আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সংশোধিত ব্যাংক আইন কতটা কমাতে পারবে এ খাতের অনিয়ম?
- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশে কোন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের তিন জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারবে না বলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের এক নতুন খসড়ায় বলা হয়েছে।
নতুন এ খসড়াটি মঙ্গলবার মন্ত্রীসভায় পাস হয়। তবে অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা একে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তারা মনে করছেন যে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের যে অভাব রয়েছে তা কাটাতে এই নতুন খসড়া খুব বেশি কাজে আসবে না।
বরং তারা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে এরই মধ্যে যে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না হলে এ খাতে আস্থাহীনতা দেখা দিতে পারে।
মঙ্গলবার মন্ত্রীসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০২৩ এর যে খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে সেখানে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সংশোধন রয়েছে।
“ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে লেনদেন এবং ব্যাংক কোম্পানীর পরিচালক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ঋণ প্রদান ও জামানত গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন জানান, এই আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে পরিচালনা পর্ষদে 'পরিবার-ভিত্তিক আধিপত্য' কমবে।
তিনি জানান, সবার ক্ষেত্রে সে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হোক বা আত্মীয় যেই হোক না কেন তাকে অবশ্যই জামানত, বন্ড বা সিকিউরিটি দিয়ে ঋণ নিতে হবে। এর বাইরে ঋণ দেয়া যাবে না।
ব্যাংক কোম্পানীর অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বা ফাউন্ডেশন যেন নিয়মিত ইন্সপেকশন বা তদন্ত করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই বিষয়টি নতুন খসড়া আইনে সংযোজন করা হয়েছে বলেও জানান মি. হোসেন।
‘পারিবারিক আধিপত্য’
বাংলাদেশের অন্তত ৯টি বেসরকারী ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে মাত্র দুটি ব্যবসায়ী পরিবার। এই নয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও বেশিরভাগ সদস্য এই পরিবার দুটি থেকেই এসেছেন।
এরমধ্যে একটি ব্যবসায়ী পরিবারের বিরুদ্ধে তাদের মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পাচারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে দুর্নীতি আর অনিয়মের চিত্র আসলে নতুন কিছু নয়। এ খাতে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠে যে বিষয়টি নিয়ে সেটি হচ্ছে অনাদায়ী বা খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন।
বাংলাদেশের একটি গবেষণা সংস্থা সিপিডি এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ অর্থবছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২৭.২৫ বিলিয়ন টাকা। আর ২০২৩ অর্থবছরে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৪৩.৯৬ বিলিয়ন টাকায়। অর্থাৎ দিন দিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও নানা সময়ে নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি কিছু ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনাদায়ী ঋণের একটি বড় কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই না করেই নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে বড় আকারে ঋণ অনুমোদন দেয়া।
যেকোন ব্যাংকে বড় আকারে ঋণের অনুমোদন আসে তার পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকেই। এখানে একই পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভিন্নতা থাকে না। একই সাথে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকা কর্মকর্তারাও বেতনভূক্ত হওয়ার কারণে তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে ভয় পান। ফলে সুযোগ তৈরি হয় জালিয়াতির।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিভিন্ন জায়গা (ব্যাংকের) পরিবারই কন্ট্রোল করে এবং ব্যবস্থাপনায় যারা ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টে থাকে তারাও এদের ভয় পায়। ”
আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা, অভ্যন্তরীণ ঋণ কমানো, এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাটা পরিচালক বোর্ডের মূল কাজ।
এখানে একই পরিবারের সদস্য বেশি হলে তখন নানা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
“বাংলাদেশে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকে পরিবারের লোকজন থাকে। যেখানে চেয়ারম্যান পদে থাকেন একজন এবং তিনি পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়েই পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেন,” বলেন মি. আহমদ।
এছাড়া একই পরিবারের মালিকানায় একাধিক ব্যাংক থাকলে এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার ঘটনাও বাংলাদেশে দেখা যায়।
সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এই ব্যাংকের পরিচালকরা আরেক ব্যাংকের ফেভার নেবে, সেই ব্যাংক আবার ফেভার নেবে, এক জন আরেক জনের ফেভার নেবে, সেটা এখানে হয়ে আসছে।”
কতটা কাজ দেবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকগুলো ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানী আইন অনুযায়ী চলছে। এর মধ্যে বেশ কয়েক বার এই আনের বিভিন্ন ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে।
বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্যদের পরিচালক পদে নিয়োগের বিষয়টিই অন্তত তিন বার পরিবর্তিত হয়েছে।
২০১৩ সালে এই আইনের সংশোধনের পর একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দুই জনের বেশি সদস্য পরিচালক থাকতে পারতেন না। তাদের মেয়াদ থাকতো ছয় বছর।
পরে ২০১৮ সালে এই আইনটি আবার সংশোধন করা হয়। সেখানে পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দুই জনের পদ বাড়িয়ে চার জন করা হয়। অর্থাৎ তখন একই পরিবারের চারজন সদস্য পরিচালক নিযুক্ত হতে পারতেন। আর তাদের মেয়াদও বাড়িয়ে টানা নয় বছর করা হয়।
সবশেষ চলতি বছর আবার এই আইনের যে খসড়া অনুমোদিত হলো সেখানে একই পরিবারের তিন জনের বেশি পরিচালকের পদে না থাকার বিধানের কথা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, একজন পরিচালক টানা নয় বছর একই পদে বহাল থাকার যে নিয়মটি করা হয়েছিল সেটা ছিল ‘আনফরচুনেট’ এবং ‘এই ধরণের সংশোধন করা মোটেও ঠিক হয়নি।’
তার মতে, বর্তমানে একই পরিবারের তিন জন পরিচালক থাকার সিদ্ধান্তটিও আসলে ঠিক হয়নি।
“এখন চারজন থেকে তিনজন - আমার মনে হয় এটা সঠিক হয়নি। আসলে দুইজনই থাকা উচিত ছিল। আর বলে দেয়া উচিত যে তিন বছরের বেশি কেউ থাকতে পারবে না (এক মেয়াদে)।”
একই ধরণের মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনও।
তিনি বলেন, “আমি তো মনে করি, দুজনের বেশি ছিল না, সেটাই সঠিক ছিল, এটা কমিয়ে কেন তিন জনের মাঝামাঝি জায়গায় নেয়া হলো সেটাই বুঝলাম না। এটা দুই জনেই ফেরত নেয়া উচিত ছিল।”
কোন ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্বে যখন একই পরিবারের কয়েক জন সদস্য থাকেন - তখন আসলে সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে কোন ভিন্ন মত থাকে না।
এ বিষয়টি মাথায় রেখেই আগে ব্যাংক আইনে এক পরিবার থেকে দুই জনের বেশি পরিচালক না থাকার কথা ছিল।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল একটি পক্ষপাতহীন সিদ্ধান্ত যাতে আসে সেটি নিশ্চিত করা। একই সাথে ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে গিয়ে যাতে আমানতকারীদের স্বার্থই প্রাধান্য পায় তা নিশ্চিত করা।
“মূল হচ্ছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য এটা ছিল,” বলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এখন যে বিভিন্ন ধরণের নিয়ম না মানার অভিযোগ উঠছে তার পেছনে এসব বিষয়ই কাজ করছে।"
"বাংলাদেশে যারা নিয়ম মানে না তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। যার কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকগুলো নানা ধরণের সমস্যার মুখে পড়ে" - বলেন মি. আহমদ।
“ব্যাংকের পারফর্মেন্স খারাপ হয়, ব্যাংকগুলো ঝুঁকিতে পড়ে, সবচেয়ে বড় মারাত্মক বিষয় হলো যারা আমানতকারী তাদের ব্যাংকের উপর আস্থা কমে যায়।”
আবার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে ওঠে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অন্য ব্যাংকগুলোও একই ধরণের কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ হয় বলেও মনে করেন তিনি।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখানে মূল ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে।