কলকাতার ধর্মতলায় যে ধর্মঠাকুরের পুজা হচ্ছে তিনি কোন ধর্মের ঠাকুর?

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় হঠাৎ করেই ধর্মঠাকুরের পুজা শুরু করে সাড়া ফেলে দিয়েছে কলকাতার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি গোষ্ঠী। শুক্রবার থেকে শুরু হয়ে পাঁচদিন ধরে চলবে এই ধর্মঠাকুরের পুজো। কিন্তু কে এই ধর্মতলার ধর্মঠাকুর যার কথা সেভাবে শোনা যায়নি বহুদিন?

ধর্মঠাকুর আসলেই কি সনাতনী হিন্দুদের দেবতা, না কি তিনি বৌদ্ধদের অথবা ডোম, বাগদিদের মতো অন্ত্যজ শ্রেণীর আরাধ্য দেবতা?

ঘটনাচক্রে সনাতন ধর্মের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ব্রাহ্মণরাই পুজা করে থাকেন। কিন্তু এই ধর্মঠাকুরের পুজা করেন ডোম, বাগদিদের মতো অন্ত্যজ শ্রেণীর পুরোহিতরা - যাদের ‘ডোমপণ্ডিত’ বলে সম্বোধন করা হয়।

কলকাতার ধর্মতলা অঞ্চলে ধর্মঠাকুর পুজার মূল উদ্যোক্তা স্বামী সর্বানন্দ অবধূত বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, “সনাতন ধর্মের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে আমাদের এই বাংলা থেকে। প্রথমে মুসলমান শাসকরা, তারপরে ব্রিটিশ শাসকরা মুছে দিয়েছে আমাদের সনাতন হিন্দু ধর্মের অনেক ঐতিহ্য।

কেন ধর্মঠাকুরের পুজার আয়োজন?

"ইতিহাস ঘেঁটে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কলকাতার ধর্মতলায় একটা সময়ে ধর্মঠাকুরের পুজো হত ব্যাপক ভাবেই। পাশ দিয়েই গঙ্গা প্রবাহিত হত, আর ওই অঞ্চলে বসবাস করত জেলে আর আদিবাসীরা। তারাই আদিকালে ধর্মঠাকুরের পুজো করত শিলাখণ্ডে। সেই প্রথা সনাতন ধর্মে চলে আসছে। আমরাও শিলাখণ্ডকেই পুজো করছি ধর্মতলায়,” বলছিলেন স্বামী সর্বানন্দ অবধূত।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত রাঢ় বঙ্গের মেদিনীপুর, ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, হুগলী এবং বর্ধমান অঞ্চলে এখনও যে ধর্মঠাকুরের পুজো হয়, তার মধ্যে কিছু জায়গায় মূর্তি পুজোরও চল রয়েছে।

স্বামী সর্বানন্দ অবধূত বলছিলেন, “ধর্মঠাকুরের কোনও মূর্তি হয় না। মূর্তি পুজো তো শুরু হয়েছে মাত্র কয়েকশো বছর আগে থেকে। আদিম যুগ থেকে যেভাবে শিলাখণ্ডে ধর্মঠাকুর পূজিত হয়ে আসছেন, আমরা সেভাবেই পুজো করছি।“

ধর্মঠাকুর কি হিন্দু দেবতা?

সনাতন হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে ধর্মতলায় ধর্ম ঠাকুরের পুজো হলেও আদৌ ধর্ম ঠাকুর কি হিন্দু ধর্মের দেবতা? প্রশ্ন আছে এ নিয়েই।

তিনি আসলে কোন ধর্মের ঠাকুর, তা নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে হিন্দু, বৌদ্ধ আর অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে।

পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন বলছেন, “একটা সময়ে পুরো বাংলাতে বৌদ্ধ ধর্মই প্রচলিত ছিল। ডোম, বাউরি, তাঁতি, হাঁড়ি, দুলে, বাগদি ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষরা বজ্রযানী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তারা বুদ্ধদেব কে ধর্ম নিরঞ্জন হিসাবে পুজো করতেন।"

“বল্লাল সেনের আমলে সরাসরি বৌদ্ধদের ওপরে আক্রমণ শুরু হয়। প্রাণের ভয়ে মানুষ পালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। তাদের উপাস্য ‘ধম্ম’কে একই রেখে বহিরঙ্গের কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। বদলে যায় তাদের জীবনশৈলীও। এই বদলটাই হল ধর্মঠাকুর। ধর্ম নিরঞ্জনের মূর্তিটাও পাল্টিয়ে যায় বিভিন্ন জায়গায়,” বলছিলেন মি. উদ্দীপন।

