'ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট দরকার', জেলেনস্কির সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প

Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের এখন নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেলসংক্রান্ত চুক্তির সমালোচনা করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তারই জবাবে এই কথা বলেন ট্রাম্প।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ঘোষণা দিয়েছে।

জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, নতুন এই চুক্তির আওতায় রাশিয়ার লাখ লাখ টন ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হবে।

জেলেনস্কির মতে, এতে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ পাবে। তিনি এই চুক্তিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য 'উপহার' বলে মন্তব্য করেন।

তবে শনিবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প।

তিনি বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলার অনুমতি দিয়ে জেলেনস্কি 'বিশ্বের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চান'।

ট্রাম্প বলেন, "তার উচিত এসব বন্ধ করা।"

এরপর তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন নতুন নেতা দরকার, যিনি চুক্তি করতে পারেন।

২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি রয়েছে। এ কারণে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত আছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্বের মোট তেলজাত পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি সরবারহকারী দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন সম্প্রতি একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থায় হামলা জোরদার করেছে। এতে জ্বালানির বাজারে সংকট আরও বেড়েছে।

ট্রাম্প বলেন, "আমরা বলেছিলাম, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তোমরা যা খুশি করতে পারো, কিন্তু তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা কোরো না। এতে বিশ্বজুড়ে সমস্যা তৈরি হয়।"

ট্রাম্প বলেন, "তিনি অনেক চুক্তি করতে পারতেন। কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তা কখনোই করেন না।"

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে 'অসাধারণ ও ঐতিহাসিক' বলে বর্ণনা করেছেন।

তার মতে, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী।

শুক্রবার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, রাশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় আগামী ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা হবে।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়া নতুন অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা নতুন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে পারবে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।

জেলেনস্কি আরও অভিযোগ করেন, মস্কো এই সমঝোতাকে এমনভাবে দেখছে, যেন তারা নতুন অর্থায়ন পেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং শহরগুলোতে বোমা হামলা অব্যাহত রাখতে পারবে।

ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া শহরে নতুন করে প্রাণঘাতী হামলার পর তিনি এই মন্তব্য করেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শনিবার কয়েকটি মিত্র দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।

একই সঙ্গে ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে 'কার্যকর সিদ্ধান্ত' নেওয়ার আহ্বান জানান জেলেনস্কি।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের 'পূর্ণ সংহতি' প্রকাশ করেন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র জানান, জেলেনস্কি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম একমত হয়েছেন যে, রাশিয়ার অবিলম্বে 'জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ' করা উচিত। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাও বন্ধ করতে হবে।

মুখপাত্র বলেন, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ দ্রুত বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে ডিজেল রপ্তানি নিয়ে সমঝোতার খবরের সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও।

জেলেনস্কির বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হলে দেশটি যুদ্ধ চালানোর জন্য আরও অর্থ পাবে।

কাজা কালাস আরও বলেন, "রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর সময় এখন নয়। ইউরোপ সেই চাপ কমাবে না।"

কাজা কালাস বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার অনুমোদন করতে চান। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর এটিই হবে দেশটির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা।

এই রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্পের সর্বশেষ উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছেন তিনি।

এর আগে কয়েক মাস ধরে ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে হয়েছে তাঁকে।

ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কারণে পেট্রল, বিশেষ করে ডিজেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জ্বালানির বাড়তি দাম এবং এর প্রভাবে অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি কিনতে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে করে নিজের দেশের মানুষের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল সংস্থা এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ৬.২৮ ডলার।

গত মাসে এই দাম ছিল গড়ে ৫.৯৪ ডলার। আর গত বছর একই সময়ে দাম ছিল ৩.৬৮ ডলার।

চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বর মাসে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, এই দুই দফার পরে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা হবে আরও ৩০ লাখ টন। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, শেষ ধাপের এই সরবরাহ রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

গত ১০ মাসে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ায় দুই দফায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন আনুমানিক ৩০ শতাংশ কমেছে।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ইউক্রেনে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেনের ভোটারদের ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ থাকা উচিত।