কোটি টাকার বিটকয়েন ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে পুলিশ

বিটকয়েনের প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিটকয়েনের প্রতীকী ছবি

চট্টগ্রামে এক ফ্রিল্যান্সারের কাছ থেকে বিটকয়েনের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের সাত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

আবু বকর সিদ্দিক নামের ঐ ব্যক্তি বিবিসি বাংলার কাছে অভিযোগ করেন, “গত ২৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে তাকে আটকের পর প্রথমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লাখ টাকা তারা আদায় করে। পরবর্তীতে অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েনের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।”

তিনি বলেন, “পুলিশ আমার কাছ থেকে এতগুলো টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আবার আমাকেই মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।”

তবে পুলিশের দাবি, বিটকয়েনের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি এখনো তাদের কাছে স্পষ্ট না। এভাবে টাকা নেয়া সম্ভব কি না সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ডিবি- উত্তর/দক্ষিণ) সাদিরা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তাদের পুরো টিমটাকে আমরা আপতত ক্লোজ করে রেখেছি। যার দোষ আছে সে রক্ষা পাবে না”।

এই প্রক্রিয়ায় টাকা হাতিয়ে নেয়া সম্ভব কি না পুলিশের তরফ থেকে এমন প্রশ্ন উঠলেও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারো কাছে পাসওয়ার্ড বা মোবাইলের এক্সেস থাকলে সহজেই টাকা আত্মসাৎ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ঐ ব্যক্তির ওয়ালেট সম্ভবত তার মোবাইলে ছিল। পুলিশ যদি তার মোবাইলের পাসওয়ার্ড পেয়ে যায় তাহলে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে এই মানি ট্রান্সফার সম্ভব।”

চট্টগ্রামের ফ্রিল্যান্সার আবু বকর সিদ্দিক
ছবির ক্যাপশান, চট্টগ্রামের ফ্রিল্যান্সার আবু বকর সিদ্দিক

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

আবু বকর সিদ্দিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী গুলবাগ আবাসিক এলাকার একটি দোকানে চা খাচ্ছিলেন তিনি। তখন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল তাকে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, মনসুরাবাদ গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সেখানে ডিবি পুলিশের পরিদর্শক রুহুল আমিন ও পুলিশের অন্য সদস্যরা মানি লন্ডারিং ও সাইবার ক্রাইমের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছে দশ লাখ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আমি তখন তাকে বললাম আমি তো ফ্রিল্যান্সিং করি ১৪ বছর ধরে। কেন আমাকে মামলা দিবেন? উনি আমার কথা শুনলো না। আমার মোবাইল নিয়ে নেয়। আমার ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয় মোবাইল থেকে।”

তিনি জানান, ওই পুলিশ সদস্যরা ভয় দেখানোর পর তিনি তখন দশ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। পরবর্তীতে তিনি পুলিশের দেয়া দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ করে দশ লাখ টাকা অনলাইন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ট্রান্সফার করেন।

মি. সিদ্দিক বলেন, “ওনাদের টাকা দেয়ার পর আমাকে নন এফআইআর মামলা দিয়ে চিটাগাং কোর্টে চালান করা হয়। সেখানে ১০০ টাকা জরিমানা দিয়ে জামিন পাই আমি।”

তিনি জানান, কোর্টের মাধ্যমে বাড়িতে ফিরলেও পুলিশ তার মোবাইল ফোনটি রেখে দেয়। পরদিন নতুন একটি মোবাইল কিনে বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট ওপেন করেন। সেখানে তিনি তার অ্যাকাউন্টে ঢুকে দেখেন তার মোবাইল থেকে দুই লাখ ৭২ হাজার ডলার ট্রান্সফার করা হয়েছে।

এই টাকার পরিমাণ বাংলাদেশের টাকায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। এরপরই তিনি বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন মি. সিদ্দিক।

চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা সাদিরা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গণমাধ্যমে তার এই অভিযোগ দেখার পর আমরা একটু অবাক হলাম। পরে আমরা অনুসন্ধান করে দেখলাম, অনলাইন জুয়া খেলার একটা গ্রুপ এই বিটকয়েনটা তার ওয়ালেট থেকে আরেকজনের ওয়ালেটে নিয়ে যায়। পরে ওই ওয়ালেট থেকে আবার আরেকজনের ওয়ালেটে নিয়ে গেছে।”

আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলার কপি
ছবির ক্যাপশান, আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলার কপি

সাত গোয়েন্দা পুলিশ প্রত্যাহার

ভুক্তভোগী আবু বকর সিদ্দিকের অভিযোগের পর প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মি. সিদ্দিককে গ্রেফতারের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবি কর্মকর্তা রুহুল আমীনসহ ঐ অভিযানের সাথে জড়িত সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে নানা আলোচনার পর একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ডিবি- উত্তর/দক্ষিণ) সাদিরা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যেহেতু পুলিশের কথা বিভিন্ন মিডিয়ায় আসছে আমরা প্রাথমিকভাবে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে। এটা আমাদের ইন্টারনাল ব্যাপার। ডিসিপ্লিনের জন্য আমরা যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারি। আমরা তাদের ক্লোজ করেছি।”

তিনি বলেন, “যেহেতু অভিযোগটা একটা টিমের বিরুদ্ধে বা অপারেশনের বিরুদ্ধে আছে। সে কারণে আমাদের এই ব্যবস্থা। তবে তার মানে এই না যে, তারা অপরাধী বলে তাদের ক্লোজ করেছি। তাদের তদন্তের স্বার্থে ক্লোজ করা হয়েছে”।

সোমবার বিবিসি বাংলার কাছে আবু বকর সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, “পুলিশের ভয়ে আমি আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। জানি না এই অবস্থা থেকে কবে মুক্তি পাবো”।

বিশ্বে বিটকয়েনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে
ছবির ক্যাপশান, বিশ্বে বিটকয়েনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে

ক্রিপ্টোকারেন্সি কেন অবৈধ?

ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা। এটি শুধুমাত্র ইন্টারনেটেই ব্যবহার হয়ে থাকে। সারা বিশ্বে অনেক ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো বিটকয়েন।

বাংলাদেশে অনলাইনে সীমিত আকারে এই বিটকয়েন কেনাবেচা ও এর মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিটকয়েন ব্যবহারের কোনো অনুমতি এখনো দেয়নি। সে কারণে এই লেনদেনকে অবৈধ বিবেচনা করা হয় বাংলাদেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক বি এম মঈনুল হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “দ্রুত কারেন্সি ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে বিটকয়েন ব্যবহার হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় মিডেল ম্যানকে কোনো টাকাও দিতে হয় না। সামান্য প্লাটফর্ম চার্জ হয়। যে সমস্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে তার মধ্যে বিটকয়েন খুব পপুলার। দামও অনেক বেশি এই মুহূর্তে”।

“এই কয়েন ব্যবহার করে অর্থের লেনদেন করার ক্ষেত্রে কারা আদান প্রদান করছে তা সহজে শনাক্ত করা যায় না। ফলে অপরাধমূলক কাজের ক্ষেত্রে বিটকয়েনের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে,” যোগ করেন মি. হোসেন।

পুলিশ বলছে, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট বা বৈদেশিক মুদ্রানীতি আইন ১৯৪৭ অনুযায়ী এটি বাংলাদেশে অবৈধ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা সাদিরা খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ঐ ব্যক্তি নিজেকে ফ্রিল্যান্সার দাবি করলেও তিনি অনলাইনে জুয়ার সাথে জড়িত ছিলেন। তাই তার বিরুদ্ধে ১৯৪৭র ২৩ এর ১ ধারা অনুযায়ী মামলা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তার বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত করবে ডিবি। এই ব্যাপারে যারা টেকনিক্যাল দিক ভালো বুঝেন তারা কাজ করবেন। যদি আমরা দেখি আবু বকর সিদ্দিক মানি লন্ডারিংয়ের সাথেও জড়িত তাহলে তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিতে চলে যাবে”।

আবু বকরের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলার পর তিনি হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন।

সোমবার তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনছি। অথচ আমাদের বলা হচ্ছে আমরা নাকি মানি লন্ডারিং করছি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই। আমি বাঁচতে চাই। আমাকে আপনারা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেন।”

তবে পুলিশ বলছে পুরো ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত তারাও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না যে অনলাইনের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার সাথে পুলিশ জড়িত কি না।