
ওয়ালিউর রহমান মিরাজ
বিবিসি বাংলা, ঢাকা

সংলাপের এজেন্ডা নির্ধারণ করেন দর্শকরা
সত্তর বছরে বিবিসি বাংলা বিভাগ শ্রোতাদের মন জয় করা অসংখ্য অনুষ্ঠান বানিয়েছে, আমি নিশ্চিত দীর্ঘদিন ধরে শুনছেন এমন শ্রোতারা সেসব অনুষ্ঠানের কথা মনেও রেখেছেন। আমি নিজে যখন শুধুমাত্রই বিবিসির শ্রোতা ছিলাম, সে সময়ে শুনেছি অনেক অনুষ্ঠানের কথা আমার এখনো মনে আছে। তবে অনেকেই হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন, বিবিসির সফল অনুষ্ঠানমালার দীর্ঘ মিছিলে অনন্য ছিল বাংলাদেশ সংলাপ। কেবলমাত্র শোনা নয়, দেখার জন্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠান তৈরি করলো বিবিসি বাংলা।
তবে বাংলাদেশ সংলাপের বিশেষত্ব শুধুমাত্র এই ছিল যে এটি যতটা না রেডিও, তার চেয়েও বেশি টেলিভিশন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ সংলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল এতে দর্শকদের সরাসরি, সক্রিয় অংশগ্রহণ। সংলাপে কী আলোচনা হবে, সেই এজেন্ডা ঠিক করতেন স্টুডিওতে উপস্থিত দর্শকরা, প্যানেল সদস্যদের সঙ্গে বিতর্কে যোগ দিতেন তাঁরাই।
বিতর্ক - হ্যাঁ, বিতর্কের অনুষ্ঠানই ছিল বাংলাদেশ সংলাপ। প্রথাগত টক-শো’র ধারণার বাইরে এটি ছিল এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে রাজনীতিবিদ, নীতি-নির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, অ্যাকাডেমিক - মোট কথা প্যানেলিস্টদের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে মেতেছেন দর্শকরা। অর্থাৎ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ কিংবা আমাদের আশেপাশের জগত - এসব নিয়ে মতামত কেবল চাপিয়ে দেয়ার বিষয় ছিল না, এর একটি স্রোত সংলাপের ফ্লোর থেকেও বহমান ছিল।

বাংলাদেশ সংলাপে প্রশ্ন করছেন দর্শক
বাংলাদেশ সংলাপ প্রথম দর্শক-শ্রোতার সামনে আসে ২০০৫ সালে। তখন আমরা আটটি অনুষ্ঠান করেছিলাম নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর। তবে প্রায় এক বছর পরে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংলাপ শুরু হয় নতুন করে, আর তখন এতে বড় যে পরিবর্তনটি ঘটে, তাহলো এর বিষয়। বাংলাদেশ সংলাপ রূপ পায় সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্মের। তবে ব্যতিক্রম ছিল - সংলাপের এপর্বে আমরা দু’চারটি বিষয়-ভিত্তিক অনুষ্ঠান করেছি।
বাংলাদেশ সংলাপ মর্যাদাপূর্ণ একটি প্লাটফর্ম হয়ে ওঠার মূল নিয়ামক ছিলেন এতে অংশগ্রহণকারী প্যানেলিস্ট ও দর্শকরা। অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট থাকতেন চারজন, আর দর্শক গড়ে ১৫০ জন। অনুষ্ঠানে এসে দর্শকরা যেসব প্রশ্ন জমা দিতেন, তা থেকেই বাছাই হতো আট থেকে দশটি প্রশ্ন। এগুলোই সরাসরি উত্থাপিত হতো। অবশ্য সময়ের কারণে শেষের দিকে হয়তো কারো কারো প্রশ্ন নেয়া সম্ভব হতো না।
''আমি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটি একবারেই বাছাই করা হলো না কেন?'' অথবা ''আমরা কয়েকজন মিলে একই প্রশ্ন দিলাম, কিন্তু কারো প্রশ্নই নেয়া হলো না কেন?'' - রেকর্ডিংয়ের পরে এধরনের প্রশ্নের – কখনো কখনো মারমুখী আচরণের - মুখোমুখি অনুষ্ঠানের প্রযোজক হিসাবে আমি অনেকবারই হয়েছি। এটি খুবই স্বাভাবিক যে প্রায় সবাই-ই মনে করেছেন, তাঁর প্রশ্নটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার সৌভাগ্য যে সবক্ষেত্রেই আমি দর্শকদের বুঝাতে পেরেছি, সমকালীন ঘটনাবলীর সাথে সবচেয়ে সংগতিপূর্ণ প্রশ্নই বাছাই করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে অন্য কিছু বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
তবে যে কাজটি একেবারেই সহজ ছিল না, তা হলো সংলাপের জন্যে প্যানেলিস্ট বাছাই। বাংলাদেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল, কিংবা এদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক শিবির থেকে দু’জন প্যানেলিস্ট থাকতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা ছিল একজন অন্যজনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, ক্যারিয়ার ইত্যাদি বিবেচনায় ‘ম্যাচ’ করেন কিনা। মাথায় রাখতে হতো অন্য পানেলিস্টদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিষয়টিও। আর হ্যা, সংলাপ ঢাকা কিংবা ঢাকার বাইরে যেখানেই হোক না কেন, প্যানেলে অন্তত একজন নারীকে আমরা রাখতে চেষ্টা করেছি। সবশেষে আরো একবার দেখতে হয়েছে, প্যানেলের সার্বিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে কি না।

