ভারতের রামনগরে কি হবে: 'শোলে'র থিমপার্ক, নাকি শকুনের অভয়ারণ্য?

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

দক্ষিণ ভারতের যে পাহাড়ি জায়গাটিতে বলিউডের বিখ্যাত ছবি 'শোলে'র শুটিং হয়েছিল - সেখানে একটি থিম পার্ক করার পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানকার বাসিন্দা দুর্লভ প্রজাতির শকুনেরা।

দক্ষিণ ভারতের ব্যাঙ্গালোর থেকে মহীশূর যাওয়ার পথে পাহাড়ি টিলায় ঘেরা একটা বিস্তীর্ণ পাথুরে এলাকার নাম রামনগর। ওই জনবিরল এলাকায় বছরপাঁচেক আগে গড়ে উঠেছে শকুনদের জন্য ভারতের প্রথম অভয়ারণ্য!

'রামদেবারা ভেট্টা ভালচার স্যাংচুয়ারি' নামে ওই অভয়ারণ্যে বিরল প্রজাতির লং-বিলড শকুন দেখতে এখন অনেক পর্যটকও যাচ্ছেন। তবে শকুনের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে, বছরদুয়েক হল শকুনরা সেখানে নতুন করে প্রজননও করছে না।

কিন্তু রামনগরের খ্যাতি আসলে আরও অনেক পুরনো। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউডের যে আইকনিক ছবি 'শোলে' হিন্দি সিনেমার ধারাকেই চিরতরে বদলে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়, তার প্রায় পুরো শ্যুটিংটাই হয়েছিল এই প্রত্যন্ত রামনগরে।

শোলে-র পরিচালক জে পি সিপ্পি আর শিল্প-নির্দেশক রাম ইয়েদেকার দুজনে মিলে বেছে নিয়েছিলেন কর্নাটকের এই জনবিরল পাহাড়ি, রুক্ষ এলাকাটা - যাতে সভ্যতা থেকে অনেক দূরের একটা গল্প দর্শকের কাছে নিয়ে আসা যায়।

অমিতাভ বচ্চন-ধর্মেন্দ্রর বিখ্যাত 'জয়-বীরু' জুটির অ্যাডভেঞ্চার, আমজাদ খান অভিনীত গুন্ডা সর্দার 'গব্বর সিং'য়ের যাবতীয় মস্তানি কিংবা 'বাসন্তী টাঙ্গাওয়ালি'র চরিত্রে হেমামালিনীর নাচ - সবেরই পটভূমি ছিল এই রামনগর, ছবিতে যার নাম দেওয়া হয় রামগড়।

এখন এই রামনগরেই ১২০ একর এলাকা জুড়ে কর্নাটক সরকারের পর্যটন বিভাগ একটি শোলে-অনুপ্রাণিত থিম পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বিশাল সেই থিম পার্কে শোলে ছবির নানা জনপ্রিয় দৃশ্য ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মাধ্যমে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে, সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ বলিউড-প্রেমী এই বিনোদনকেন্দ্রে আসবেন বলেও তারা আশা করছেন।

আর এই থিম পার্কের পরিকল্পনা সামনে আসার পরই গভীর উদ্বেগে পড়ে গেছে কর্নাটকের পশুপ্রেমী সংস্থাগুলো। তারা প্রশ্ন তুলছেন, সংরক্ষিত ওই অরণ্য এলাকায় থিম পার্ক হলে রামনগরের শকুনদের তাহলে কী হবে?

কর্নাটক ভালচার কনজার্ভেশন ট্রাস্ট্রের বি শশীকুমার বিবিসিকে বলছিলেন, "রামনগরে থিম পার্ক তৈরি হলে লং বিলড ভালচারদের ব্রিডিং একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। বিপদে পড়বে ওই এলাকার ইজিপশিয়ান ভালচাররাও!"

কর্নাটক সরকার অবশ্য দাবি করছে, শোলে থিম পার্ক গড়ে তোলা হবে পরিবেশকে বাঁচিয়েই। রাজ্যের পর্যটন বিভাগের মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খর্গে এদিন বিবিসিকে বলেন থিম পার্ক বা ট্যুরিস্ট ভিলেজ-টি গড়ে তোলা হবে শকুন অভয়ারণ্যের কোর এলাকার বাইরে।

মি খর্গে জানান, "যেমন ধরুন শোলে ছবিতে গব্বর সিংয়ের আস্তানা হিসেবে যে জায়গাটা শ্যুট করা হয়েছিল সেটা পড়ছে সংরক্ষিত অরণ্যের কোর এলাকার মধ্যে। আমরা ওই ইকো-সেনসিটিভ জোনে হাত দেব না, আমরা অন্য একটা জায়গায় গব্বরের ডেরা বানাব ঠিক করেছি।"

সেভ টাইগার ফার্স্ট নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও রামনগরের শকুনদের নিয়ে বহুদিন ধরে গবেষণা করছে। ওই সংস্থার কর্ণধার অশোক হাল্লুরও কিন্তু মনে করেন থিম পার্ক তৈরি হলে অভয়ারণ্যের শকুনরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তিনি বলছিলেন, "শকুনরা তো কোনও বায়ো-জিওগ্রাফিক এলাকা মেনে চলে না। আমরা যে দশ কিলোমিটারের বাফার জোন বেঁধে দিই, সেটা তাদের কাছে কোনও অর্থ বহন করে না। রামনগরের 'রাম্পড ভালচার' ও 'রেড-হেডেড ভালচার'দের তো এখন আর ওই এলাকায় দেখাই যায় না।"

অভয়ারণ্যের ভেতর আগে থেকেই একটি মন্দির আছে। প্রতি বছর সেখানে ধর্মীয় মেলা উপলক্ষে বহু লোকসমাগম হয়। এই সব কারণেও বহু শকুন এলাকাছাড়া হচ্ছে বলেও পরিবেশপ্রেমীরা মনে করছেন।

কিন্তু এখন শোলে-থিম পার্ক তথা ট্যুরিস্ট ভিলেজ রামনগরের বিপন্ন শকুনদের সামনে নতুন বিপদ এনে হাজির করেছে।

ফলে রামনগরকে খুব শিগগিরই স্থির করতে হবে, তারা বিয়াল্লিশ বছর আগেকার শোলে ছবির শ্যুটিংয়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবে, না কি ওই তল্লাটের বহুদিনের বাসিন্দা বিরল প্রজাতির শকুনদের!