ধর্ষণবিরোধী পদযাত্রায় আসলে কী ঘটেছিল?

লাঠিচার্জ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শান্তিপূর্ণ গণপদযাত্রা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

ঢাকায় ধর্ষণবিরোধী একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনকালে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীরা একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

মঙ্গলবারের ওই সংঘর্ষের ঘটনার কিছু ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও উভয়ের পক্ষে-বিপক্ষে নানান আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাদের "শান্তিপূর্ণ" কর্মসূচিতে পুলিশ অন্যায়ভাবে বাধা দিয়ে লাঠিপেটা করেছে।

"আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিতে যাচ্ছিলাম। এর মধ্যে পুলিশ প্রথমে এসে ব্যারিকেড দেয়। এরপর হঠাৎ তারা আমাদের মারা শুরু করে, একেবারে র‍্যানডমলি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিক্ষোভকারীদের অন্যতম নেতা অদ্রিতা রায়।

এ ঘটনায় জড়িত পুলিশের একজন কর্মকর্তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের দাবি জানিয়েছে বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাটফর্ম 'ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ'। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্য পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে প্ল্যাটফর্মটি।

অন্যদিকে, পুলিশ এ ঘটনার জন্য উল্টো বিক্ষোভকারীদের দুষছে। পদযাত্রার নামে পুলিশের ওপর "পরিকল্পিতভাবে" হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছে তারা।

"সেখানে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি বিশ্লেষন করে মনে হচ্ছে তারা পরিকল্পিতভাবেই পুলিশের ওপর হামলা করেছে এবং তাতে আমাদের বেশ কিছু সদস্য আহত হয়েছেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।

সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ইতোমধ্যে একটি মামলা করা হয়েছে।

এদিকে, পুলিশের ওপর হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে একদল শিক্ষার্থী। হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি করেছেন তারা।

কিন্তু মঙ্গলবারের বিকেলে রমনায় সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল কীভাবে?

আরও পড়তে পারেন:
ব্যারিকেড

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শাহবাগ পার হওয়ার পর ব্যারিকেড দিয়ে গণপদযাত্রা আটকে দেয় পুলিশ

বিক্ষোভকারীরা যা বলছেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভসহ নানান কর্মসূচি পালন করে আসছে 'ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ'।

মঙ্গলবারের গণপদযাত্রা কর্মসূচিটিও কয়েকদিন আগে ঘোষণা করা হয়েছিল।

সেই ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে গণপদযাত্রা শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। উদ্দেশ্য ছিল প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া।

শাহবাগ মোড় পার হয়ে বিক্ষোভকারীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে গেলে পুলিশ সেখানে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়।

"তখন আমরা যারা পদযাত্রার সামনে ছিলাম, তারা পুলিশের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম," বলছিলেন বিক্ষোভকারীদের অন্যতম নেতা অদ্রিতা রায়।

"আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় আমাদের স্মারকলিপি দেওয়ার ব্যাপারে জানে। এরমধ্যেই হঠাৎ করে পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়," বলেন মিজ রায়।

সেসময় পুলিশ সদস্যরা "নির্বিচারে" লাঠিপেটা করে বলে অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

"তারা নির্বিচারে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। এমনকি পেছন থেকে সিভিলে আইসাও পুলিশ সদস্যরা মারধর করছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঘটনার সময় আহত সীমা আক্তার।

বিক্ষোভকারীদের হাতে অন্তত সাতজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিক্ষোভকারীদের হাতে অন্তত সাতজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ

বেশ কয়েকজন পুলিশ একত্রিত হয়ে কারো কারো ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

"আমাকে চার-পাঁচটা মেয়ে পুলিশ ধরেছিল। এর মধ্যে দু'জন আমার গলার ওড়না দিয়ে আমাকে ফাঁস দেওয়ার ট্রাই করে," বলছিলেন সিরদাতুল মুন্তাহা নামে আরেক বিক্ষোভকারী।

এসব ঘটনার সময় বিক্ষোভকারীরাও যে পুলিশের ওপর চড়াও হয়েছেন, সেটা অবশ্য অস্বীকার করছেন না তারা।

"কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই পুলিশ আমাদের ওপর হামলা করেছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই আত্মরক্ষার্থে সবাই এটা করতে বাধ্য হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সৈকত আরিফ।

