বাংলাদেশে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ৫বছর পরও শ্রমিকদের ভয় কাটে নি

৫বছর আগে তাজরীন ফ্যাশানসের অগ্নিকাণ্ড ছিল পোশাকখাতের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ৫বছর আগে তাজরীন ফ্যাশানসের অগ্নিকাণ্ড ছিল পোশাকখাতের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড
    • Author, আবুল কালাম আজাদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে পাঁচ বছর আগে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড নামের একটি কারখানায় বাংলাদেশে পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর পোশাক কারখানাগুলোয় নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগতি হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে কারখানায় সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করার মত পরিস্থিতি এখনও হয়নি।

তবে কারখানা মালিকরা বলছেন অগ্রগতি অনেকটাই হয়েছে, ''কাজ বাকি আছে যৎসামান্যই''।

পাঁচ বছর আগে তাজরীনের আগুনে পুড়ে অন্তত ১শ ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় আর আহত হন আরো প্রায় শতাধিক শ্রমিক।

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান খাত পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। নারী শ্রমিকের এ এক বিরাট কর্মস্থল। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায় অনেকের মধ্যে কর্মস্থলে দুর্ঘটনার একটা ভয় কাজ করে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, "আমরা তো সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলি আর আমাদের লুকোছাপা করারও কিছু নেই। সে অবস্থান থেকে আমরা কিন্তু দেখি যে শ্রমিকরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বোধ করছেন এরকম অবস্থা কিন্তু এখনো হয়নি।"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

মোশরেফা মিশু
ছবির ক্যাপশান, মোশরেফা মিশু: আমরা কিন্তু দেখি যে শ্রমিকরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বোধ করছেন এরকম অবস্থা এখনো হয়নি।

"ধরেন আপনি একটা স্পটে যাবেন, মালিকপক্ষ জানলো যে আপনি যাবেন, সেজন্য তারা কিছু অ্যারেঞ্জমেন্ট রাখলো। কিন্তু পরবর্তীতে তারা সেটা সরিয়ে ফেললো। তাহলে আপনি কী করবেন? এজন্য ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর যারা আছেন তাদের দিয়ে সরকারের একটা সার্বক্ষণিক তদারকি রাখতে হবে," কারখানা পরিদর্শন নিয়ে বলেন মোশরেফা মিশু বলেন।

তাজরীনে অগ্নিকাণ্ড এবং এর ৫ মাসের মাথায় রানাপ্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাক খাতে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ক্রেতাদের দুটি জোট অ্যালায়েন্স এবং অ্যাকর্ড পোশাক কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু করে।

পোশাক খাতে বর্তমান নিরাপত্তা নিয়ে অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েস বিবিসি বাংলাকে বলেন, কারখানা ভবনের নিরাপত্তা বাড়ানোর কাজ এখনও অনেক বাকি আছে।

"কারখানায় নিরাপত্তার যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু একই সঙ্গে অনেক ত্রুটি সংশোধনও বাকি। অনেক কারখানায় নূন্যতম জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপগুলো নেয়া হলেও মানসম্মত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কাজ করতে হবে। যেমন কারখানার সবখানে ফায়ার এলার্ম, স্প্রিংঙ্কলার সিস্টেমসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের মতো কাজ বাকি আছে। ভবনের নিরাপত্তা বাড়ানোর কাজও অনেক কারখানায় এখনো হয়নি।"

ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ১৮শর বেশি কারখানায় আগুন, বিদ্যুৎ এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের পোশাক কারখানা
ছবির ক্যাপশান, ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ১৮শর বেশি কারখানায় আগুন, বিদ্যুৎ এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছে।

"অ্যাকর্ড নির্ধারিত ১৮শ কারখানায় চিহ্নিত ৯০ হাজারের মতো ত্রুটি সংশোধন হয়েছে। এখনো প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজারের মতো ত্রুটি সংশোধন প্রয়োজন যার মধ্যে অনেকগুলোই মৌলিক জীবনরক্ষাকারী নিরাপত্তা পদক্ষেপ," বলেন মি. ওয়েস।

বিজিএমইএ-র তথ্যে তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এ পর্যন্ত ১৩শ একটি কারখানা বন্ধ হয়েছে তবে নতুন করে তৈরি হয়েছে ৭২৩টি ফ্যাক্টরি। তবে অ্যাকর্ডের কথার সূত্র ধরে বিজিএমইয়ের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন যেসব কাজ বাকি তা নিতান্তই যৎসামান্য। জীবনরক্ষাকারী বেশিরভাগ কাজই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

"দেখা যাবে কারো ৫ পার্সেন্ট কাজ বাকি আছে, কারো হয়তো একটা পাম্প লাগানো বাকি আছে এরকম। সেই হিসেবে আমি বলতে পারি যে বাংলাদেশের যে গার্মেন্টস সেক্টর, সেই সেক্টর এখন পৃথিবীর যেকোনো দেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির থেকে বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি এবং ইলেকট্রিকাল সেফটি- এই তিনটা ইস্যুতে সবচেয়ে ভাল অবস্থায় আছে।"

সিদ্দিকুর রহমান
ছবির ক্যাপশান, সিদ্দিকুর রহমান: জীবনরক্ষাকারী বেশিরভাগ কাজই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

পোশাক খাতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স জানাচ্ছে তাদের আওতাভুক্ত কারখানাগুলোয় নিরাপত্তা অগ্রগতি ৮৫ ভাগ আর ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের অগ্রগতি ৮০%।

মেয়াদ শেষে আগামী বছর বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছে অ্যালায়েন্স। তবে ইউরোপীয় ক্রেতাদের সংগঠন অ্যাকর্ডের মেয়াদ ২০১৮ সালে শেষ হলেও ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা থাকতে চায়। কিন্তু কারখানা মালিকরা চাননা কোনোভাবেই অ্যাকর্ডের মেয়াদ বাড়ুক। বাংলাদেশ সরকারও অ্যাকর্ডের মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষে।

বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, "অ্যালায়েন্স যখন চলে যাবে অ্যাকর্ডেরও আর কোনো কাজ নাই। আমরা মনে করি আমাদের কারখানাগুলি এখন আর ঝুঁকিপূর্ণ নাই। তিনশ'র মতো কারখানা এখন গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তরিত হতে চলেছে। ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা খরচ করে পুরনো কারখানাগুলোকে আধুনিক করা হয়েছে। এবং আগে যে শেয়ারড বিল্ডিং ছিল সেগুলোও এখন বাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের কারখানাগুলো এখন চমৎকার।"

বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ
ছবির ক্যাপশান, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ: আমরা মনে করি আমাদের কারখানাগুলি এখন আর ঝুঁকিপূর্ণ নাই।

বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা দিয়েই ভবিষ্যতে কারখানার তদারকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রী মি: আহমেদ বলছেন, সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ে ইন্সপেক্টর আছে, বেপজায় ইন্সপেক্টর আছে। সরকার চায় তারাই এগুলো ইন্সপেকশন করবে ।