আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে পোস্ট নিয়ে শোরগোল, এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের দাবি জামায়াতের
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে করা একটি পোস্ট নিয়ে তুমুল শোরগোলের মধ্যেই তিনি ও তার দল জানিয়েছেন যে, ওই অ্যাকাউন্টটি শনিবার বিকেলে কিছুক্ষণের জন্য হ্যাক হয়েছিল এবং সেই সময়ের মধ্যেই ওই পোস্টটি করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী বলছে, ওই পোস্টটি মি. রহমান বা তার অ্যাকাউন্টের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা করেননি বরং বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে পড়ার পর তারা মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যেই অ্যাকাউন্টটি হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছিলেন।
এই হ্যাকিংয়ের সাথে 'একটি বিশেষ দল ও তাদের সাইবার টিম জড়িত' বলে আজ রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
ওদিকে সারাদেশে ওই পোস্ট নিয়ে তুমুল সমালোচনার ৯ ঘণ্টা পর আইডি হ্যাকের দাবি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।
ওই পোস্টে কর্মজীবী নারীদের অবমাননা করা হয়েছে অভিযোগ করে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে অনেকের সমালোচনার মুখে পড়েছেন জামায়াতের আমীর।
ওদিকে আইডি হ্যাক করে বিতর্কিত পোস্ট দেওয়ার পর আবার আইডির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার যে দাবি জামায়াতে ইসলামী করেছে তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলছেন, এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে রিকভারি প্রক্রিয়া সাধারণত কয়েকটি টাইম স্লটে ভাগ করে এগোয় এবং প্রতিটি ধাপে আলাদা সময় লাগে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি আল–জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে নারী আসা সম্ভব নয় বলে আলোচনায় এসেছিলেন মি. রহমান।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
এক্স পোস্ট, জামায়াতের জিডি ও ব্যাখ্যা
'অ্যাকাউন্ট হ্যাকের পর শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্টে যে পোস্ট করা হয়েছে' বলে জামায়াত দাবি করছে, সেই পোস্টে বলা হয়েছিল, "নারীর প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা অনুশোচনামূলক নয়- এটা নীতিগত। আমরা মনে করি না- নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেন না"।
পোস্টে এর পরের অংশে লেখা হয়, "আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়, তখন এটি অন্য কিছু নয় বরং অন্য রূপে পতিতাবৃত্তির মতই"।
মুহূর্তের মধ্যেই এটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। পরে মধ্যরাতে জামায়াত ওই অ্যাকাউন্ট থেকে জানায় যে, মি. রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল।
শনিবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফায়েড পাতায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াত জানায়, "অত্যন্ত সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করে হামলাকারীরা সাময়িকভাবে আমিরে জামায়াতের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে দ্রুত পদক্ষেপ এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের সাইবার টিম অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সক্ষম হয়। ফলে অন্যান্য অ্যাকাউন্ট এবং প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে"।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট প্রকাশিত হয়, যেখানে আমিরে জামায়াতের নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি, উক্ত পোস্ট/কনটেন্ট আমিরে জামায়াতের কোনো বক্তব্য, মতামত বা অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর"।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, "সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমির ডা. শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল টুইটার (এক্স) হ্যান্ডেলসহ দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে"।
বিষয়টি নিয়ে শনিবার মধ্যরাতেই হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে জামায়াত। জিডিতে শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল হ্যাক করে নারী অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মি. রহমান ও দলের পক্ষে জিডিটি করেছেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম।
আজ রবিবার দুপুরে দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এতে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, তাদের দলের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে কে বা কারা হ্যাক করেছে।
"এগুলোর সাথে বিশেষ দল ও তাদের সাইবার টিমের কিছু লোক জড়িত রয়েছেন বলে আমরা মনে করছি। আমরা রাতেই থানায় জিডি করেছি। পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নিবো। এটি চরম বাড়াবাড়িমূলক কাজ। আমিরকে বিতর্কিত ও জামায়াতকে জনগণের সমানে হেয় করার অপপ্রয়াস এটি। গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই টুইটার হ্যাক করে তারা এসব করেছেন," বলেছেন তিনি।
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনে সাইবার অ্যাটাকের বিস্তারিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, "এই সাইবার অ্যাটাক মূলত শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে একটি ইমেইল থেকে। একটি সরকারি ইমেইল থেকে এসেছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একজন সরকারি কর্মকর্তার ইমেইল ব্যবহার করে এ সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। হতে পারে ওই কর্মকর্তাও ভিকটিম"।
ওদিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় শফিকুর রহমান বিবৃতি দিয়ে বলেছেন তাদের ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার হচ্ছে।
ওই বিবৃতিতে তিনি 'অসত্য ন্যারেটিভের পরিবর্তে তার রেকর্ড, নীতি ও ম্যানিফেস্টোর ভিত্তিতে তাকে বিচার করার' আহবান জানিয়েছেন।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
৪৫ মিনিটেই অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার !
জামায়াতের ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, শনিবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে তারা দেখতে পান যে ৪টা ৩৭ মিনিটে শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেলে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য সম্বলিত ওই বিতর্কিত লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে।
এর বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে ওই অ্যাকাউন্টে 'ক্যাম্পেইন টিম' এর পক্ষ থেকে 'ইম্পরট্যান্ট অ্যানাউন্সমেন্ট' শিরোনামে ইংরেজিতে একটি পোস্ট করা হয়।
পোস্টে ইংরেজিতে যা বলা হয়েছে তার বাংলা অর্থ এমন : "আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, সম্প্রতি আমিরে জামায়াতের অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছে এবং তার নামে মিথ্যা উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু পোস্ট করা হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমাদের বিরোধীরা যে কোনো কৌশল অবলম্বন করতে পারে, কিন্তু আমরা জনগণ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক প্রচারণার উপর মনোযোগ দিব"।
পাশাপাশি আজ সংবাদ সম্মেলনেও প্রায় একই কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সামাজিক মাধ্যমেই অনেকেই ৪৫ মিনিটের মধ্যে হ্যাক হওয়া এক্স অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিএনপির পক্ষ থেকেও এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেছেন, "সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে যে, নারী বিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে, রাত ১টার দিকে আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক?"
মি. আমিন বলেন, "কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হল দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায় এবং সবাই সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে। "এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
তিনি বলেন, ওই সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট হয়েছে, যার মধ্যে তারা এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাননি।
সাধারণত এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা পুনরুদ্ধারে কতটা সময় লাগে- এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলছেন, এক্স (Twitter) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে রিকভারি প্রক্রিয়া সাধারণত কয়েকটি টাইম স্লটে ভাগ করে এগোয়, এবং প্রতিটি ধাপে আলাদা সময় লাগে।
"প্রথম ০–২৪ ঘণ্টাতে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত হলে X অনেক সময় অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে লক করে এবং প্রাথমিক ভেরিফিকেশন শুরু করে। ২৪–৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহারকারীর পরিচয়, ইমেইল অ্যাক্সেস ও সিকিউরিটি তথ্য যাচাই হয়; সব ঠিক থাকলে অ্যাকাউন্ট ফেরত আসে।
যদি হ্যাকার ইমেইল, পাসওয়ার্ড ও 2FA পরিবর্তন করে থাকে, তাহলে ৩–৭ দিন সময় নিয়ে ম্যানুয়াল রিভিউ হয়। জটিল বা উচ্চ-ঝুঁকির কেসে, বিশেষ করে ভেরিফায়েড বা রাজনৈতিক অ্যাকাউন্ট হলে, পুরো প্রক্রিয়াটি ৭–১৪ দিন পর্যন্ত গড়াতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. জোহা।
তিনি সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করছেন।