ধর্ম ঠাকুরের পুজা অর্চনার রীতি বাঁচিয়ে রাখতে মধ্য যুগে ধর্মমঙ্গল কাব্য রচিত হয়। মঙ্গলকাব্যের তিনটি প্রধান শাখার অন্যতম এই ধর্মমঙ্গল কাব্য।

গবেষকরা বলছেন, রাঢ় বাংলার লোৗকিক দেবতা ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারই এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।

বৌদ্ধ দেবতার হিন্দুকরণের চেষ্টা?

কলকাতার সম্বোধি বুদ্ধ বিহারের পরিচালক ড. অরুণজ্যোতি ভিক্ষু বিবিসিকে বলছেন, “ধর্ম পুজো যে বৌদ্ধ সম্প্রদায়েরই, তার বহু প্রমাণ রাঢ় বাংলায় ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মকে মুছে দেওয়ার জন্য নানা পৌরাণিক কাহিনী বানিয়ে তাকে ধীরে ধীরে হিন্দু দেবতায় পরিণত করা হয়েছে।“

তার কথায়, “এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে শঙ্করাচার্যের সময় থেকে। বুদ্ধকে শ্রীকৃষ্ণের নবম অবতার রূপে দেখানো হয় তখন থেকেই। কিন্তু ভগবান বুদ্ধ তো একজন মানব সন্তান ছিলেন। এভাবেই দেখানো চেষ্টা হচ্ছে যে বৌদ্ধ ধর্ম আদতে হিন্দু ধর্মেরই অংশ।“

কলকাতায় শুক্রবার থেকে যে ধর্ম ঠাকুরের পুজো অনুষ্ঠিত শুরু হয়েছে, তার মূল উদ্যোক্তা স্বামী সর্বানন্দ অবধূত বলছেন, “বৌদ্ধ ধর্ম তো মাত্র আড়াই হাজার বছরের পুরণো, যেখানে সনাতন ধর্ম প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে চলে আসছে। মূল ধর্ম তো সনাতন ধর্মই।“

সনাতনীদের ধর্ম ঠাকুরের পুজোর আয়োজনকেও অরুণজ্যোতি ভিক্ষু তাদের ধর্মকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন।

পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন মনে করছেন, “যে ধর্ম ঠাকুরের পুজোর আয়োজন করা হয়েছে, সেটা আসলে বৌদ্ধ ধর্মের বৈদিকীকরণেরই চেষ্টা। এই পুজোয় শোনা যাচ্ছে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হবে, মহাযজ্ঞ হবে। অথচ ধর্ম ঠাকুরের পুজোয় বা বৌদ্ধ ধর্মের কোথাও যজ্ঞের রীতি নেই। বৈদিক মন্ত্রও সেখানে উচ্চারিত হয় না।“

লোকমুখে কেন আজও ধর্মতলা?

কলকাতার কেন্দ্রস্থল এসপ্ল্যানেড ব্রিটিশদের দেওয়া নাম। তবে ওই এলাকাটির আদি নাম ধর্মতলা, যা এখনও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। কী কারণে এলাকাটির নাম ধর্মতলা হল, তা নিয়ে শহরের ইতিহাসকারদের লেখায় খুব একটা দ্বিমত পাওয়া যায় না। সব লেখকই বলছেন এলাকার নামটি ধর্মাচরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে সেটা কোন ধর্ম, তা নিয়ে নানা মত আছে।

কেউ মনে করেন, আজকের এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে জেলে শ্রেণীর অন্ত্যজ মানুষরা ধর্ম ঠাকুরের পুজো করতের বলে এলাকার নাম ধর্মতলা, কেউ লিখছেন এই অঞ্চলে একটা শাহী মসজিদ ছিল, যেখানে বর্তমানে টিপু সুলতান মসজিদ আছে, আর সেটিকে কেন্দ্র করে মহরমের সময়ে মুসলমানদের একটা বড় সমাবেশ হত এখানে, বসত মেলাও, তা থেকেই ধর্মতলা নাম হয়েছে।

আবার কিছু লেখায় পাওয়া যায় এখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন ছিল এক সময়ে। এসপ্ল্যানেডের কাছেই জানবাজার অঞ্চলে একটা বৌদ্ধ মঠ ছিল, যাকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধদের সাড়ম্বর অনুষ্ঠান হত। তা থেকেই ধর্ম তলা নামটি এসেছে।

