বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে মেয়েরা কেন পিছিয়ে?

ছবির উৎস, Farhana Parvin
- Author, ফারহানা পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার কারওয়ানবাজার সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কে। বহুতল এই ভবনে অন্তত ১৬ টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নানা ধরণের তথ্য ও প্রযুক্তিগত সেবা দিচ্ছে।
একটি কল সেন্টারে গ্রাহকদের সেবা দিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন এখানকার কর্মীরা। এই কল সেন্টারে ৫ মাস হলো কাজ করছেন নাদিয়া। তবে কল সেন্টারের চেয়ে প্রোগ্রাম ডিজাইনিং এ তার আগ্রহ বেশি।
তিনি বলছিলেন "একটা পুরো প্রোগ্রাম ডিজাইন আমি করতে পারি। কিন্তু এখানে মনে করা হয় কল সেন্টারেই মেয়েরা ভালো করবে। আমি আশা,বিশ্বাস একদিন প্রোগ্রাম ডিজাইন করবো যেটা সবায় অ্যাপ্রুভ করবে"।
তথ্য -যোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে কল সেন্টার মাত্র একটি অংশ। বিশাল এই খাতে নানা ধরণের কাজ হয়।
মেয়েরা কেন পিছিয়ে?
যেমন প্রডাক্ট ডেভলপমেন্ট ও সার্ভিস রিলেটেড । প্রডাক্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, ওয়েব অ্যাপলিকেশন, মোবাইল অ্যাপলিকেশন,গেম ডেভলপমেন্ট , রোবোটিক্স ইত্যাদি।

শুনতে অনেকটা খটোমটো হলেও এর উপর এখন নির্ভর করে একটি দেশের উন্নয়নের মান। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছর গুলোতে আইটি খাতে নানা ধরণের কাজ করছে।
তবে সেখানে পুরুষদের চেয়ে নারীদের সংখ্যা অনেক কম। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ বলছে ১২ শতাংশ মেয়ে কাজ করছে এখন।
আইসিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বেসিস বলছে এই সংখ্যা ১০ শতাংশ। আর বেসরকারি একটি আইটি প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব- তাদের গবেষণায় বলছে এর সংখ্যা আরো কম- ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এই সংখ্যা ৮.৭০%।
প্রশ্ন উঠছে বিশাল একটা সম্ভাবনাময় উপার্জন খাতে মেয়েরা এত কম সংখ্যায় কাজ করছে কেন?
রাবেয়া, কাজ করছেন একটি আইটি কোম্পানিতে। বিপিও বা বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সসিং তার মূল কাজ। প্রশ্ন করলাম সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, ওয়েব অ্যাপলিকেশনে কাজ করছেন না?
"এখানে একটা ধারণা আছে মেয়েরা বিপিও মানে কল সেন্টার, ব্যাক অফিস ওয়ার্ক এসবে ভালো করবে তাদের নরম স্বভাবের কারণে। কিন্তু সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, ওয়েব অ্যাপলিকেশনে মনে করে ছেলেদের কাজ। একটা মাইন্ড সেট হয়ে গেছে, মনে করে এটা ওরাই ভালো পারবে। ফলে বড় সংখ্যার মেয়েরা এই জায়গায় আসতে পারে না" বলছিলেন তিনি।
নিয়োগদাতারা কি মেয়েদের কে নিচ্ছেন না?
রাবেয়ার কথা সত্যি হলে ধরে নিতে হয় আইসিটি খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ-দাতাদের প্রথম পছন্দ এখন ছেলে। প্রায় ৯০ শতাংশ পুরুষ কাজ করা এই সেক্টরে নিয়োগ-দাতারা, একজনকে নিয়োগের সময় আসলে কোন দিক গুলোর কথা চিন্তা করেন?
ঢাকার বনানীতে অবস্থিত, চ্যাম্পস২১ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার রাসেল টি আহমেদ বলছিলেন "সময় এবং যোগ্যতা। অর্থাৎ সময় কতটা দিতে পারবে এবং স্কিল্ড কিনা। মেয়ে -ছেলে আলাদা করে দেখার কিছু নেই। কিন্তু ইন্টারভিউ বোর্ডে দেখা যায় একটা মেয়ে অত্যন্ত স্কিল্ড কিন্তু বলছে বিকেল ৫টার পর কাজ করতে পারবে না। এখন এই সেক্টরে কাজের কোন টাইম ফ্রেম নেই। একটা সফটওয়্যার সলিউসনে আপনার ১২/১৩ ঘণ্টা লাগতে পারে। আবার ইউরোপ, আমেরিকার সাথে আমার রাত দিনের পার্থক্য"
মি. আহমেদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১০% নারী কাজ করছেন।

