দিল্লি বিস্ফোরণের আগে গ্রেফতার তিন চিকিৎসকের ব্যাপারে এখন যা জানা যাচ্ছে

ছবির উৎস, SAJJAD HUSSAIN/AFP via Getty Images
- Author, সৈয়দ মোজিজ ইমাম, মাজিদ জাহাঙ্গির
- Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, দিল্লি ও শ্রীনগর
দিল্লির লাল কেল্লার কাছে সোমবার সন্ধ্যার বিস্ফোরণের আগে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ হরিয়ানা আর উত্তরপ্রদেশ থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল। অন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এসময়।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন চিকিৎসক আছে। এই অভিযান নিয়ে ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার সত্যেন্দ্র কুমার গুপ্তা জানিয়েছেন, "গত ১৫ দিন ধরে যৌথ অপারেশন চলেছে, এখনো শেষ হয়নি অপারেশন"।
তবে এই পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতারের সঙ্গে দিল্লির বিস্ফোরণে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে পুলিশ কিছু জানায়নি।
দিল্লি বিস্ফোরণের দায়িত্ব এখন সন্ত্রাস দমন এজেন্সি এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Faisal Bashir/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
পুলিশের চলমান অভিযান
জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের অভিযান মঙ্গলবারেও চলেছে। পুলিশের একটি দল রাজধানী দিল্লি লাগোয়া ফরিদাবাদ থেকে গ্রেফতার অভিযুক্তদের কর্মক্ষেত্রে গিয়ে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
অন্যদিকে সাহারানপুর আর লক্ষ্ণৌতেও তল্লাশি অভিযান চলেছে।
ফরিদাবাদ পুলিশ বলছে, আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ফরিদাবাদের বেশ কয়েকটি এলাকা জুড়ে প্রায় ৮০০ পুলিশকর্মী তল্লাশি চালাচ্ছেন। তবে এখনো কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। আল-ফালাহ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তবে দিল্লির বিস্ফোরণের আগে, ১০ই নভেম্বরই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ দাবি করেছিল যে তারা সাতজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ এই দাবিও করেছিল যে ধৃতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত 'উগ্রপন্থি সংগঠন' জয়েশ-এ-মুহাম্মদ এবং আনসার গজবত-উল-হিন্দ-এর সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু এই ধৃতদের পরিবারগুলো এই গ্রেফতারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে ধৃত চিকিৎসক – ডা. আদিল, ডা. মুজম্মিল শাকিল এবং শাহীন সাঈদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, তা জানতে চেষ্টা করছে নিরাপত্তা এজেন্সিগুলো।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Kabir Jhangiani/NurPhoto via Getty Images
ডা. উমর নবির ওপরে সন্দেহ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভারতশাসিত দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা এলাকার বাসিন্দা চিকিৎসক উমর নবীকে দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন বলে মনে করা হচ্ছে–– এই কথা প্রচার হওয়ায় তার পরিবার অবাক হয়ে গেছে।
তারা বলছে, ডা. উমর নির্দোষ এবং বিগত কয়েক মাস তিনি নিজের কাজেই ব্যস্ত ছিলেন।
যে সাদা হুন্দাই আই টুয়েন্টি গাড়িটিতে বিস্ফোরণ হয়েছিল সেই গাড়িটি ৩৪ বছর বয়সী চিকিৎসক উমর নবি-ই চালাচ্ছিলেন বলে সন্দেহ করছে তদন্ত এজেন্সিগুলো। ওই গাড়িটি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে।
বিবিসি অবশ্য এসব দাবিগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করেনি।
তদন্তকারীরা বলছেন যে দিল্লির বিস্ফোরণে ব্যবহৃত গাড়িটির সঙ্গে হরিয়ানার ফরিদাবাদে ধৃত 'সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের' মধ্যে সম্ভবত নিবিড় যোগাযোগ ছিল।
ফরিদাবাদে আবার সম্প্রতি বড় পরিমাণে বিস্ফোরকও উদ্ধার করেছে পুলিশ। এখন দিল্লির বিস্ফোরণের সঙ্গে ওই উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে জয়েশ-এ-মুহাম্মদ এবং আনসার গজবৎ-উল-হিন্দের মতো কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে ডা. উমর নবি সম্ভবত জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গ্রেফতারির কথা স্বীকার করেনি।
ওদিকে, ডা. উমর নবীর ভাবী মুজম্মিলার বলছেন, গত শুক্রবার তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি এও বলছেন যে তার স্বামী, শাশুড়ি এবং দেবরকেও পুলিশ নিয়ে গেছে। পরে নবীর বাবাকেও আটক করা হয়েছে।