কক্সবাজারের সৈকতে সংলাপের আগে প্রশ্ন চুড়ান্ত করছেন প্রযোজক ওয়ালিউর রহমান মিরাজ। পাশে উপস্থাপক মিথিণা ফারজানা
সার্বিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হয়েছে স্টুডিওতে উপস্থিত দর্শকের ক্ষেত্রেও। অনুষ্ঠানে আসতে আগ্রহীরা আমাদের টেলিফোন কিংবা ই-মেইল করেছেন। তবে একই সাথে আমরা চেয়েছি, নারী এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিক, কথা বলুক। এঁরা কী ভাবছেন, কী চাইছেন, তা সবাই জানুক। আর তাই আমরা অনেক সংগঠনকে বলেছি বাংলাদেশ সংলাপে যদি এমন কেউ অংশ নিতে চায়, আমরা সেই সুযোগ দেব। আমরা সেই সুযোগ দিয়েছি। এটি ছিল আরেকটি উপাদান, যা সংলাপকে অনন্য করে তুলতে সাহায্য করেছিল।
লক্ষ লক্ষ শ্রোতা রেডিওতে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ সংলাপ শুনেছেন। কিন্তু আগেই বলেছি, সংলাপ ছিল মূলত একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান। কর্মযজ্ঞের পুরোটা টেলিভিশনের দিকটি মাথায় রেখেই করা হতো। কিন্তু রেডিও অথবা অনলাইন শ্রোতারা যাতে বঞ্চিত বোধ না করেন, আমরা সেটিও নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। বেসরকারি স্যাটেলাইট স্টেশন ‘চ্যানেল আই’ ছিল আমাদের টেলিভিশন সহযোগী। চ্যানেল আইয়ের দায়িত্ব ছিল অনুষ্ঠান ধারণ ও সম্পাদনা করে তা সম্প্রচার করা। তবে পুরো কাজটি হয়েছে বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালার আওতায় এবং বিবিসি বাংলার নজরদারিতে। বিবিসি কখনোই সম্পাদকীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে কোন ছাড় দেয়নি এবং এটি নিশ্চিত করেই চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে চমৎকার একটি সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। আর বিনিময়ে চ্যানেল আই প্রতি সপ্তাহে বিবিসির সেই অনুষ্ঠানটি এক্সক্লুসিভলি পেয়েছে, যেটি পেতে আগ্রহী ছিল ঢাকার আরো কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল।

অনুষ্ঠানে মহিলা দর্শকদের উপস্থিতির দিকে বিশেষ নজর দেয়া হতো
বাংলাদেশ সংলাপ প্রসঙ্গে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্টের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সংলাপ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি প্রযোজনা। এখানে মানের যেমন একটি ব্যাপার ছিল, তেমনি ছিল অভিনবত্ব। আমরা জেলা শহরেও বাংলাদেশ সংলাপকে নিয়ে গিয়েছি। এমনকী ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের নানা ইস্যু শুনতে সংলাপ গেছে লন্ডনেও। ঘুরে বেড়িয়েছি আমরা প্রায় একশ’ সদস্যের টিম নিয়ে। ফলে প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। দাতাদের কাছ থেকে এই টাকার সংস্থান করেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিবিসির নিজস্ব টিম ও চ্যানেল আই ক্রুদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করে বিবিসির এই প্রতিষ্ঠানটি। একটি ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার এটি ছিল আরেকটি সফল উদাহরণ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সংলাপ চলেছে টানা সাড়ে তিন বছর। দেড়শ’র মতো অনুষ্ঠান। আমরা ক্লান্ত হইনি। আমাদের বিরামহীন প্রচেষ্টা ছিল সেরা মানের একটি অনুষ্ঠান নতুন-যুগের আর নতুন-প্রযুক্তিতে-অভ্যস্ত দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দেয়ার। আমরা বিশ্বাস করি, বিবিসি বাংলা তাতে সফল হয়েছে।
BBC © 2014বাইরের ইন্টারনেট সাইটের বিষয়বস্তুর জন্য বিবিসি দায়ী নয়
কাসকেডিং স্টাইল শিট (css) ব্যবহার করে এমন একটি ব্রাউজার দিয়ে এই পাতাটি সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে৻ আপনার এখনকার ব্রাউজার দিয়ে এই পাতার বিষয়বস্তু আপনি ঠিকই দেখতে পাবেন, তবে সেটা উন্নত মানের হবে না৻ আপনার ব্রাউজারটি আগ্রেড করার কথা বিবেচনা করতে পারেন, কিংবা ব্রাউজারে css চালু কতে পারেন৻