ছবির উৎস, Farhana Parvin
বাংলাদেশে বর্তমানে স্কুল পর্যায়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারি,বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রয়েছে আইটি বিষয়। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে উভয় ভাবে। মেয়েরা সেখানে পড়ছেন এবং প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন। তবে কর্মক্ষেত্রে কেন পিছিয়ে?
উইমেন ইন ডিজিটাল
মোহাম্মদপুরে আমার গন্তব্য উইমেন ইন ডিজিটাল নামে একটি আইটি অফিস।
অফিসটিতে মোট ১৮ জন মেয়ে কাজ করছেন। কেউ করছেন অফিসে বসে কেউ নিজের বাসা থেকে।

উইমেন ইন ডিজিটাল এর প্রধান আছিয়া নীলা বলছিলেন তিনি যখন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সেখানে তিনি কিভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
"একটা পর্যায়ে দেখা গেল প্রত্যেকটা প্রজেক্টের টিম লিডার আমি। সফটওয়্যার ডেভেলপ করা থেকে শুরু করে মার্কেটিং পর্যন্ত। কিন্তু কোথাও আমার নাম যাচ্ছে না। আবার বছরের পর বছর আমার পদ,বেতন এক। একদিন মিটিংএ আমার প্রমোশনের কথাটা বললাম কিন্তু কেও সদুত্তর দিতে পারলো না"।
দীর্ঘ দিন কাজ করে মেধার স্বীকৃতি না পেয়ে তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। এবং সেখানে শুধু মেয়েদেরকেই নেন। কারণ চাকরি-দাতা হিসেবে তিনি এখন মনে করেন মেয়েদের মেধা,যোগ্যতা কোন অংশেই ছেলেদের চেয়ে কম নয়।
অন্যান্য দেশেও আইসিটি খাতে মেয়েরা পিছিয়ে
ইন্ডিয়া ডাটাকোয়েস্ট বেস্ট অ্যাম্পয়লার সার্ভে ২০১২ বলছে পাশের দেশ ভারত যারা তথ্য-প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে তাদের দেশে এই সংখ্যা শতকরা ২২%।

ছবির উৎস, Farhana Parvin
আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনসংখ্যা ব্যুরোর ২০১৪ রিপোর্ট বলছে তথ্য প্রযুক্তির হাব বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে সেখানে মাত্র ৩০% মেয়ে।
তথ্য প্রযুক্তি খাতে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডাটা সায়েন্স, বিগডাটা, আইওটি, টেস্টিং, ডাটা এন্ট্রি, ই-কমার্স প্রোডাক্ট এন্ট্রি প্রভৃতি নিয়ে কাজ হয়।
বাংলাদেশে একটি সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট কোম্পানি দোহা টেক নিউ মিডিয়া। প্রতিষ্ঠানটিতেও কাজ করেন ১০ থেকে ১২% নারী। প্রতিষ্ঠান চেয়ারম্যান লুনা শাসুদ্দোহা কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন মেয়েরা এক্ষেত্রে বেশি কাজ পাচ্ছে না?
তিনি বলছিলেন "আমি যখন একটা মেয়েকে নেয় তখন দেখা যাচ্ছে স্বামীর চাকরীর ট্রান্সফারের সাথে সে চলে যাচ্ছে অর্থাৎ পরিবারটা তার কাছে মুখ্য। আমি তিনটা মেয়েকে নিয়েছি যারা নেয়ার পর বাইরে পিএইচডি করতে চলে গেছে।সেখানে আমার কোম্পানি সাফার করছে। তবে বেশির ভাগ থাকে না সামাজিক কারণে।আমরা যেহেতু একটু স্পেসেফিক এরিয়াতে কাজ করি সেখানে উচ্চ লেভেলে মেয়ে কম পাওয়া যায় না। আমার একটা প্রজেক্ট আছে যেখানে ২৪/৭ কাজ চলে সেখানে আমি মেয়েদের নিতে পারিনা তাদের সামাজিক ইস্যু এবং নিরাপত্তার কথাটা মাথায় রাখতে হয় আমাকেই"।
মেয়েদের জন্য কতটা সহজ এই খাতে কাজ করা?
তথ্য-প্রযুক্তি খাকে কেউ কেউ ফ্রিল্যান্সিং এ কাজ করে আর কেউ কেউ ইন-হাউজে কাজ করে।
যেখানে বাসায় বসেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে সেখানে কি বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে না মেয়েদের?