ছবির উৎস, arveen Kumar/Hindustan Times via Getty Images
উত্তর প্রদেশের সাহারাণপুরে গ্রেফতার
জম্মু-কাশ্মীরের পুলিশ দাবি করছে যে সাতই নভেম্বর উত্তর প্রদেশের সাহারাণপুর থেকে ডা. আদিল আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছে যে আধার কার্ড পাওয়া গেছে, তাতে অনন্তনাগের ঠিকানা লেখা আছে।
সাহারাণপুরের আম্বালা রোডে অবস্থিত ফেমাস হসপিটাল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
ডা. আদিলের ওপরে নিষিদ্ধ সংগঠন জয়েশ-এ-মুহাম্মদের পোস্টার লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। ডা. আদিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের অনন্তনাগের বাসিন্দা।
শ্রীনগর পুলিশ বলছে, তদন্তে নেমে তারা সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানতে পারে যে ডা. আদিল ওই পোস্টারগুলো লাগাচ্ছিলেন। ওই ফুটেজের ওপরে ভিত্তি করেই সাহারাণপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় ডা. আদিলকে।
পুলিশের দাবি, ডা. আদিল প্রায় তিন বছর ধরে সাহারাণপুরে বসবাস করছেন। মানকামাউ এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের পাশে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি।
এই সময়কালেই তিনি বি-ব্রোস এবং পরে ফেমাস মেডিকেয়ার নামে দুটি হাসপাতালে কাজ করেছেন। এর আগে তিনি অনন্তনাগের সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছেন।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ সাহারাণমপুরের হাসপাতালে গিয়ে ডা. আদিলের রেকর্ড খতিয়ে দেখেছে, অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছে। তদন্তে পুলিশ এটাও জানতে পারে যে আম্বালা রোডের এক্সিস ব্যাংকে ডা. আদিলের একটি অ্যাকাউন্ট আছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীরেই এ বছরের চৌঠা অক্টোবর ডা. আদিলের বিয়ে হয়। বিয়ের জন্য তিনি ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। কয়েকজন সহকর্মীকে বিয়ের কার্ডও দিয়েছিলেন তিনি।
পুলিশের হাতে তিনি গ্রেফতার হওয়ার পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার নেমপ্লেট সরিয়ে দিয়েছে।

ছবির উৎস, ARUN SANKAR/AFP via Getty Images
কী বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ?
ফেমাস মেডিকেয়ার হাসপাতালের ম্যানেজার মনোজ মিশ্র বলছেন, "২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে হাসপাতালের চিকিৎসক পদ খালি ছিল। মার্চ মাসে ডা. আদিল সেই পদে যোগ দেন। গ্রেফতার হওয়ার পরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে"।
স্থানীয় পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তারা কিছু বলতে রাজি নয়।
সাহারাণপুরের পুলিশ সুপার ভি বিন্দাল সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, "এই মামলাটি জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের, এক্ষেত্রে উত্তর প্রদেশ পুলিশ শুধু সহায়তা করছে"।
সাহারাণপুরে ডা. আদিল কাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন, সে ব্যাপারে খোঁজখবর করছে পুলিশ।
ফেমাস হাসপাতালের আগে তিনি যেখানে কাজ করতেন, সেই বি-ব্রোস হাসপাতালের প্রশাসক ডা. মমতা ভার্মা বলছেন, "এই হাসপাতালে ডা. আদির মাস চারেক কাজ করেছেন। তিনি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করতেন"।
এই হাসপাতালের চাকরি ছেড়েই ডা. আদিল ২৮শে ফেব্রুয়ারি ফেমাস হাসপাতালের কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
তার কয়েকজন সহকর্মী নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলছিলেন যে ডা. আদিল আহমেদ তাদের জানিয়েছিলেন যে তার এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে এবং তার হবু স্ত্রীও জম্মু-কাশ্মীরে চিকিৎসক।
তার সহকর্মী এক চিকিৎসক বলছিলেন যে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে তার গভীর জ্ঞান ছিল এবং এ নিয়ে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার আলোচনাও হয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না তাদের মধ্যে।

