মনে করেন যে ধর্ষকদের ফাঁসির সাজার বিধান আনলে ধর্ষিতাকে প্রাণনাশের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ফাঁসির সাজা হওয়ার আশঙ্কায় সাক্ষ্য-প্রমাণ ধ্বংস করতে তাকে হত্যার পথ নিতে পারে ধর্ষকরা।

নারী আন্দোলনের কর্মী শাশ্বতী ঘোষ বিবিসিকে বলেন, "আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী নই। যদি ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়, তাহলে ফাঁসি হওয়াই উচিত। কিন্তু ভয়টা হচ্ছে, যদি ধর্ষণের সাজা ফাঁসি হয়, তাহলে ধর্ষিতার বেঁচে থাকার যেটুকু সম্ভাবনা থাকে, সেটাও শেষ হয়ে যাবে। কারণ তখন ধর্ষক ভাববে, মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখলে তাকে তো ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।"

সর্বভারতীয় স্তরে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'ক্রাই' বলছে - শিশুদের ওপরে নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকারকে একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হত, কিন্তু যেভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা কিছুটা 'নীজার্ক রিঅ্যাকশন'।"

সংস্থাটির অন্যতম ডিরেক্টর কোমল গানোত্রা বলছেন, "৯৫% ক্ষেত্রেই যেহেতু শিশুর ওপরে নির্যাতনকারীরা তাদেরই পরিচিত, তাই এবার থেকে হয়ত বাড়ির চার দেওয়ালের বাইরে ধর্ষনের ঘটনাগুলো আর বেরবেই না।"

অনেক অধিকার আন্দোলন কর্মী এমনে অভিযোগ করেন, ২০১২ সালে দিল্লিতে গণ-ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনার পর আইনে অনেক কড়াকড়ি করা হলেও, ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে ছাড়া কমছে না।

ভারতে সব ধরণের অপরাধের যে সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো বা এন সি আর বি, তাতে দেখা গেছে ২০১৬ সালে সারা দেশে ধর্ষিতা হয়েছে প্রায় কুড়ি হাজার কন্যা শিশু।

এই পরিসংখ্যান অবশ্য শুধুই কন্যা-শিশুদের ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের। কিন্তু সমাজকর্মীরা বলছেন একটা বিরাট সংখ্যক পুত্রশিশু বা কিশোরেরাও নিয়মিত যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে ভারতে - যার একমাত্র সরকারী পরিসংখ্যান পাওয়া গিয়েছিল ২০০৭ সালে।

জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্যেই দেখা যাচ্ছে যে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫৭ হাজারেরও বেশী শিশু ধর্ষণের মামলা ভারতের নানা আদালতে চলছে। অভিযুক্তদের শাস্তি পাওয়ার হারও মাত্র ২৮ শতাংশ।