বিএনপির 'এক দফা' কেন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বদলে সরকারের পদত্যাগ

ছবির উৎস, Babul Talukder
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বিরোধী দল বিএনপি গত কয়েক বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসলেও এবার তারা সরকারের পদত্যাগকেই তাদের চূড়ান্ত বা এক দফা দাবি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বিএনপিসহ তাদের সমমনা দল ও জোটগুলো বুধবার একযোগে যে ‘এক দফা দাবি’ আদায়ের কর্মসূচির ঘোষণা করেছে সেখানে এক দফা হিসেবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের কথাই তারা উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ এখন থেকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো আলাদাভাবে কিন্তু একই দিনে একই কর্মসূচি পালন করবে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে।
বুধবারের সমাবেশে এক দফা দাবি কি সেটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী বর্তমান কর্তৃত্ববাদী অবৈধ সরকারের পদত্যাগ-এটাই এক দফা, এক দাবি”।
কিন্তু কেন বিএনপি এবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বদলে সরকারের পদত্যাগে বেশি গুরুত্ব দিল কিংবা দলটি কি তাদের মূল দাবি কিছুটা পরিবর্তন করল কি-না এসব প্রশ্নও উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Babul Talukder
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে এ বার্তা?
বিএনপি নেতারা বলছেন যে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে দলের লক্ষ্য আরও পরিষ্কার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও দলের অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে যাতে করে তারাও বুঝতে পারে যে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে অন্য কোনো ফর্মুলাতেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।
“আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনাররা এখন বাংলাদেশ সফর করছেন। তাদেরকে একটি বার্তা আমরা দিয়েছি যে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে আমরা যাবো না। আমরা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন করবো। কোনো ভাবেই আমরা আমাদের মূল দাবি থেকে সরে যাইনি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
অবশ্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের জল্পনা কল্পনাও রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। অনেকে মনে করেন বিদেশীদের মধ্যস্থতায় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা পেলেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি, সরকারে যেই থাকুক না কেন।
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলছেন তারা এটিও নেতাকর্মীদের কাছে পরিষ্কার করতে চেয়েছেন যে ‘আগে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, তারপর নির্বাচন হবে’।
“মাঠে ময়দানে সবার কাছে আমরা পরিষ্কার বার্তা দিয়েছি। তাই দেশের মানুষের কাছে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে আমাদের অবস্থান নিয়ে আর দ্বিধা নেই বলেই আমরা মনে করি,” বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আবার বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও বুধবারের সমাবেশে বলেছেন ২০১৪ ও ২০১৮ সালের পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই নির্বাচন তারা আর হতে দেবেন না।
দলের নেতারা বলছেন দেশে সফররত বিদেশী প্রতিনিধি দলসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তারা বোঝাতে চাইছেন যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে "সরকারের ক্ষমতায় থাকাটাই" বড় অন্তরায় হয়ে উঠবে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি আজরা জেয়া চার দিনের সফরে এখন বাংলাদেশে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে তার বৈঠকে সামনের নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
পাশাপাশি ঢাকায় এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬ সদস্যের নির্বাচনী অনুসন্ধানী মিশন । দুই সপ্তাহের সফরে, ইইউ প্রতিনিধি দলটির সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো, নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার কর্মসূচি রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণার পর থেকেই মূলত সরকারের পদত্যাগের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে বিএনপি।
এই নীতির আওতায় যে কোন বাংলাদেশি ব্যক্তি যদি সেদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া ব্যাহত করার জন্য দায়ী হন বা এরকম চেষ্টা করেছেন বলে প্রতীয়মান হয় - তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দেয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনি ব্লিংকেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক বিবৃতি অনুযায়ী নতুন এ নীতির আওতায় পড়বেন বর্তমান এবং সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা, সরকার-সমর্থক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যবৃন্দ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারবিভাগ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সদস্যরা।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
১০ দফা থেকে এক দফা
বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিলো বিএনপি এবং সেবারের নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতার পর আন্দোলনের ক্ষেত্রেও অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলো দলটি।
পরে ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যায় বিএনপি এবং নির্বাচনে মাত্র সাতটি আসনে জয়ের পর ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করে এ সরকারের অধীনে আর নির্বাচন না করার ঘোষণা দেয়।
এরপর থেকে ধীরে ধীরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখে দল গোছানো ও জনমত তৈরির কাজে নামার চেষ্টা করে দলটি।
কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যাপক বাধার মুখে পড়ে দলটি।
এসব সত্ত্বেও গত বছরের শেষার্ধে এসে বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ সফল করে নতুন করে আলোচনায় আসে বিএনপি। যদিও তখন ঢাকার সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয় ও দলের মহাসচিবসহ অনেক নেতাকর্মী আটক হন।
এর মধ্যেই দশই ডিসেম্বরে ঢাকার সমাবেশ থেকে সংসদ বিলুপ্ত করে সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন বাতিল করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনসহ দশ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছিলো।
ঢাকার ওই সমাবেশ থেকেই বিএনপি এমপিদের সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা নিয়ে ‘নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করে বর্তমান সরকার বিরোধী অলআউট মুভমেন্টে’র কথা বলা হয়েছিলো।
তবে বুধবারের সমাবেশে এসে দলটি সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিকে সামনে নিয়ে এসে সমমনাদের নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে।
দলটির মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় নেতা জহির উদ্দিন স্বপন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে দল ও দলের বাইরে রাজনৈতিক দাবি বা দলের অবস্থান নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা যেন না থাকে সেজন্যই সরকারের পদত্যাগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
“সরকার পদত্যাগ করলেই তো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার অনিবার্যভাবে আসবে। আর তাদের পদত্যাগ আমরা এখনি চাই। সেজন্যই পদত্যাগের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ নিয়ে কোনো ভুল বুঝাবুঝি যেন না থাকে সেজন্যই আমরা পরিষ্কার করে বলেছি যে আগে সরকারের পদত্যাগ চাই,” বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন।








