একুশে বইমেলা: ভয়ের ছায়া এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় লেখক-প্রকাশকদের

ছবির উৎস, BBC
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে 'অমর একুশে গ্রন্থ মেলার' চালচিত্র গত কয়েক বছর ধরে অনেকটাই বদলে গেছে।
বইমেলায় কোন ধরনের বই আসছে সেটি নিয়ে গত দুই বছর ধরেই বেশ সজাগ মেলা কর্তৃপক্ষ।
তাদের সুচারু দৃষ্টি নিবন্ধিত থাকে মূলত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে।
২০১৫ সালে মেলা বাইরে ফুটপাতে শত-শত মানুষের সামনে লেখক অভিজিত রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর থেকেই বই মেলা আসলেই একটি বাড়তি সতর্কতা দেখা যায়।
লেখক অভিজিত রায়কে হত্যার পর একে একে বেশ কয়েকজন ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এরপর থেকেই কট্টরপন্থী ইসলামী সংগঠনগুলোর ভয়ে অনেক লেখক নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।
লেখক সাদিয়া আফরিনের একটি বই এবারের মেলায় প্রকাশিত হবে। কিন্তু এ বইতে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছে ছিল এমন কয়েকটি প্রবন্ধ তিনি নিজেই বাদ দিয়েছেন ।

ছবির উৎস, BBC BANGLA
তাঁর আশংকা যদি এসব লেখা প্রকাশিত হয় তাহলে অনেকে সেগুলোকে ইস্যু করে তার জীবন হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সাদিয়া আফরিন বলেন, " যে উদ্বেগটা শুরু হয়েছে সেখান থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। আপনি কোন অনুভূতির জায়গা থেকে আমার লেখাটা দেখবেন - এটা চিন্তা করে আমি লিখব? নাকি আমরা লেখাটা আমি লিখব? "
ভয় বা উদ্বেগের জায়গাটি শুধু প্রথা বিরোধী লেখকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। প্রকাশকদের উদ্বেগও একই পর্যায়ে আছে।
জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে তাঁর অফিসেই কুপিয়ে হত্যা করেছিল উগ্র ইসলামপন্থীরা।
কারণ তিনি ছিলেন অভিজিত রায়ের কয়েকটি বইয়ের প্রকাশক।
সে ঘটনা প্রকাশকদের মনে ব্যাপক আতংক এবং উদ্বেগ ছড়িয়েছিল।
ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান এখন জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম প্রকাশকরা সে ভয় থেকে কতটা বের হয়ে আসতে পেরেছেন?

ছবির উৎস, BBC BANGLA
রাজিয়া রহমান বলেন, " যেহেতু একটা চরম ত্যাগ আমাদের স্বীকার করতে হয়েছে, সেখান থেকে উঠে আসা এতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। ভিন্নমত গ্রহণ করার মানসিকতা এখানে এখনো তৈরি হয়নি। বই প্রকাশের আগে আমি অবশ্যই চিন্তা করি।"
প্রকাশকরা কতটা সাবধানী হয়েছেন, সেটি তাদের সাথে কথা বললে সহজেই বোঝা যায়।
বেশ কিছু শর্ত মেনে বাংলা একাডেমির মেলায় তাদের অংশ নিতে হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ প্রকাশক এবং লেখকদের নানা পরামর্শ দিচ্ছে।
যার মূল বিষয় হচ্ছে, 'বিতর্কিত বই' যাতে প্রকাশ না করা হয়। শ্রাবণ প্রকাশনীর কর্ণধার রবীন আহসান জানালেন, শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদই নয়. কর্তৃপক্ষের নানা বিধিনিষেধের কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।
" আমি গত বছর তসলিমা নাসরিনের একটি বই প্রকাশ করেছি। সেখানে থেকে তিনটি লেখা বাদ দিয়ে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। আমার ২০ বছরের প্রকাশনা জীবনে এটা বড় একটা পরাজয়। ।এটা করতে আমি বাধ্য হয়েছি, " বলছিলেন রবীন আহসান।
উগ্র ইসলামপন্থীদের হাতে একের পর লেখক প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে সরকারের দিক থেকে প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে যাতে 'সীমা লঙ্ঘন' না করা হয়।
লেখকরা বলছেন, নানামুখী চাপে চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।
এখন শুধু নির্ভেজাল প্রেমের গল্প কিংবা কবিতা প্রকাশ করাকেই অনেকে নিরাপদ মনে করেন।
লেখক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, একজন লেখক যদি নানা ধরনের বিধি-নিষেধ এবং উদ্বেগের মাঝে থাকে তাহলে সেটি সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, " বইয়ের মধ্যে যদি চিন্তা না থাকে, তাহলে বই আর বই হয়না। বই তো কেবল কতগুলো শব্দ না। বইয়ের ক্ষেত্রে গভীরতা আসে চিন্তা থেকে। চিন্তার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব থাকতে হবে। একজন লেখক লিখবেন, আরেকজন লেখক অন্যভাবে লিখবেন । সেটা নিয়ে বিতর্ক করবে। পাঠক প্রতিক্রিয়া জানাবে। তার মধ্য দিয়ে চিন্তার শক্তি বিকশিত হবে।"
সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, গত দুই বছর ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার কারণে লেখক প্রকাশকের আর কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি।
কিন্তু লেখরা মনে করেন, মুক্ত চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিপদ কেটে যায়নি। তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন বলেই এ ধরনের ঘটনা বন্ধ রয়েছে। যেমনটা বলেছেন লেখক সাদিয়া আফরিন।
তিনি বলেন, " আমরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছি বলেই এ ধরনের ঘটনা আর ঘটছে না। নানা ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ হয়েছে। "

ছবির উৎস, BBC BANGLA
লেখক ও বিশ্লেষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে উগ্রপন্থীরা লেখক ও প্রকাশকদের উপর যে ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, এখন সেটিই ঘটছে। সেই সাথে রাষ্ট্রের দিক থেকে নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করার কারণে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে না বলেই তাঁর ধারণা .
অধ্যাপক চৌধুরীর ভাষায়, "মৌলবাদীদের জয় হচ্ছে। তারা এ জিনিসই চাচ্ছিল। লেখকদের সংকুচিত করে ফেলা। তারা তো চেয়েছিল লেখক প্রকাশকদের মাঝে আতংক তৈরি করে তাদের চিন্তার জায়গা সংকুচিত করে দিতে।"
বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বরাবরই বলছে যে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতি বছর মেলা পরিচালিত হয়। প্রকাশকদের সেটি মেনে চলতে হয়।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান অবশ্য দাবী করছেন একাডেমি কোন ধরনের সেন্সরশিপ আরোপের পক্ষে নয়।
লেখকদের স্বাধীনতায় তারা বিশ্বাস করেন বলে দাবী করেন মি: খান।
তবে লেখক-প্রকাশকরা মনে করেন, ধর্মীয় অনুভূতি সংক্রান্ত বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সেটিকে তারা অনভিপ্রেত হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের ভাষায় অল্প কিছু ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পুরো মেলাকে তারা বিপাকে ফেলতে চান না।
তারা বলছেন, বইমেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।








