করোনার ভয়ে তিন বছর ধরে ছেলেকে নিয়ে ঘর-বন্দি ছিলেন ভারতের এক নারী

ছবির উৎস, ANI
- Author, সুশীলা সিং
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
ভারতের রাজধানী দিল্লি লাগোয়া গুরুগ্রামের এক অদ্ভুত ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে এক নারী তার ছেলেকে নিয়ে গত তিনবছর ধরে ঘর-বন্দী থেকেছেন।
করোনার ভয়ে তিনি ঘর বন্ধ করে বসবাস করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ওই নারীকে উদ্ধার করার পরে পুলিশ জানতে পেরেছে যে তার ছেলের হাঁপানির রোগ ধরা পড়ে ২০১৫-১৬ সালে। এরপরে করোনা মহামারির সময়ে ভয়ে স্বামীকেও বাড়িতে আসতে বারণ করে দেন তিনি। স্বামী বাধ্য হয়ে কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন, কিন্তু তিনি নিয়মিত খাবার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিয়ে আসতেন স্ত্রীকে।

ছবির উৎস, Getty Images
করোনার ভয়ে ৩ বছর ঘর-বন্দী
গুরুগ্রাম পূর্বের সহকারী পুলিশ কমিশনার ড. কবিতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ওই পরিবারটির ব্যক্তিগত পরিসরকে সবার সম্মান জানানো উচিত, তাই তিনি পরিবারের কারও নাম নিতে চান নি। তিনি জানান, ওই নারীর স্বামী শিশু কল্যাণ কমিটির কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। তারপরেই পুলিশ এবং শিশু কল্যাণ কমিটি ওই নারী এবং তার সন্তানকে উদ্ধার করে।
ড. কবিতার কথায়, “ওই নারীর ভয় ছিল যে ছেলেকে যদি করোনা মহামারির সমে বাইরে বেরতে দেন, তাহলে সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এমনকি তার মৃত্যুও হতে পারে। ছেলের যেহেতু হাঁপানির রোগ আগেই ধরা পড়েছে, তাই তার ভয়টা বেশি ছিল। মহামারি শেষ হওয়ার পে তার স্বামী অনেক বুঝিয়েছেন, কিন্তু তিনি বুঝতে চান নি। এরপরেই ওই ব্যক্তি সহায়তা চান।“
পুলিশ যখন তাদের উদ্ধার করতে বাড়িতে ঢোকে, তখন তারা দেখতে পায় যে একটা ঘরে সমস্ত জঞ্জাল জড়ো করে রাখা আছে।
ওই নারী এবং তার সন্তানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে এটা বুঝতে যে এই তিন বছরের ঘটনা তাদের শরীর বা মনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে।

ছবির উৎস, ANI
রোগের আতঙ্ক থেকে মানসিক সমস্যা
তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুগ্রামের মতো ঘটনা কিন্তু প্রথম ঘটল না।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এর আগে দিল্লির কাছে নয়ডায় দুই বোনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল, কারণ তারা বাবার মৃত্যুর পরে ছয় মাস নিজেদের ঘর-বন্দী করে রেখেছিলেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, রোগের আতঙ্ক থেকে যে মানসিক সমস্যা তৈরি হয়, তাকে হাইপোকনড্রিয়েসিস বলে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিশা খান্না বলছেন, “এই নারীর মনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে সন্তানের যাতে করোনা না হয়ে যায়, সেজন্য তিনি নিজেকে আর সন্তানকে ঘর-বন্দী করে রেখেছিলেন তিন বছর ধরে। সন্তানকে সম্পূর্ণভাবে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এই সময়ে। তিনি যে মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।“
আরেক মনোরোগ চিকিৎসক ডা. সৌম্যা মুদগলের কথায়, “করোনার সময়ে অনেক মানুষের মধ্যেই এইধরনের আতঙ্ক তৈরি হতে দেখেছি আমরা। এক্ষেত্রে ওই নারীর মানসিক সমস্যাটা ছিল সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তিনি নিজের স্বাভাবিক জীবন থেকেও সরে থেকেছেন।“
সামাজিক জীবন থেকে কোনও শিশুকে যদি সরিয়ে রাখা হয় দীর্ঘ দিন, তার প্রভাব শিশুটির ওপরেও নিশ্চিতভাবেই পড়বে বলে জানাচ্ছিলেন ডা. মুদগল।
“এই বাচ্চাটির বয়স ১০ সাল বলে আমরা জানতে পারছি। এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার জন্য বা বাইরে খেলাধুলো করতে যাওয়ার জন্য জেদ করার কথা। কিন্তু আমাদের এটা বুঝতে হবে যে ঘর-বন্দী থাকার সিদ্ধান্তটা কি তার ওপরে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, না কি সে নিজে জেনে-বুঝে ঘরে আটকে থাকছিল। যাই হয়ে থাক, এই ঘটনার প্রভাব তার মনের ওপরে পড়বেই,” বলছিলেন ডা. মুদগল।

ছবির উৎস, ANI
শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে সমস্যা
দুই বিশেষজ্ঞই জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে কোনও শিশুকে সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে তার ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হবে। বাচ্চাটি ইন্ট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী হয়ে যেতে পারে, বা সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করতে তার সমস্যা হতে পারে। আতঙ্কও তৈরি হয় বাচ্চাদের মধ্যে। আর পড়াশোনাও প্রভাবিত হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, “শিশুটির মনে তার পরিবারের ওপর থেকেও ভরসা চলে যেতে পারে। সে যখন দেখবে যে তাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য তিন বছর আটকে রাখা হয়েছিল, কিন্তু বাইরে বেরিয়ে সে দেখতে পাবে যে অন্য বাচ্চাদের থেকে সে অনেক ব্যাপারেই পিছিয়ে পড়েছে, তখন তার মনে একটা শক লাগবে।“
তবে এই ঘটনায় ঐ নারীর স্বামীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, পুলিশ বা শিশু কল্যাণ কমিটির কাছে তিনি আগে কেন সহায়তা চাইলেন না।








