'শুনলাম যুদ্ধ লেগেছে'- ইরানে ছেলে ও তার পরিবার নিয়ে উৎকণ্ঠায় মা

ছবির উৎস, Eshanul Haque
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"দাদারা ইরানে। দু'দিন হলো যোগাযোগ করতে পারছি না। সঙ্গে তিনটে বাচ্চা রয়েছে…জানি না কী অবস্থায় আছে," কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে আসছিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার বাসিন্দা সাবির গাজীর।
তার বড়ভাই আমির হোসেন গাজী, ভাবী ঊষা পারভীন এবং তিন সন্তানসহ পরিবারের পাঁচজন সদস্য এখন তেহরানে রয়েছেন। ইরানের উপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বাড়ির লোকেরা।
বসিরহাটের বাসিন্দা আমির হোসেন গাজী ইরানে পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। গত আট বছর ধরে স্ত্রী ও সন্তানসহ সেখানেই বাস করেন তারা।
"বাড়ির কেউই চোখের পাতা এক করতে পারিনি। মা ভেঙ্গে পড়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তার ভাই সাবির গাজী। বড়ভাইয়ের সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়েছিল গত সপ্তাহে। তারপর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মা ইয়ারবানু বিবির। ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি, নাতনির কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি। বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "ওরা কী অবস্থায় আছে জানি না। কিছুতেই ফোনে পাচ্ছি না। কী করব?"
পড়াশোনা আর চাকরির জন্য অনেকেই ভারত থেকে ইরান পাড়ি দেন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর হামলার এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলাকে কেন্দ্র করে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেখানে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।
এই অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইসরায়েল, ইরানসহ সংঘাতের আবহে থাকা এসব দেশে অনেকেই আটকে পড়েছেন। ভারতের অনেক নাগরিকও এই তালিকায় আছেন। ইরান, ইসরায়েলসহ এই দেশগুলোতে ভারতীয়দের জন্য আগেই অ্যাডভাইজরি জারি করেছে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় দূতাবাসগুলো।
বসিরহাটে থাকা আমির হোসেন গাজীর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে তিনিও ভারতে ফিরে আসার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সে ব্যবস্থা হওয়ার আগেই তার সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না বাড়ির লোকেরা।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Hassan Ali
'শুনলাম যুদ্ধ লেগেছে'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বসিরহাটের এক নম্বর ব্লকের সাকচুড়ার মাঠপাড়ার পরিস্থিতি এখন থমথমে। এলাকার অনেকেই সোমবার সকাল থেকে সাবির গাজীর বাড়িতে এসেছেন, তার বড়ভাইয়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে কি না জানতে। কিন্তু পরিবারের কেউই কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
শনিবার থেকে ক্রমাগত ছেলের নম্বরে ফোন করার চেষ্টা করে চলেছেন ইয়ারবানু বিবি কিন্তু কোনো মতেই যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
"'শুনলাম যুদ্ধ লেগেছে। কী হবে? আমাদের ক্ষমতা নেই যে কিছু করতে পারব," কথাগুলো বলতে বলতে আবারো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ইশানুল হক জানিয়েছেন, ধর্ম নিয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইরানে পাড়ি দিয়েছিলেন বড়ভাই আমির হোসেন গাজী। স্ত্রী ঊষা পারভীন ও তিনসন্তানসহ তেহরানেই বাস করেন বছর ৩৪-এর আমির হোসেন গাজী।
"দাদা আট-নয় বছর আগে ইরানে গিয়েছিল পড়তে। সেখানেই এখন বাচ্চাদেরও পড়ায়। তেহরানে ভালোই ছিল ওরা। নিয়মিত ফোনে কথা হতো। ভিডিও কল করত মাকে। কিন্তু…"
"আমি শনিবার সকালে খবর শুনে জানতে পারি ওখানে কী হচ্ছে। তারপর থেকেই ফোনে পাচ্ছি না," বলেছেন সাবির গাজী।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিলেন আমির হোসেন গাজী। ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইতেন। সেই উদ্দেশ্যেই ইরানে পাড়ি দেন।
ওই এলাকার বাসিন্দা হাসান আলীর কথায়, "শুনেছি পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়ার আগে ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু পরিবারের কাছে অত টাকা ছিল না। খুবই গরীব।"
স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান গোলাম মোস্তফা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন পরিবারের পাশে রয়েছেন তারা। সমস্তরকম সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন।
কিন্তু কোনো আশ্বাসই অনিশ্চয়তা কমাতে পারেনি এই পরিবারের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। আমির হোসেন গাজীর আরেক ভাই সাইন গাজী ভারত সরকারের হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তারা।