ছবির উৎস, Farhana Parvin
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার এন্ড আউটসোর্সিং এর সেক্রেটারি জেনারেল তৌহিদ হোসেন বলছিলেন আমাদের এখন উৎসাহ দেয়া হচ্ছে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী কর্মী রাখার জন্য। কিন্তু চাইলেও আমরা পারছি না।
মি. হোসেন বলছিলেন "কল সেন্টারে মেয়েরা কাজ করলেও সেটাকে মূল তথ্য-প্রযুক্তি খাত মনে করে না অনেকে। হার্ডওয়ার,সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা অন্য কাজ যেগুলো সেখানে মেয়েরা যে কাজ করতে পারে সেটা প্রচারণার অভাব আছে। আমরা বিদেশি ফান্ড নিয়ে যখন কাজ করি তখন আমাদের বলা হয় ৩০% করতে। কিন্তু সব মিলিয়ে আমরাও পাই না। তাই ছেলেদেরকেই নিতে হয়"।
তবে বিপিও খাতে প্রচুর মেয়ে কাজ করছেন বলে মি. হোসেন জানাচ্ছিলেন।
দিন বদল কি আদৌ সম্ভব?
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের 'দিন বদলের সনদ'-এ ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাত্র ১০% মেয়ে যদি এই খাতে কাজ করে তাহলে দিন বদল কিভাবে সম্ভব?
আমি এসেছি আগারগাওয়ে বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অফিসে।

ছবির উৎস, Farhana Parvin
মেয়েদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি করছেন তারা। সচিব সুবির কিশোর চৌধুরিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
তিনি বলছিলেন "প্রথমেই স্বীকার করছি মেয়েরা কম এই কথাটা। এখন সরকার যেটা করছে লার্নিং এন্ড আর্নিং প্রকল্প থেকে ইতোমধ্যে শুধু ইউনিয়ন লেভেলে ২০ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই থেকে শী পাওয়ার নামে এক প্রকল্পে ২১ টি জেলায় ১০ হাজার ৫০০ নারীকে আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে"।
শুরুতে নাদিয়ার কথা বলছিলাম, তিনি কাজ করতে চান সফটওয়্যার ডিজাইনে যেটা কিনা তথ্যপ্রযুক্তির মুল কাজ গুলোর একটিকে ধরা হয়।
কিন্তু তিনি বলছিলেন সুযোগের অভাবে কল সেন্টারে কাজ করছেন তিনি।
বলছিলেন মনের মত কাজ না পেলে এই সেক্টর পুরোপুরি ত্যাগ করবেন তিনি।
তবে সার্বিক ভাবে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনেকটা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আবার কিছু সময় মেধা ও যোগ্যতা থাকলেও তারা তথ্য-প্রযুক্তি খাত থেকে পেশা পরিবর্তন করে অন্য স্থানে যাচ্ছেন।








