‘দ্যা কেরালা স্টোরি’ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে প্রযোজক

পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছে 'দ্যা কেরালা স্টোরি'

ছবির উৎস, SUNSHINE PICTURES

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছে 'দ্যা কেরালা স্টোরি'

বিতর্কিত ছায়াছবি ‘দ্যা কেরালা স্টোরি’ পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধ ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেছেন ছবিটির প্রযোজক। এই ছবিটিতে “যেসব দৃশ্য দেখানো হয়েছে তা রাজ্যের শান্তি শৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে আশঙ্কা করে কলকাতা সহ সব জেলাতে এই ছবির প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হল,” সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় সোমবার।

ওই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ‘কাশ্মীর ফাইলস’ ছবিটি নিয়ে মন্তব্য করায় মিজ ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ তুলেছেন ‘কাশ্মীর ফাইলসে’র পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী।

কেরালা থেকে বড় সংখ্যায় মুসলমান নারীদের ধর্মান্তরিত করে ইসলামিক স্টেটের হয়ে লড়াই করার জন্য সিরিয়া, আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এমনই ঘটনা দেখানো হয়েছে ওই ছবিটিতে।

গত শুক্রবার হলে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগে থেকেই এটিকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। প্রযোজক সংস্থা ছবিটির যে ট্রেলার প্রকাশ করেছিলেন ইউটিউবে, সেখানে বলা হয়েছিল ৩২ হাজার নারীকে কেরালা থেকে নিয়ে গেছে আইএস।

পরে অবশ্য চাপে পড়ে তারা বয়ান বদল করে লেখে যে তিনটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি।

কিন্তু এই ছবিটি আসলে বিজেপি-আরএসএসের স্বপক্ষে প্রচারমূলক একটি ফিল্ম, এমনটাই অভিযোগ ওঠে।

শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক, যাতে রাজনীতিবিদ, সিনেমা শিল্পের দিকপাল ব্যক্তিত্ব সবাই যোগ দেন।

শাবানা আজমির মতো পরিচিত বিজেপি-বিরোধী অভিনেত্রীও ছবির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
পরিচালক সুদীপ্ত সেন

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, পরিচালক সুদীপ্ত সেন বলছেন মমতা ব্যানার্জী ছবিটা একবার দেখুন

‘মমতা দিদি ছবিটা একবার দেখুন’

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ছবিটির প্রযোজক বিপুল শাহ পশ্চিমবঙ্গে ছবিটি নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে যেমন আবেদন করেছেন, তেমনই তামিলনাডুতেও যেভাবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে হলগুলি থেকে ছবিটি তুলে নেওয়া হয়েছে, সেই প্রসঙ্গও এনেছেন। প্রযোজকদের দাবি ছবিটি চলার সময়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুক রাজ্য সরকার। মনে করা হয়, সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি না করলেও হল মালিকদের ওপরে প্রভাব খাটিয়ে ‘দ্যা কেরালা স্টোরি’ তুলে নিতে বাধ্য করেছে সে রাজ্যের সরকার।

আদালতে আবেদনের পাশাপাশি ‘দ্যা কেরালা স্টোরি’র পরিচালক সুদীপ্ত সেন মঙ্গলবার সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে ছবিটিকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে” নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মি. সেন এএনআইকে বলেছেন, “আমি অনুরোধ করব মমতা দিদি ছবিটা একবার দেখুন। ২০১৮ সালে সঞ্জয় লীলা ভান্সালির পদ্মাবত নিয়ে যখন বিতর্ক চলছিল, তখন মমতা ব্যানার্জীই পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

“ওই রাজ্যে একটাও অপ্রীতিকর ঘটনা তো ঘটে নি। ছবিটির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। আমার অনুরোধ ছবিটা দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নিন,” জানিয়েছেন মি. সেন।

তিনি আরও বলেন, “মহুয়া মৈত্র, মমতা ব্যানার্জী এরা তো বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকারের কথা বলেছিলেন পদ্মাবতের ওপরে যখন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। জানি না আমার ছবিটা নিয়ে তার কী সমস্যা হল যে তার মনে হল এটা আইন শৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি করবে। ছবিটা দেখলে তার নিশ্চয়ই ভাল লাগবে আর তিনি গর্ব বোধ করবেন যে একজন বাঙালি পরিচালক এই সিনেমাটা বানিয়েছেন বলে।“

