জুলাই আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি- কী অর্থ বহন করে?

জুলাই আন্দোলন চলার সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জুলাই আন্দোলন চলার সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে
    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশেরই আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজ্ঞদের অনেকে।

ভবিষ্যতে এই অধ্যাদেশ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

রোববার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা এ সংক্রান্ত গেজেটটি প্রকাশ করে।

এই অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং নতুন করে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা দায়ের করা আইনত বারিত (করা যাবে না) হবে।"

তবে, কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

অধ্যাদেশে এই হত্যাকাণ্ডের সংজ্ঞা হিসেবে ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি ছিলো; সরকারও আশ্বাস দিয়েছিল।

পরে বিভিন্ন পর্যায়ে তা কার্যকর করার পর আন্দোলনকারীরা অধ্যাদেশ জারির দাবি করলে তা রোববার জারি করা হয়।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কালকে সুনির্দিষ্ট না করা, ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসিতে তদন্তের স্থলে সংশোধনী না এনেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের ভার দেওয়াসহ পুরো প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এখতিয়ার না থাকলেও হত্যার মতো ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের ভার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে ন্যস্ত করার সমালোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।

একইসাথে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সংসদ কার্যকর হওয়ার পরে এখন যেসব অধ্যাদেশ পাস করছে, সেগুলোর কোনো অর্থ থাকবে না বলে জানান মি. মালিক।

এদিকে, এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি দাবি করেন, অধ্যাদেশ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগই নাই।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "আমাদের এই অধ্যাদেশে কোনো অবস্থাতেই জুলাই গণ অভ্যুত্থানকারীদের হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো বিচারের বিধান করা হয় নাই। এখানে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সাথে সম্পর্কহীন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে যেমন, কোনো সম্পত্তির লোভে বা পূর্ব শত্রুতাবশত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাথে একদম সম্পর্কহীনভাবে যদি কোনো হত্যাকাণ্ড করা হয় সেটার বিচারের কথা বলা হয়েছে। কাজেই এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নাই।"

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে হত্যার অভিযোগ ও তদন্ত ভার দেওয়ার বিষয়ে মি. নজরুল বলেন, "আমরা মানবাধিকার কমিশনের কাছে দিয়েছি যাতে মানুষের হয়রানি কম হয়।"

জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আন্দোলন ঘিরে এত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা দেখা যায়নি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আন্দোলন ঘিরে এত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা দেখা যায়নি

অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্ট মাসে ছাত্রজনতার সম্মিলিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত গণ অভ্যুত্থানকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই অধ্যাদেশে।

এই অধ্যাদেশে ২০২৪ সালের পহেলা জুলাই থেকে শুরু হওয়া জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে 'গণ অভ্যুত্থানকারী' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে এই জুলাই গণ অভ্যুত্থান বলেও এতে বলা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে কয়েকশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাবে জুলাই অভ্যুত্থানে ৮৪৪ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাপক সহিংসতায় প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণহানির তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘ। পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪৪ জন্য সদস্যের মৃত্যুর তথা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক এই অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি মনে করেন, "বিচার পাওয়ার অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ঢালাওভাবে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া যায় না।"

অপারেশন ক্লিনহার্ট নিয়ে যৌথ অভিযান দায়মুক্তি অধ্যাদেশ-২০০৩, কুইক রেন্টাল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে মি. মালিক বলছেন, এইসব দায়মুক্তিগুলোকেই পরবর্তীতে আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছিলো।

মি. মালিক জানান, যেদিন সংসদ অধিবেশন বসবে সেদিন সকল অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করতে হবে।

ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদ সিদ্ধান্ত নিবে আর যদি বাতিল না হয় তবে ৩০ দিনের মধ্যেই সকল অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাবে বলে জানান তিনি।

জুলাই আন্দোলন চলাকালে একশনে পুলিশ, ফাইল ছবি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জুলাই আন্দোলন চলার সময় পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হয়েছে। আবার পুলিশও বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণের শিকার হয়েছে।

'তদন্তের এখতিয়ার কই মানবাধিকার কমিশনের'

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যদি কোনো গণ অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ থাকে, তবে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করতে হবে।

কমিশন তদন্ত করে যদি দেখে যে সংশ্লিষ্ট কার্যটি 'রাজনৈতিক প্রতিরোধের' অংশ ছিল, তবে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো মামলা চলবে না।

তবে কমিশন চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।

এদিকে, আইনজীবীরা বলছেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হত্যা মামলা দায়ের করার যে প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়েছে সেটিও ত্রুটিপূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, "এই অধ্যাদেশে মামলা করার একটা এক্সেপশন দিচ্ছে। ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে যদি কেউ হত্যা করে তবেই মামলা দায়ের করা যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারে নিযুক্ত পিপি বা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইনজীবীদের প্রত্যয়ন পত্র লাগবে। এতে দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে।"

তবে জুলাই অভ্যুত্থানের আড়ালে যারা বিভিন্ন রকমের ব্যক্তিগত কাজে এই ঘোলাটে পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, সেটার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, ভিকটিম হয়েছেন তাদের বিচার পাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হলেও "কিন্তু এই অবস্টেকলগুলা আবার রয়ে গেলো। এই অবস্টেকলগুলা না থাকলে বরং সরাসরি মামলা করার অপশন থাকলে ভালো হতো" বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

ফৌজদারি কার্যবিধি,১৮৯৮ অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলায় তদন্তের এখতিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ফৌজদারি মামলায় শুধুমাত্র সাব- ইন্সপেক্টরের নিম্নে নহে এমন কর্মকর্তা তদন্ত করবেন।

বিষয়টি উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মার্ডারের মতো সিরিয়াস অফেন্সের তদন্তের ক্ষমতা দিচ্ছে কাকে প্রাইমারিলি যার কথার ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হবে সেটা হচ্ছে মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু মানবাধিকার কমিশনের এই এখতিয়ার কই? মূল আইনে সংশোধনী কই? ফলে পুরোটাই একটা জগাখিচুড়ি প্রসেস।"

ওই অভ্যুত্থানের মধ্যে এবং সরকার পতনের পরে বিক্ষোভকারীদের রোষের মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের ওই আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার খবর জানা যায়।

অভ্যুত্থানকারীদের ওপর চলা সহিংসতার জন্য তৎকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচার করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

ভবিষ্যতে এই পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন,"ইনডেমনিটি ব্যাপারটা অলওয়েজই প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং হতে বাধ্য। ধরেন পুলিশের বিভিন্ন থানায় অ্যাটাক হইছে। অনেক পুলিশ হত্যার শিকার হয়েছেন। পুলিশের পরিবাররা যদি কোনো কারণে ভবিষ্যতে ধরেন ২০ বছর পরে রেজিম চেঞ্জ হয় তাহলে ওরা ইনডেমনিটি বাতিল হয়ে আবার ট্রায়ালের চেষ্টা করবে। ওরা ক্ষতিগ্রস্তরা আসবে।"