ঢাবির মাঠে কান ধরে ওঠবস কিংবা স্কুলে নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন বন্ধ হচ্ছে না কেন

ছবির উৎস, Getty Images
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে হাতে লাঠি নিয়ে শিশু-কিশোরদের কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনায় তীব্র সমালোচনার পর এ ঘটনার দায় স্বীকার করে ডাকসু থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এর একজন কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা।
এর কয়েকদিন আগেই ঢাকার নয়াপল্টনে একটি শিশুকে স্কুলের ভেতরে নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্কুলটির পরিচালককে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে।
শিশু অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন এবং আইনজীবীরা বলছেন, শিশুদের অবজ্ঞা, অপমান কিংবা ভয় দেখানোটা হলো 'কর্পোরাল পানিশমেন্ট', যা আইন অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কিন্তু নীতি ও আইন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই এসব ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে শিশুদের কান ধর ওঠবস করিয়ে ভীতি দেখানো বা শাসন করার বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিবে কি-না তা নিয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুতে সদস্য নির্বাচিত হওয়া সর্বমিত্র চাকমা তার পদত্যাগ সংক্রান্ত ঘোষণায় বলেছেন, 'প্রশাসনের অসহযোগিতা ও ব্যর্থতার দায়' মাথায় নিয়েই তিনি পদত্যাগ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার অবশ্য বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার মাঠ যাতে শিক্ষার্থীরা সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারে সেজন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এরপরেও কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি প্রশাসনকে জানানো উচিত।
"ডাকসু বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব আছে শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে ডাকসু কিংবা প্রশাসন কারোরই এখতিয়ার বহির্ভূত কোনো কাজ করা উচিত নয়," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Sarba Mitra Chakma/Facebook
সর্বমিত্র চাকমা ও কান ধরে ওঠবস
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সর্বমিত্র চাকমার দুটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
পরে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও শিশু কিশোরদের প্রতি আচরণের জন্য তাকে আইনের আওতায় নেওয়ারও দাবি করেছেন। আবার তার সমর্থকরা কেউ কেউ মি. চাকমাকে সমর্থন করে বলছেন 'এভাবে ছাড়া ক্যাম্পাস থেকে বহিরাগত তাড়ানো যাবে না'।
ভাইরাল হয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পাঞ্জাবির ওপর কালো চাদর গায়ে দেওয়া সর্বমিত্র চাকমা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে লাঠি হাতে শাসাচ্ছেন আর সেখানে খেলতে আসা বেশ কয়েকজন কিশোর ও তরুণকে কান ধরে ওঠবস করছেন।
সামাজিক মাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী ভিডিওটি জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের।
ওদিকে আজ সোমবার ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতেও দেখা যাচ্ছে, ব্লেজার পরিহিত মি. চাকমা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামের ভেতরে লাঠি হাতে আছেন আর একদল কিশোর কিংবা তরুণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কান ধরে ওঠবস করছেন।
এর আগে গত নভেম্বর মাসেও তিনি ক্যাম্পাসে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসাচ্ছেন- এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি তখন তার ব্যাখ্যায় ওই প্রবীণ ব্যক্তিকে মাদকাসক্ত দাবি করে বলেছিলেন 'লাঠিসোঁটা ছাড়া বা ভয়-ভীতি প্রদর্শন না করে তাদের তোলা যায়–ই না'।
সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল অনলাইনে এসব ভিডিও প্রচারের পর এসব নিয়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যেই দুপুর নাগাদ মি. চাকমা পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
তবে তিনি বলেছেন, "আমার পন্থা ভুল হলেও প্রশাসনের স্থবিরতা সহ বিভিন্ন কারণে আমার মনে হয়েছে এ কঠোরতা ছাড়া বহিরাগত দমন করে সেন্ট্রাল ফিল্ডে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়"। তিনি আরও বলেছেন, "আমি বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়েছি , একা। চেষ্টা করেছি সমাধানের , নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও"।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব প্রশাসনের এবং সে জন্য নানা পদক্ষেপ তারা নিচ্ছেন।
"ডাকসু ও প্রশাসনসহ সবাইকে নিজের আওতার মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর ব্যত্যয়টা অপ্রত্যাশিত," বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Image
শারমিন একাডেমিতে শিশুর মুখে স্ট্যাপল দেওয়ার চেষ্টা
নয়াপল্টন এলাকার মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে একটি শিশুকে নির্যাতনের ভয়াবহ একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সম্প্রতি জানা যায় যে ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৮ই জানুয়ারি।
ওই ভিডিওতে দেখা যায় একজন নারী একটি শিশুকে নিয়ে একটি কক্ষে ঢুকে সোফায় বসেন এবং শিশুটিকে তিনি একটি চড় দেন। এরপর শিশুটি তাতে প্রতিক্রিয়া দেখালে ওই কক্ষে থাকা একজন পুরুষ নিজের চেয়ার থেকে উঠে কখনো মুখ চেপে ধরেন, আবার কখনো গলা চেপে ধরেন।