যদিও যে রাজ্যে ঘটনা নিয়ে ছবিটি, সেই কেরালা সরকার ছবিটির ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি, কিন্তু সেই রাজ্যে ছবিটি দেখানোর জন্য বেশি হলই পাননি ‘দ্যা কেরালা স্টোরির’ পরিবেশকরা।

অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি শাসিত সরকার ছবিটিকে করমুক্ত বলে ঘোষণা করেছে আর উত্তরপ্রদেশ সরকারও একই ঘোষণা করতে চলেছে।

বক্স অফিসে প্রথম চারদিনে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে ছবিটি। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দেড় কোটি টাকা তুলেছে ছবিটির প্রযোজক সংস্থা।

কাশ্মীর ফাইলস ছবির দৃশ্য

ছবির উৎস, KASHMIR FILES / SCREENGRAB

ছবির ক্যাপশান, কাশ্মীর ফাইলস ছবিটি নিয়ে মন্তব্যের কারণে মমতা ব্যানার্জীকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে

৪৬ এর দাঙ্গা নিয়ে এরপরের ছবি?

মমতা ব্যানার্জী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “একটি রাজনৈতিক দল আগুন নিয়ে খেলা করছে, জাতপাত নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি করছে। ‘কাশ্মীর ফাইলস’ ছবিটা কেন করা হয়েছিল? এক শ্রেণির মানুষকে অপমান করতে?

“দ্য কেরালা ফাইলস (স্টোরি)তে বিকৃত তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিজেপি একজনকে বেছে নিয়েছে, তাকে অর্থ দিচ্ছে বিজেপি। তারা বাংলাতেও এসেছিল। তারা একটা বিকৃত তথ্য নিয়ে বেঙ্গল ফাইলস বলে একটা ছবি বানাতে চাইছে,” বলেছিলেন মমতা ব্যানার্জী।

ঘটনাচক্রে, ‘কাশ্মীর ফাইলস’ ছবিটি যিনি বানিয়েছিলেন, সেই বিবেক অগ্নিহোত্রী কিছুদিন আগে কলকাতায় এসে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, দ্যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে গেছেন। তার হয়ে একটি গবেষক দল কাজও করছে পশ্চিমবঙ্গে।

আরএসএস-বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ৪৬-এর দাঙ্গার জন্য সম্পূর্ণভাবে মুসলমান সমাজকে দায়ী করে থাকে এবং ওই দাঙ্গায় গোপাল পাঁঠা (এটিই তার নাম) যেভাবে হিন্দুদের হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই কাহিনীগুলি স্মরণ করায়।

মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরে পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী একটি টুইট করে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে কেন ওই সব মন্তব্যের জন্য মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা হবে না? তিনি এটাও উল্লেখ করেছিলেন যে তার প্রস্তাবিত ছবিটির নাম বেঙ্গল ফাইলস নয়, নাম ‘দিল্লি ফাইলস'।

“খিলাফত দ্বারা উৎসাহ পেয়ে ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে গণহত্যায় যারা জীবিত আছেন, তাদের সাক্ষাতকার নিতে গিয়েছিলাম আমি। আপনি তাতে এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”, টুইট করেছিলেন মি. অগ্নিহোত্রী।

মঙ্গলবার মি. অগ্নিহোত্রীর আইনজীবী মমতা ব্যানার্জীকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

নোটিশে বলা হয়েছে যে বিজেপি তাকে অর্থ দিয়েছে কাশ্মীর ফাইলস তৈরি করার জন্য, সেখানে তথ্য বিকৃতি ঘটানো হয়েছে ইত্যাদি মন্তব্যের মাধ্যমে এবং দিল্লি ফাইলস যাতে দিনের আলো দেখতে না পায়, তার জন্য চাপ তৈরি করা হয়েছে মমতা ব্যানার্জীর ওই সংবাদ সম্মেলনে।

ওই মন্তব্যের জন্য মমতা ব্যানার্জী এক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমা না চাইলে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা হবে বলেও আইনি নোটিশে লেখা হয়েছে।

