বিজয়ের প্রায় পাঁচ দশক: কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ?

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, শায়লা রুখসানা
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
মুক্তিযুদ্ধের ৪৭তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে বাংলাদেশ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে ধরণের সমাজ বা রাষ্ট্র চেয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষেরা - তার প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে এখন কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
কোন কোন ক্ষেত্রে এগিয়েছে? আর কোন দিকে পিছিয়ে আছে? এ প্রশ্ন নিয়ে কথা হয়েছিল বেশ কয়েকজনের সাথে।
একাত্তরে মোঃ আবু নাসের ছিলেন তরুণ, তিনি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন দেশকে ভালবেসে।
এই সময়ে এসে কি অবস্থায় দেখছেন দেশকে? এমন প্রশ্নে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে মি. নাসের বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "অনেক দিকে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু লাগামহীন দুর্নীতি সেখানে বড় অন্তরায়"।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর থেকে প্রায় ৫ দশক হতে চলেছে। প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তি মিলছে না অনেকের মতেই । তবু কেউ আশাবাদী, কেউ তা-ও হতে পারছেন না।
"আমি মনে করি স্বাধীন হলেও রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক মুক্তি হয়নি। সবাই যেভাবে আয় করে সে তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি। আবার রাজনৈতিক অধিকারগুলি কমে গেছে। আগে যেভাবে অনেককিছু বলতে পারতো এখন আর সেভাবে পারে না" - বলছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন বাসিন্দা।
কথা হলো বনানী এলাকায় একজন মহিলার সাথে । তিনি বলছিলেন, "যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে বাংলাদেশের মানুষ তো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না"।
তবে গুলশানের বাসিন্দা আরেকজন মহিলা মনে করেন, সবই যে বাংলাদেশে খারাপ হয়েছে তা নয়।
"অনেককিছুই ইতিবাচক হয়েছে। যেভাবে এগুচ্ছে সেভাবে গেলে আমরা এগিয়ে যাবো" - বলছিলেন তিনি।
শাসকদের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ, এমনি পাকিস্তান পিরিয়ডের সাথে তুলনাও চলে আসে কারো কারো কথায় ।
যেমন একজন মহিলা বলেন, তিনি মনে করেন "পাকিস্তান পিরিয়ডই ভালো ছিল"।
আজকের সময়ে এসে সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষেরা এভাবেই দেখছেন দেশকে।
কিন্তু ৪৭ বছর আগের বাংলাদেশ এবং এখনকার বাংলাদেশ-এর মাঝে ফারাক কতটা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলছিলেন, "আমি তখন তরুণ ছিলাম। আমি নিজের চোখে দেখেছি দেশটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। অবকাঠামোগত দিক থেকে একেবারেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।"
"যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না, কল-কারখানায় উৎপাদন ছিলনা। চরমপন্থীদের সংগঠন সক্রিয় ছিল। সুশাসনের অভাব ছিল"।
সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম আরো বলেন, "স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এসে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আমরা একটা ভালো অবস্থানে আছি । একেবারে কাঙ্খিত অবস্থায় এসেছি তা বলা যাবে না। তবে বলা যায় আমরা সেই পথেই এগোচ্ছি"।
অধ্যাপক ইসলাম মনে করেন, "বাংলাদেশের নারীরা যেভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজে অংশ নিচ্ছে সেভাবে আমাদের মত অন্য দেশগুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে"।
ধর্মনিরপক্ষেতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে ৪৭ বছরে যতটা এগোনোর কথা ছিল তা হয়নি - এই মত ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদের
তার মতে, "অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সূচকে আমরা এগিয়েছি কিন্তু রাজনৈতিক সূচকে আমরা পিছিয়েছি।"
"কৃষি, রপ্তানি, গার্মেন্টস, প্রবাসী আয় এগুলোতে মোটামুটি চলছে। যদিও আমাদের এগোনোর কথা ছিল, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা বিনির্মাণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি"।
মি. আহমেদের মতে, "গণতন্ত্র এখনো সংকটাপন্ন। রাজনৈতিক সহনশীলতা তৈরিতেও ব্যর্থ। সংসদ এখনো অকেজো"।
অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম মনে করেন, চরম দারিদ্র্য না থাকলেও, অথবা শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, মাথাপিছু রোজগার ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও, অর্থ-বিত্তের দিক থেকে মানুষের মাঝে বৈষম্য কিংবা শহর গ্রামের ফারাক আজও প্রকট।
আবার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানুষের অশংগ্রহণ কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণীর মাঝে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে বলে সাংবাদিক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ মনে করেন।
"রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যের অভাব। হিংসা এবং প্রতিহিংসা তাদের মধ্যে। এটা একটি কঠিন অবস্থা আমাদের জন্য" - বলেন তিনি।
বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেল, মৌলিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে তাদের মতামত অনেকটাই অভিন্ন। হত্যা, গুম মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
তারা মনে করছেন, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে ঠিকই তবে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। দুর্নীতির বিষয়টিও স্থান পায় তাদের বক্তব্যে। সামাজিক নিারপত্তা নিশ্চিত করার কথাও এসেছে।
সুতরাং প্রায় পাঁচ দশক পরে এসেও কাঙ্খিত লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনো অনেকটাই পথ পাড়ি দিতে হবে - তেমনটাই প্রতীয়মান হয়।