ছবির উৎস, Jamshid Nassiri
যে ইরানি ফুটবলার কলকাতার মাঠ কাঁপাতেন
অবসরপ্রাপ্ত ফুটবলার জামসিদ নাসিরির বেশ কয়েকজন আত্মীয় সংঘাতের আবহে মোড়া তেহরানে রয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমি দেশ ছেড়েছি বহু দশক আগে। কিন্তু ইরানে এখনো আমার ভাই ও আত্মীয়রা আছেন। তেহরানেই রয়েছেন তারা। তবে তারা সুরক্ষিত আছেন। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে।"
ভারতীয় ফুটবলে নামকরা ইরানি ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম তিনি। আরেক নামজাদা ইরানি ফুটবলার মজিদ বস্কারের মতো এক সময় মাঠে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। এখন ফুটবল কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
তার জন্ম ইরানের খোররাম শহরে। তবে ইরান ছেড়ে ভারতে এসেছিলেন ছাত্রাবস্থায়। ফুটবলকে ভালোবেসে ভারতের সঙ্গে এবং ক্রমে কলকাতার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল এবং মহামেডান- দুই ফুটবল ক্লাবের জন্যই খেলেছেন তিনি।
তার ছেলে কিয়ান নাসিরিও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফুটবলকেই বেছে নিয়েছেন ক্যারিয়ার হিসাবে।
জামসিদ নাসিরি আশাবাদী যে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। তার কথায়, "আসলে বিষয়টার সঙ্গে রাজনীতি জড়িয়ে রয়েছে। তাই খুব বেশি কিছু বলতে চাই না। কিন্তু আমি আশা করছি পরিস্থিতি ভালো হবে।"

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ইরানে আটকে পড়ুয়ারা
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মিলিয়ে ১০ হাজার ৭৬৫ জন বসবাস করেন ইরানে। প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী ইরানে পাড়ি দেন। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ সেদেশে ডাক্তারি পড়তে যান।
অপেক্ষাকৃত কম খরচের কারণে অনেকেই ইরানে পাড়ি দেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় জম্মু ও কাশ্মীরের মেডিকেল শিক্ষার্থী রয়েছেন।
সংঘাতের আবহে তাদের নিরাপদে বাড়ি ফেরানোর জন্য ইতোমধ্যে তাদের পরিবার এবং জম্মু ও কাশ্মীর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তরফে আবেদন জানানো হয়েছে।
বিবিসি উর্দুর সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজেদের দুশ্চিন্তার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের বাড়ির লোকেরা।
লেখাপড়া ছাড়াও কর্মসংস্থানের জন্যও অনেকে ইরানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। মূলত ইরানের নির্মাণ সংস্থাগুলোতে কাজে করেন ভারতীয় নাগরিকরা। ইরানে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে এই সেক্টরে কর্মরতও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ইরানের পরিস্থিতি
গত শনিবার ইরানের উপর ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছে বলে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট-এর তরফে জানানো হয়েছে।
এর আগে রোববার ২৪ ঘণ্টায় ইরানে ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানিয়েছিল রেড ক্রিসেন্ট।
অন্যদিকে, ইরানের মিনাবে মেয়েদের স্কুলে শনিবারের হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দেড় শতাধিক ছাড়িয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, এতেও হতাহতের খবর আসছে।
এই সংঘাতের পরিস্থিতিতে বসিরহাটের ইয়ারবানু বিবির একটাই আশা- "ছেলে, বৌমা আর নাতি-পুতিরা ঘরে ফিরুক"।