মমতা ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজেপি সবসময়েই অভিযোগ করে যে মমতা ব্যানার্জী মুসলমান তোষণের রাজনীতি করেন

নিষেধাজ্ঞার পরে বিজেপির নিশানায় মমতা

‘দ্যা কেরালা স্টোরি’র ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরেই তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতারা বলতে থাকেন যে মমতা ব্যানার্জীর সিদ্ধান্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাত শক্ত করবে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ধিক্কার জানাচ্ছি। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং আইএসআইএসের কাছে আত্মসমর্পণের একটা নিদর্শন হল এই সিদ্ধান্ত। একটা সিনেমা, পরিচালক উপস্থাপিত করেছেন বাস্তব এবং তথ্য নির্ভর কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পশ্চিমবঙ্গে শুধুমাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সমস্ত সংখ্যালঘু সমাজকে আইএসের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়ে সংখ্যালঘুদের অপমান করলেন মুখ্যমন্ত্রী।''

তৃণমূল কংগ্রেস বলছে তারা চায় না যে কোনও সিনেমা যেন কোনও শ্রেণীর মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ওপরে আঘাত না করে।

দলটির নেতা রাহুল চক্রবর্তীর কথায়, “সিনেমাটা কতটা উন্নত মানের সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। কিন্তু আমরা চাইব না এমন কোনও বিষয়বস্তু হোক, যা এক শ্রেণির মানুষের ধর্মবিশ্বাসে, তার মূল্যবোধকে আঘাত করে। এর ফলে যদি কোনও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়, সেটা তো কাম্য নয়। এর আগে পদ্মাবত বা বিবিসির তথ্যচিত্রের ওপরেও তো নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। যারা মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করছে, তারাও তো সমালোচনার উর্দ্ধে নয়।''

সত্যজিৎ রায়ের তৈরী প্রথম টেলিফিল্ম সদ্গতি ভারতের সব জায়গায় দেখানো হয় নি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সত্যজিৎ রায়ের তৈরী প্রথম টেলিফিল্ম সদ্গতি ভারতের সব জায়গায় দেখানো হয়নি
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

চলচ্চিত্রের ওপরে নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়

‘দ্যা কেরালা স্টোরি’ ছবিটি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গেও একাধিক ছবির মুক্তি আটকিয়ে গেছে বা নিষিদ্ধ হয়েছে। সেই তালিকায় আছে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেনদের মতো পরিচালকদের ছবিও।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা বলছেন ১৯৫৯ সালে মৃণাল সেনের ছবি নীল আকাশের নীচে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ভারত সরকার। প্রায় দুমাস পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

সরকারি টেলিভিশন দূরদর্শনের জন্য নির্মিত প্রথম টেলিফিল্ম ‘সদ্গতি’ পরিচালনা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেটা সব রাজ্যে দেখানো হয়নি।

দোমিনিক লাপিয়েরেরর কাহিনী অবলম্বনে ‘সিটি অফ জয়’ ছবিতে কলকাতাকে বিকৃতভাবে দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে, অশান্তিও হয় সেই সময়ে। কলকাতায় শুটিং বন্ধ করে দিতে হয়।

সাম্প্রতিক কালে সুমন মুখার্জির ‘কাঙাল মালসাট’ এর বেশ কিছু দৃশ্য নিয়ে আপত্তি তোলেন তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। কাটছাঁটের পরে হলে মুক্তি পায় ছবিটি। আবার পরিচালক অনীক দত্তের ভবিষ্যতের ভূত ছবিটি মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে হল থেকে তুলে নেওয়া হয়। সেখানেও ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের কাজকর্ম নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কিছু দৃশ্য ছিল।

তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার বলছিলেন, “একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে আমি মনে করি না কোনও সিনেমাই ব্যান করা উচিত। তা সিনেমা হোক, বই হোক বা নাটক হোক। নিষিদ্ধ করলেও মানুষের সেটা দেখার বা পড়ার আগ্রহটা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এটাও বলব যে পরপর যে ধরনের ছবি বানানো হচ্ছে, তা একেবারেই হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারাকে সেলুলয়েডের মতো একটা শক্তিশালী মাধ্যমের সাহায্যে মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

“এটা করা হচ্ছে ২০২৪ এর নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই,” বলছিলেন সৌমিত্র দস্তিদার।