এ সময় ওই পুরুষ ব্যক্তির হাতে স্ট্যাপলার ছিল। শিশুটি কাঁদছিল ও হাঁসফাঁস করছিল। নারীটি তাকে ধরে রাখছিল এবং এক পর্যায়ে শিশুটি নারীর শাড়ীতে থুতু ফেলে। এরপর পুরুষটি উঠে গিয়ে শিশুটির মাথায় ঝাঁকি দিয়ে চেপে ধরেন।
ভয়ংকর ওই দৃশ্য ভাইরাল হবার পর পুলিশ জানায়, ফুটেজে থাকা নারীটি শারমিন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি হলেন তারই স্বামী ও স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়া।
পরে এ ঘটনায় মামলা হয় এবং গত শুক্রবার মি. বড়ুয়াকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে এখন তিনি কারাগারে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
শিশু নিপীড়ন বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন
বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে। তবে আদমশুমারিতে এই বয়স পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা কত সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। বরং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের ১৫ বছরের কম বয়েসী শিশু প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ।
শিশুদের নিয়ে যারা কাজ করেন এবং আইনজীবীরা বলছেন, নীতি ও আইন থাকা সত্ত্বেও শিশু সুরক্ষার কাঠামোই বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি এবং এর ফলে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা খেলার মাঠ- কোনো জায়গাতেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
অথচ বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বিলোপ করতে ও তার বেড়ে ওঠার জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতেও অঙ্গীকার রয়েছে বাংলাদেশের।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, শিশু আইন ও পারিবারিক সহিংসতা আইন ছাড়াও নীতি আছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্কুলার আছে- কিন্তু তারপরেও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো কাঠামোই তৈরি হয়নি।
"যে কোনো অ্যাবিউজ টর্চার অবহেলা দেশের আইনে অপরাধ শাস্তিযোগ্য। শিশুকে অবজ্ঞা, অপমান কিংবা ভয় দেখানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার আইনি প্রতিকার পেতে অভিভাবকের মাধ্যমে কোনো শিশু এলে তার আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু এরপরেও বাংলাদেশে শিশুরাই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ নীতি বা আইন ঠিকমতো মেনে চলা হচ্ছে কি-না তা মনিটর করার ব্যবস্থা নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের শিশু আইনে শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। পাশাপাশি জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের অধিকারের কথা বলা আছে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্পোরাল পানিশমেন্ট নিষিদ্ধ করেছে ২০১১ সালে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

'নীতি-আইন সব কাগুজে বাঘ'
বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেনের চাইল্ড রাইট গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রটেকশন-এর পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলছেন, শিশুকে যথাযথ ভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোতে গড়ে ওঠেনি এবং নীতি-আইনগুলো এক্ষেত্রে সব কাগুজে বাঘের মতো।
"পরিবারেই শিশুর প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা হয়। সেখানে শাসন ও নির্যাতনকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। অনেক জায়গায় এখনো মনে করা হয় যে কড়াকড়ি হলে স্কুল ভালো। শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব কার? খেলার মাঠে, পাড়া মহল্লায় তাকে সুরক্ষা কিভাবে দেয়া হবে তা নিয়ে কোথাও স্পষ্ট কিছু নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, "শিশু মন্ত্রণালয়েই তো শিশুর জন্য কিছু নেই। তার বিকাশ, সুরক্ষা ও মত প্রকাশকে নিরাপদ ও বাধাহীন করতে কিছু নেই। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে এগুলো অভিভাবক থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবাই কতটা অনুধাবন করে সেটাই বড় প্রশ্ন"।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর ডিরেক্টর (ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশনস) নিশাত সুলতানা।
তার মতে, শিশুর প্রতি ক্রমবর্ধমান নির্যাতন বাড়ার এর প্রধান কারণ হলো, অন্যান্য আইনের মতো শিশুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দেয়ার আইনগুলোও এদেশে বাক্সবন্দী হয়ে রয়েছে। তিনি মনে করেন এখানে আইনের শাসন নেই, নেই শিশু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির উদাহরণ।
"শিশুদের প্রতি নির্যাতন তো কমেই নি বরং দিন দিন এর ব্যাপকতা বাড়ছে, নির্যাতনের ধরনও বীভৎস থেকে বিভৎসতর হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিষয়গুলো আমাদের অনেকটাই গা সহা হয়ে যাচ্ছে। শিশু আইনের- ২০১৩ কে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি বিধিমালা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখেনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
মিজ সুলতানার মতে, খুব বড় রকমের ঘটনা ছাড়া বাকীগুলো বিচারের আওতাতেই আসে না। অন্যদিকে যারা ধরা পড়েন, তারাও কয়েকদিন পর আইনের ফাঁক গলে বাইরে বের হয়ে আসেন।
"শিশুদের দাবী কখনো সবার দাবী হয়ে ওঠেনি। অথচ আমাদের প্রতিটি ঘরে আছে শিশুর বাস। শিশুর প্রতি নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে গঠিত হবে একটি বিকলাঙ্গ বাংলাদেশ," বলছিলেন তিনি।