ছবির উৎস, Parveen Kumar/Hindustan Times via Getty Images
হরিয়ানা থেকে গ্রেফতার
উত্তর প্রদেশ ছাড়াও হরিয়ানার ধোজ অঞ্চলের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার সত্যেন্দ্র গুপ্তা জানিয়েছেন, "মুজাম্মিল শাকিল আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। এর কাছ থেকে একটি রাইফেল, একটি পিস্তল এবং বিস্ফোরণ ঘটানোর টাইমার পাওয়া গেছে"।
যৌথ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করার সময়ে ডা. শাকিলের কাছ থেকে আপত্তিজনক সামগ্রী পাওয়া গেছে বলে পুলিশ দাবি করছে। ডা. শাকিলকে ৩০শে অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ বলছে যে তদন্ত চালাতে গিয়ে তারা জানতে পেরেছে যে তার ভাড়া করা বাসায় বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা ছিল।
ডা. শাকিলের মা মিজ নাসিমা সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানিয়েছেন, "অন্য লোকের কাছ থেকে ওর গ্রেফতারের খবর পাই আমরা। আমরা দেখা করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ অনুমতি দেয়নি"।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. শাকিলের ভাই, পুলওয়ামার বাসিন্দা আজাদ শাকিল বলেছেন যে তার ভাইয়ের ওপরে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। গত তিন বছর ধরে তিনি দিল্লিতে ডাক্তারি করছেন।
তার কথায়, "ওর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। বছরে দুবার করে ও বাড়িতে আসত"।
এই চিকিৎসককে গ্রেফতার করার পরে ফরিদাবাদেরই নারী চিকিৎসক ডা. শাহীন সাঈদকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দাবি, শাহীন সাঈদের নামে নথিভুক্ত একটি গাড়ি পাওয়া গেছে, তাই শাহীনকেও আটক করা হয়েছে।
সত্যেন্দ্র গুপ্তার কথায়, "৩৬০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক আটক করা হয়েছে। কিন্তু এটা আরডিএক্স বিস্ফোরক নয়"।

ছবির উৎস, Deepak Gupta/Hindustan Times via Getty Images
লক্ষ্ণৌয়ের সঙ্গে কী যোগসূত্র?
ফরিদাবাদ থেকে আটক হওয়া শাহীন সাঈদের বাড়ি লক্ষ্ণৌতে। সেই বাড়িতেও মঙ্গলবার তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ।
তার বাবা সাঈদ আহমেদ আনসারি বলছিলেন, "আমার তিন সন্তান। শাহীন দ্বিতীয়। এমবিবিএস আর এমডি – দুটিই ইলাহাবাদ মেডিক্যাল কলেজ থেকে করেছে ও"।
"আমি বিশ্বাস করি না আপনি যে-সব কথা বলছেন… পুলিশ আমার সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করেনি," বলছিলেন মি. আনসারি।
শাহীন সাঈদের এক ভাইয়ের সাহারাণপুর আর লক্ষ্ণৌয়ের দুটি বাড়িতেও তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। মি. আনসারি বলছিলেন যে তার ছেলে ইন্টিগ্রাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ান।
তাদের এক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন যে শাহীন সাঈদ বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়িতে থাকেন না। খুব কম যাতায়াত করতেন তিনি।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
প্রথমে গ্রেফতারি, পরে বিস্ফোরণ
জম্মু-কাশ্মীরের পুলিশ দাবি করে যে তারা একটি নেটওয়ার্কের ব্যাপারে তদন্ত করছে। যৌথ অভিযানে তারা উত্তর প্রদেশ আর হরিয়ানা পুলিশের সহায়তায় নানা জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে।
তাদের দাবি, "দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি চলেছে, আবার গোয়েন্দা তথ্য জোগাড় করা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছে"।
তদন্তে তারা জানতে পেরেছে যে এই 'মডিউলটি' ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বাইরে সক্রিয় থেকে তাদের কথায় 'সন্ত্রাসবাদের প্রচার' চালাতে, যুবকদের উসকানি দিতে এবং 'সন্ত্রাসী কার্যকলাপের' সহায়তা জোগাড় করত।
পুলিশ আরও দাবি করেছে যে তল্লাশি অভিযান চলাকালীন কয়েকটি ডিজিটাল যন্ত্র, পোস্টার এবং বৈদ্যুতিক তথ্য জোগাড় করতে পেরেছে তারা।
এই মামলায় সন্ত্রাস দমন আইন ইউএপিএর বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।