এই সব মতামতই লিপিবদ্ধ করেছেন প্রানতোষ ঘোষ, তার ‘হে নগর – হে মহানগর’ বইতে।

১৮৪১ সালে প্রকাশিত ‘বেঙ্গল অ্যান্ড আগ্রা অ্যানুয়াল গেজেটিয়ার’ থেকে উদ্ধৃত করে মি. ঘোষ তার বইতে লিখেছেন , কলকাতার পথঘাট ও বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানের যে বিবরণ আছে তার মধ্যে ৫১ নম্বর জানবাজার স্ট্রিটে ‘ধম্ম ঠাকুর’ এর উল্লেখ রয়েছে।

আবার নেপালের রাজদরবার থেকে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপ বলে পরিচিত চর্যাপদ খুঁজে এনেছিলেন যে ভারততত্ত্ববিদ পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, তিনিও ‘ডিসকভারি অফ লিভিং বুদ্ধিজিম ইন বেঙ্গল’ বইয়ের ২২ নম্বর পাতায় ওই একই জানবাজার এলাকাতেই ৪৫ নম্বর জানবাজার স্ট্রিটে ধর্ম ঠাকুরের মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছেন।

এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে যে ধর্ম ঠাকুরের পুজোর আয়োজন হয়েছে, তার উদ্যোক্তা স্বামী সর্বানন্দ অবধূতও বলছেন, “আজকের এসপ্ল্যানেড এলাকায় আসলে জেলে শ্রেণীর মানুষদের বসবাস ছিল। তারাই ধর্ম ঠাকুরের পুজো করত। জানবাজার এলাকায় আগে একটা ধর্ম ঠাকুরের মন্দিরও ছিল, এখনও সেখানে ধর্ম ঠাকুর পুজো হয়।“

বর্তমানের এসপ্ল্যানেড অঞ্চলের কাছাকাছি জেলেপাড়া এখনও বর্তমান।

ওই জেলেপাড়ার কাছেই ক্রিক রো আর ক্রিক লেন নামের রাস্তা রয়েছে, যেগুলি আদতে গঙ্গা থেকে প্রবাহিত খাল বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল। এই তথ্য উঠে আসে কয়েক বছর আগে মেট্রো রেলের একটি সুড়ঙ্গ কাটার সময়ে ভূমি ধ্বস হওয়ার সময়ে।

গবেষক বিনয় ঘোষ তার বই ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’তে ধর্মতলা নামের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে লিখেছেন যে বর্তমানের হুগলী জেলার আরামবাগ অঞ্চল থেকে অনেক মৎস্যজীবী আজকের ধর্মতলা অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং তারাই ধর্ম ঠাকুরের পুজোর প্রচলন করেন এখানে।

আরও এক ধর্মতলা আছে

ধর্ম ঠাকুরের পুজা এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে নতুন করে শুরু করা হলেও কলকাতায় ধর্মঠাকুরের বেশ কয়েকটি মন্দিরের খোঁজ পাওয়া যায়। সেগুলির বেশ কয়েকটি এসপ্ল্যানেড বা তার কাছাকাছি অঞ্চলে, তবে আরও একটি ধর্ম মন্দিরের খোঁজ পেয়েছি, যেটি দক্ষিণ পূর্ব কলকাতার কসবা অঞ্চলে।

শহরের প্রাণকেন্দ্র এসপ্ল্যানেডকে ধর্মতলা নামে সাধারণ মানুষ ডাকেন, কিন্তু কসবা অঞ্চলেও আর একটি ধর্মতলা আছে, রয়েছে ধর্মতলা রোডও।

কসবা অঞ্চলে ধর্ম ঠাকুরের মন্দিরটি ১৯০৫ সালে তৈরি, স্থানীয় জমিদার সাঁপুইদের জমিতে।

ধর্মতলা ধর্মমন্দির সমিতির প্রেসিডেন্ট রঞ্জিত সাঁপুই বলছিলেন, “বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে যে বড় করে উৎসব আর পুজো হয়, সেটাই আমাদের বাৎসরিক পুজো। এই পুজোর জন্য পুরোহিত আসেন মেদিনীপুর থেকে। তিনি ডোম শ্রেণীর মানুষ,” বলছিলেন মি. সাঁপুই।