হংকংয়ে বহুতল ভবনে আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫ জন, এখনো নিখোঁজ শতাধিক

ছবির উৎস, Reuters
হংকংয়ের তাই পো ডিস্ট্রিক্টের সরকারি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে লাগা ভয়াবহ আগুনে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৫ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাতে মৃতের এই সংখ্যা জানায় হংকংয়ের ফায়ার ডিপার্টমেন্ট। প্রায় ৭৬ জন আহত হওয়ার তথ্যও জানায় তারা।
এছাড়া ভবনগুলোর প্রায় তিনশ' বাসিন্দা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলেও জানা গেছে।
এ ঘটনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শোক প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান সিসিটিভি।
একটি নির্মাণ কোম্পানির তিন জন কর্মকর্তাকে এই অগ্নিকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদের মধ্যে দুইজন পরিচালক এবং একজন ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্ট। তাদের বিরুদ্ধে ভবন নির্মানে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন উপকরণ, যেমন বাঁশ, পলিস্টাইরিন ফোম ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াং ফুক কোর্ট নামে ওই অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে গত ১৮ ঘণ্টা ধরে জ্বলা আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে এখন আটশো'র বেশি দমকল কর্মী কাজ করছেন।
তাইপো ডিস্ট্রিক্টের এই ওয়াং ফুক কোর্ট একটি আবাসিক কমপ্লেক্স। আটটি টাওয়ার ব্লক নিয়ে এই কমপ্লেক্স। প্রতিটি ভবন ৩১ তলা উঁচু।
২০২১ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, এই আবাসিক কমপ্লেক্সে প্রায় চার হাজার ৬০০ মানুষের জন্য এক হাজার ৯৮৪ টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।
১৯৮৩ সালে নির্মিত এই টাওয়ার ব্লকগুলোতে সংস্কার কাজ চলছিলো। ভবনগুলো বাইরে থেকে বাঁশের আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে রাখা ছিলো।
বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর দুইটা ৫১ মিনিটে এই কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে, বাঁশের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
হংকংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে এই আগুনকে লেভেল ফাইভ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দেশটির ফায়ার ডিপার্টমেন্ট।
সবশেষ ১৭ বছর আগে হংকংয়ে এমন ব্যাপক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাতভর জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল, সেসময় একজন শিশু ও একজন বয়ঃবৃদ্ধ নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আগুন নেভানোর সময় মারা যাওয়া ৩৭ বছর বয়সী একজন দমকল কর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে সরকার।
তাকে একজন "নিবেদিত প্রাণ এবং সাহসী" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সরকার।
স্থানীয় একজন কাউন্সিলর বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভবনের ভেতরে থাকা আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বাসিন্দারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য চেয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ওই স্থানের নিকটবর্তী স্কুলগুলোতে ক্লাশ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
হংকং শিক্ষা ব্যুরো জানিয়েছে, চলমান অগ্নি নির্বাপন কার্যক্রমের সময় যানজট সৃষ্টি হওয়ায় আজ ১৩টি স্কুলে ক্লাশ বন্ধ থাকবে।
একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, আহত শিক্ষার্থীদের যথাযথ সহায়তা করার জন্য নিকটবর্তী আশ্রয় কেন্দ্রে শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞানীদের পাঠানো হয়েছে।
আগুন লাগার কারণ নিয়ে এখনো তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, ওই স্থানে সংস্কার কাজ চলছে, সেখানে পলিস্টাইরিন বোর্ড পাওয়া গেছে। যেগুলো সাইটের জানালা বন্ধ করে রেখেছিল, সম্ভবত সে কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

ছবির উৎস, BBC/Koey Lee
ভবনগুলোর বাইরে জাল এবং প্রতিরক্ষামূলক উপাদান পাওয়া গেছে, যা অগ্নি নির্বাপক বলে মনে হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, " আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, যারা কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন তাদের বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। যার ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।"
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাঁশের পাতলা চাটাই ধরনের আচ্ছাদনের কারণে আগুন দ্রুত পাশের ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকটি টাওয়ার ব্লক থেকে এখনো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। কিন্তু আটটি ভবনের মধ্যে চারটিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুরো দিন লেগে যাবে বলে মনে করছে ফায়ার ডিপার্টমেন্ট।
অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ারগুলোর শত শত বাসিন্দাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং স্থানান্তরের প্রয়োজন এমন মানুষদের জন্য জরুরি আবাসন ইউনিট বরাদ্দ করা হচ্ছে।
হংকংয়ের গৃহায়ন মিনিস্টার তাইপোতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
উইনি হো জানিয়েছেন, পুনর্বাসনের জন্য হংকং আইল্যান্ড, কাউলুন এবং নতুন এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে ১৪০০ ইউনিট চিহ্নিত করেছে হাউজিং টাস্কফোর্স।
এগুলোর মধ্যে ২৮০ টি তাইপোতেই অবস্থিত।
মিজ হো বলেছেন, শান লিউতে একটি ট্রানজিশনাল হাউজিং প্রজেক্টে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ জন বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
একইসাথে, প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সহায়তা করার জন্য হাউজিং ডিপার্টমেন্ট সরকারি অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাথেও সমন্বয় করেছিল।
আগুন লাগার পর প্রথম রিপোর্ট করার ৪০ মিনিটের মধ্যেই তীব্রতার দিক থেকে এই আগুনকে লেভেল ফোর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টা বাইশ মিনিটে, আগুনের তীব্রতার কারণে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর এই লেভেল আবার বাড়ানো হয়।
হংকং এ লেভেল ফাইভের মতো এরকম ভয়াবহ আগুন লাগার ১৭ বছর হয়ে গেছে।
এর আগে, স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে এবং অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রগুলো ভবনের এতো উচ্চতায় সহজে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এক বিবৃতিতে সিকিউরিটি সেক্রেটারি বা নিরাপত্তা সচিব তাং পিং কেউং জানিয়েছে, আগুনের ঘটনাগুলোর খোঁজখবর রাখা বা প্রভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি জরুরি মনিটরিং এবং সাপোর্ট সেন্টার চালু করা হয়েছে।
হতাহতের বিষয়ে জানতে জনসাধারণের জন্য পুলিশ একটি হটলাইন নম্বরও চালু করেছে।
আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে হংকং পুলিশ এবং ফায়ার ডিপার্টমেন্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন চিফ এক্সিকিউটিভ বা প্রধান নির্বাহী জন লি।
ভবনের অগ্নি প্রতিরোধক সুরক্ষা উপাদাগুলো প্রয়োজনীয় মান পূরণ করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ভবন কর্তৃপক্ষ এবং দেশটির আবাসন কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা শুরু করেছে।
লি বলেন, ভবন এবং এর চারপাশের উপকরণগুলো যথাযথভাবে নিয়ম অনুসরণ করে ব্যবহার হচ্ছে কি না সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে।
নিরাপত্তা সচিব ক্রিস ট্যাং বলেছেন, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া 'অস্বাভাবিক' ছিল। যদি উপকরণ এবং বাঁশের যে মাচা দেওয়া হয়েছে সেগুলো যথাযথ হতো, তাহলে আগুন দ্রুত ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়তো না।








