ভৈরবে ট্রেন দুর্ঘটনার পর রেল যোগাযোগ আবার চালু

ছবির উৎস, Antor
কিশোরগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, ভৈরব রেলস্টেশনে দুর্ঘটনার পর বন্ধ থাকা রেল যোগাযোগ মধ্যরাতের পর আবারো চালু হয়েছে।
তিনি বলেন, মালবাহী ট্রেনটি রাতেই ঘটনাস্থল থেকে স্টেশনে ফিরে গেছে। যাত্রীবাহী ট্রেনটিরও বিধ্বস্ত তিনটি বগি রেখে বাকি ট্রেনটি ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
হতাহতের সংখ্যা আর বাড়েনি। এপর্যন্ত ১৭ জন নিহত হয়েছে। এরমধ্যে ১৬ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি এক জনের মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। সেটি কিশোরগঞ্জ মর্গে রাখা হয়েছে।
মি. রহমান জানান, নিহতদের দাফন ও সৎকারের জন্য ২৫ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। তবে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো এ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
এরআগে, দুর্ঘটনার পর ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম, সিলেট এবং ময়মনসিংহ রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
সোমবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টের জগন্নাথপুর নামক জায়গায় যাত্রীবাহী একটি রেলে আরেকটি মালবাহী ট্রেনের ধাক্কা দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনাস্থল থেকে ভৈরব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সবুজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এগারসিন্ধুর গোধূলী নামের ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা সোয়া ৩টার দিকে ভৈরব স্টেশনে এসে পৌঁছায়। এরপর সেখানে ট্রেনটির ইঞ্জিন বদল করা হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।''
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এর কিছুক্ষণ পর ট্রেনটি যখন জগন্নাথপুর রেল ক্রসিং পার হচ্ছিলো, তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি মালবাহী ট্রেন এগারসিন্ধুর গোধূলীর শেষের তিনটি বগিতে ধাক্কা দেয়। এতে যাত্রীবাহী ট্রেনটির বগি তিনটি উল্টে ঘটনাস্থলেই ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
“স্থানীয়রাই তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। পরে ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন”- বলছিলেন মিস্টার রহমান।
রোগীর চাপে শুরুতে হিমসিম খাচ্ছিলেন ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। পরে আশপাশের অন্যান্য হাসপাতাল থেকে মেডিকেল টিম এসে তাদের সাথে যুক্ত হয়।
আহতদেরকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরো তিন জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গুরুতর অবস্থায় বেশ কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের অন্যান্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও রেলের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেল পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সিগনালের ত্রুটির কারণেই দুর্ঘনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তারা।
হাসপাতালে আহাজারি আর কান্নার রোল

ছবির উৎস, Antor
দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে ভৈরবের উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে সেখানে আসেন কিশোরগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম। গোটা হাসপাতাল এখন আহতদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে আছে বলে জানাচ্ছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ হাসপাতালটিতে ৭৫ জনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে তিন জন মারা গেছে। এছাড়া গুরুতর আহত ২২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আহতদের অনেকেরই হাত-পা ভেঙে গেছে। তারা ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।”
“এটি একটি ছোট হাসপাতাল। আমাদের জনবলও কম। কাজেই জেলার অন্যান্য হাসপাতাল থেকেও ডাক্তার-নার্সদের এখানে আনা হয়েছে। এখন প্রায় ৫০ জন ডাক্তার এবং একশ’ জনের বেশি নার্স এখানে কাজ করছে। আমরা আমাদের সাধ্যতম সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আহতদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালগুলোতে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তাদের মরদেহও এই হাসপাতালে রাখা হয়েছে। ফলে মরদেহ নেওয়ার জন্য সেখানে আসছেন স্বজনরা। তাদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, আহাজারি করছেন কেউ কেউ।

ছবির উৎস, Antor
মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তাই মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনায় আহতদের ব্যাপারে হুট করে কিছু বলা মুশকিল। আমরা এখানে যেটা দেখছি, সেটা আসলে বাইরের ক্ষত। মাথায় বা শরীরের অন্যান্য স্পর্শকাতর অংশে আঘাত লেগে থাকলে সেগুলোর টেস্ট করাটা জরুরী।''
''এটা না করে কিছুই বলা যাবে না। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য যাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, তাদের মধ্যেও বেশ কয়েক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক,” তিনি বলেন।

ছবির উৎস, Antor
তদন্ত কমিটি গঠন
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেল মন্ত্রণালয়, রেল ভবন এবং রেলের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তিনটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ।
“এই দুর্ঘটনাটি বেশ বড় এবং ক্ষয়ক্ষতিও বেশি। ইতিমধ্যেই ১৭ জন মারা গেছেন এবং বহু যাত্রী আহত হয়েছেন। কাজেই কারো অবহেলায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে থাকলে, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে কমিটিগুলো কতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিবে, সে ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেননি তিনি।








