যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কূটনৈতিক লড়াই বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলবে?

ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের একটি মন্তব্য এবং তার জবাবে চীনের তীব্র প্রতিক্রিয়া আপাতদৃষ্টিতে কূটনৈতিক বক্তব্য মনে হলেও বাস্তবে এটি বাংলাদেশের জন্যও এক ধরনের বার্তা বহন করছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার সামগ্রিক বৈরিতা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই একটা কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে, যার ছাপ দেখা গেলো বাংলাদেশেও।

বক্তব্যে কী ছিল?

ঢাকায় সদ্য নিয়োগ পাওয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত বুধবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বাড়তে থাকা প্রভাবের প্রসঙ্গ আসে। এনিয়ে গত অক্টোবরে মার্কিন সিনেটে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের শুনানিতে কথা বলেছিলেন মি. ক্রিস্টেনসেন।

আবারও তিনি সে একই বিষয় মনে করিয়ে দেন। "শুনানিতে আমি যেমনটা বলেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট" বলেছিলেন তিনি।

"আমি শুনানিতে যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমি আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব, সরকারে যারা থাকবেন, সেটা অন্তর্বর্তী সরকার হোক বা নতুন নির্বাচিত সরকার। যদি বাংলাদেশ সরকার সেই পথে যেতে চায়, তাহলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলো আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।" বেশ কিছু গণমাধ্যমে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এমনভাবেই প্রকাশ হয়েছে।

এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে চীনের দূতাবাস সরাসরি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, "বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এসব বক্তব্য সঠিক ও ভুলের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং এগুলো সম্পূর্ণভাবে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত"।

বিবৃতিতে এ-ও বলা হয়, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয় এবং এতে মার্কিন পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ বা নাক গলানোর সুযোগ নেই। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।

সামরিক কেনাকাটা ও উন্নয়ন খাত

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সেদিন সাংবাদিকদের সাথে আরও বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন, যার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রতিরক্ষা বিষয়ে অংশীদারিত্ব।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই অনেক দিক দিয়ে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত রয়েছে এবং সহযোগিতা করছে বলেন মি. ক্রিস্টেনসেন।

মি. ক্রিস্টেনসেন উল্লেখ করেন, অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য মিত্র দেশগুলো থেকে উপযুক্ত বিকল্প চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এটি বাংলাদেশি বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে আরও মানানসই বা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. এ এস এম আলী আশরাফ। কারণ বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই অস্ত্রের জন্য চীনের উপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে সামরিক কেনাকাটায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খুব কম উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী আশরাফ বলছেন "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে আরও বেশি সমরাস্ত্র কিংবা সামরিক প্রযুক্তি বিক্রি করতে চায়"।

অধ্যাপক আশরাফের মতে, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কানেক্টিভিটি বা সংযোগ বিবেচনায় যে দেশ চীনের সাথে বাণিজ্য এবং সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট দেশের জন্যও ঝুঁকি বলে আমেরিকা বিবেচনা করে।

তিনি আরও বলেন, যেখানে চীনকে মোকাবেলা করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি এজেন্ডা, সেখানে আমেরিকা চাইবে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংযোগ বাড়ুক। চীনের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে সম্পূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রেই যেখানে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চীনের সহযোগিতা। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে অথবা সার্বিক বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন অনেক বেশি বিনিয়োগ করছে।

সেসব বড় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য "যে পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন, এদিক দিয়ে চীনের কম্পেটিটর কোনো দেশ খুব একটা নেই। চীনের বিশাল অঙ্কের বাড়তি অর্থ রয়েছে, যেটা চীন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং সক্ষম" বলছেন অধ্যাপক আশরাফ।

তিনি মনে করেন, এদিক দিয়ে চীনের বিকল্প খুব একটা নেই এবং একারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এসব বিষয়ে ভারসাম্য রাখতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন কৌশলের দিকে যেতে হবে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার, উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাবশালী শক্তি। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের বড় অবকাঠামোয় বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদার। ফলে কাউকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।

চাপের কৌশল?

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন তা খুব একটা নতুন বিষয় নয়। সেখানে কোনো কঠিনভাবে বার্তা দেয়ার মতো ভাষাও ছিল না। তবে এর স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা রয়েছে।

কিন্তু সে হিসেবে চীনের প্রতিক্রিয়া বেশ কঠিন ছিল বলা যায়।

"আমরা তো জানিই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পরস্পরকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে" এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থান থেকে তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে, বলছেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির।

এক্ষেত্রে যে দেশের সাথে যেভাবে প্রয়োজন তেমনভাবে ভারসাম্য রেখেই বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশ কোনো চাপে পড়তে পারে কিনা- সে প্রশ্নে হুমায়ুন কবির বলেন, "খানিকটা চাপ তো পড়তেই পারে। এবং সেজায়গায়ই তো আমার কূটনীতির প্রয়োজনটা, তাদের অবস্থানগুলো বুঝার কাজটা"। সেটা যথার্থ পেশাদারিত্বের সাথে করতে পারলে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে যার সাথে কাজ করা প্রয়োজন সেটা করা সম্ভব।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত যেভাবে বলেছেন, সেটিকে ভালোভাবে দেখছেন না চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ।

"অন্য আরেকটা দেশকে তো টেনে আনার এভাবে কোনো দরকার নাই। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক, সহযোগিতা বাড়ানো, এগুলোর কথা বলতে পারে। কিন্তু অন্য দেশের সাথে সম্পর্কতে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হতে পারে বা বাংলাদেশকে সতর্ক করা। এগুলো তাদের অত্যন্ত হঠকারী এবং অর্বাচিন এক ধরনের আচরণ" বলছেন তিনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা, ট্যারিফ, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলছেন এসবে পুরো বিশ্ব ও আমেরিকার মানুষও এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে। "ওরা বললো এই কথা আর বাংলাদেশ আর চীনের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই"।

চীনের প্রতিক্রিয়াকেও মি. আহমদ যথার্থ হিসেবে দেখছেন যেহেতু তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেছেন।

আবার বাংলাদেশে যেখানে সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেদিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নির্বাচিত সরকারের জন্যও হতে পারে বলে ধারণা করছেন এ এস এম আলী আশরাফ।

"এটা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সে দলগুলোর জন্য এবং যারা সম্ভাব্য ক্ষমতায় আসবে তাদের জন্য একটা বার্তা যে ক্ষমতায় আসার পরে তারা কি চীনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চালিয়ে যাবে, নাকি মার্কিন চাপের কারণে কিছুটা পুনর্মুল্যায়ন করবে" বলছেন তিনি।

অবশ্য এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন কিছু নয় বলে মনে করছেন সব বিশ্লেষকই। তারা বলছেন, এটি আগে থেকেই চলে আসা বৈরিতার একটি অবস্থান। আর চীনের সাথে যত ধরনের নির্ভরশীলতার জায়গা রয়েছে, তা থেকে সরে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

বরং এখন যেভাবে ভারসাম্য রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনাকাটা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেভাবেই ভারসাম্য বজায় রাখা চলবে বলে মনে করেন অনেকে।

তবে যদি মি. ট্রাম্প চীনের সাথে সংযোগে নতুন কোনো ট্যারিফের হুমকি আরোপ করেন, সেটা গোটা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশেও ধাক্কা তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বৈরিতা যেমনটা দেখা গেল সেভাবে অন্তত আগামী তিন বছর চলতে থাকবে বলে মনে করেন মুন্সী ফয়েজ আহমদ। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে যেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মেয়াদের পরে একই পরিস্থিতি থাকবে বলে ধারণা করেন তিনি।

এছাড়া যেসব বক্তব্য এসেছে দুই দিক থেকে তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন না।

তবে বাংলাদেশকে সব দিকে ভারসাম্য রক্ষা করতে কূটনৈতিক পর্যায়ে যথেষ্ট বিচক্ষণতা দেখাতে হবে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।