পুলিশ চড়াও না হলে সংঘর্ষ হতো না বলেও দাবি করছেন অনেকে।

"তাদের উচিৎ ছিল আরেকটু সহনশীল আচরণ করা। তাহলে পরিস্থিতি ওই পর্যায়ে যেত না," বলেন মিজ আক্তার।

কেউ কেউ এটাও অভিযোগ করছেন, পুলিশ "ইচ্ছাকৃতভাবেই" কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে।

"ধর্ষণের ঘটনার বিচারের পাশাপাশি আমরা যেহেতু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়ে স্মারকলিপিটা দিতে যাচ্ছিলাম, সেজন্য পুলিশ ইচ্ছে করেই এটা করেছে বলে আমার মনে হয়," বিবিসি বাংলাকে বলেন মিজ আক্তার।

মুখোমুখি পুলিশ ও বিক্ষোভকারীরা। মঙ্গলবারের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুখোমুখি পুলিশ ও বিক্ষোভকারীরা। মঙ্গলবারের ছবি।

পুলিশের বক্তব্য কী?

বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর দায় চাপানো হলেও কর্মকর্তারা অবশ্য সেটি অস্বীকার করছেন। বরং সংঘর্ষের জন্য আন্দোলনকারীরাই দায়ী বলে মনে করছেন তারা।

"তারাই প্রথম পুলিশের ওপর হামলা করেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ডিএমপি'র গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।

পুলিশ দাবি করেছে যে, বিক্ষোভকারীদের পথরোধ করার কোনো ইচ্ছা তাদের ছিল না।

"প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে রওনা দেওয়ার আগ পর্যন্ত তো আমরা তাদের বাধা দেইনি," বলেন ডিএমপি'র রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম।

"কিন্তু তারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে না গিয়ে তার বাসভবনের দিকে রওনা হওয়ার কারণে পুলিশ ব্যারিকেড দিতে বাধ্য হয়েছে," বলেন মি. আলম।

উল্লেখ্য যে, গত আটই অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন দাবিতে একের পর এক ঘেরাও এবং অবস্থান কর্মসূচির মুখে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ডিএমপি।

মঙ্গলবার সেকারণেই বিক্ষোভকারীদের সেখানে পদযাত্রা নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থামানোর পর একটি ছোট প্রতিনিধি দল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিতে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও জানান তারা।

"কিন্তু তারা সেটা না করে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়," বলেন মি. আলম।

বিক্ষোভকারীদের হামলায় পুলিশের দুই নারী সদস্য এবং দুই কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে সাতজন আহত হন বলে ডিএমপি'র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এ ঘটনাকে "পরিকল্পিত" দাবি করেছে পুলিশ।

"বিশ্লেষণে আমাদের এটাই মনে হয়েছে। ঠিক কী উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন পুলিশের উপ-কমিশনার মি. রহমান।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অ্যাকশন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অ্যাকশন

কী বলছেন এসি মামুন?

সংঘর্ষের ঘটনার পর বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ তোলা হয়েছে ঢাকার রমনা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে।

তাকে অপসারণের জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামও দিতে দেখা গেছে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘর্ষ চলাকালে মি. মামুনের বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে।

সেখানে সিভিল ড্রেসে পুলিশের ক্যাপ মাথায় থাকা এই কর্মকর্তাকে নারীসহ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীর ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে।

"উনার আচরণ কেমন আক্রমণাত্মক ছিল সবাই সেটা দেখেছে। তিনি রীতিমত পেছন থেকে এসে নারীসহ অন্য আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন অন্যতম বিক্ষোভকারী সৈকত আরিফ।

বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

"পুরো ঘটনা তুলে না ধরে আংশিক ভিডিও বা ছবি দেখিয়ে অনেকে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মামুন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, বিক্ষোভকারীদের নেতারা যখন পুলিশের সঙ্গে স্মারকলিপি জমার অনুমতির বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন পেছন থেকে কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ছিলেন।

"এরকম একজনকে ধরে আমি জাস্ট বলছি যে, আপনি ঢিল মারতেছেন কেন? এটা বলার সাথে সাথে তারা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে আমাকে মারতে শুরু করে," বলছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন।

আন্দোলনকারীদের কিল-ঘুসি মারা এবং এক নারীর চুল ধরার কারণ জানতে চাইলে মি. মামুন বলেন, "তখন তারা যেভাবে ঘিরে ধরে আমাকে মারছিল, এগুলো না করলে আমাকে ছাড়তো না। আত্মরক্ষার্থেই আমি এগুলো করেছি।"