বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণর বিরুদ্ধে কথা বলে শাস্তি পেলেন ইস্কনের সাধু

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
ভারতে সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশ জনপ্রিয় ইস্কনের সদস্য একজন হিন্দু সাধু তাঁর বক্তৃতায় স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে সংগঠনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও তাঁর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অমোঘ লীলা দাস নামে ৪৩ বছর বয়সী ওই সাধু এর আগে ভক্তদের সামনে তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দ যেহেতু মাছ খেতেন, তাই তিনি একজন ‘দিব্য পুরুষ’ হতেই পারেন না।
রামকৃষ্ণ পরমহংসের বিখ্যাত উক্তি ‘যত মত তত পথ’-কেও কটাক্ষ করে ওই সাধু দাবি করেন, যে কোনও পথ ধরে এগোলেই একই গন্তব্যে পৌঁছনো যাবে এটাও একেবারে বাজে কথা।
ইউটিউব ও ফেসবুকে তাঁর ওইসব কথাবার্তার ক্লিপ ভাইরাল হয়ে উঠতেই দেশজুড়ে জড়িয়ে থাকা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দর লক্ষ লক্ষ অনুগামী ও শিষ্য তীব্র আপত্তি জানাতে শুরু করেন। ইস্কন কর্তৃপক্ষের কাছেও তারা লিখিত প্রতিবাদ জানান।
এরপরই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ ওই বিতর্কিত ভাষণের ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করে টুইট করেন, “এই অপব্যাখ্যা ও অসভ্যতা যিনি করছেন ও যে সংগঠনের মঞ্চে হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানাই।”

ছবির উৎস, Amogh Lila Das/Twitter
বিতর্কে রাজনৈতিক মাত্রা যোগ হওয়ার পর ইস্কন কর্তৃপক্ষ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওই অভিযুক্ত সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করে।
মঙ্গলবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় কলকাতায় ইস্কনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট রাধারমণ দাসের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে জানানো হয়, অভিযুক্ত ওই সন্ন্যাসীকে তারা এক মাসের জন্য ‘ব্যান’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
ইস্কন আরও ঘোষণা করে, অমোঘ লীলা দাস ইতিমধ্যেই তাঁর ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। আগামী এক মাস তিনি পাহাড়ে গিয়ে নির্জনে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করবেন এবং বাকি জগতের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবেন না বলেও জানানো হয়।
ভারতে আধ্যাত্মিক জগতের একজন গুরু বা ধর্মীয় নেতাকে ঘিরে এই ধরনের বিতর্ক নজিরবিহীন বলা চলে।
সোশ্যাল মিডিয়াতে কেউ কেউ বলছেন, ভারতে ধর্মমূলক আলোচনা বা ডিসকোর্সের ক্ষেত্রেও যে কোনও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ নেই এই ঘটনায় সেটাই প্রমাণ হল।

ছবির উৎস, Getty Images
পাশাপাশি অনেকেই আবার মনে করছেন, যে ভাষা ও ভঙ্গীতে তিনি রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দর মতো পূজনীয় ব্যক্তিদের আক্রমণ করেছেন, তাতে তাঁর আরও অনেক কঠোর শাস্তি প্রাপ্য ছিল।
ধর্মগুরুরা মাছ খেতে পারেন না?
ইউটিউবে ইস্কনের ওই সাধুর দেওয়া সাম্প্রতিক এক লাইভ বক্তৃতায় স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, “কোনও দিব্য পুরুষ কি জানোয়ার মেরে খাবেন? তিনি কি মাছ খাবেন? মাছকেও তো মারলে তার যন্ত্রণা হয়, না কি?”
“আর বিবেকানন্দ যদি মাছ খেতেন, তাহলে তো প্রশ্ন উঠবেই একজন সিদ্ধ পুরুষ কি আদৌ মাছ খেতে পারেন? তার তো হৃদয়ে করুণা থাকা উচিত।”
বস্তুত বাঙালিরা যে মাছ খান, বাকি দেশে অনেকেই – বিশেষ করে নিরামিষাশীরা সেটাকে খুব ভাল চোখে দেখেন না। ভারতের হিন্দি বলয়ে ‘মছলি-খাতা’ বা মৎস্যভোজী বলেও বাঙালিকে হেয় করার চল রয়েছে।
এই পটভূমিতেই বাঙালির একজন প্রিয় নায়কের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ব্যঙ্গ করে অমোঘ লীলা দাস আসলে বাঙালির সংস্কৃতিকেই চরম অপমান করছেন বলে বিবেকানন্দর ভক্তরা মনে করছেন।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post, 1
ইস্কন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবাদপত্রে তারা লিখেছেন, “খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে একজন ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাসের কোনও সম্পর্ক নেই। একজন ব্যক্তি নিরামিষ খেয়েও যদি অসৎ জীবন যাপন করেন, তাহলে তার অর্থ কী?”
মাছের প্রাণ আছে বলে মাছ খাওয়া যদি অনুচিত হয়, তাহলে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে বলে সব শাকপাতা-ফলমূল খাওয়াও ছেড়ে দেওয়া দরকার – ওই চিঠিতে এমনও যুক্তি দিয়েছেন তাঁরা।
অমোঘ লীলা দাস তাঁর বক্তৃতায় বিবেকানন্দের আর একটি বাণী – ‘গীতাপাঠ করার চেয়ে ফুটবল খেলাও ভাল’ – সেটিরও তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি মন্তব্য করেন, “ভাগবত গীতার চেয়েও ফুটবল খেলা শ্রেষ্ঠ, এমন কথা যদি কেউ বলেন তিনি কি ঠিক বলছেন? না, বলছেন না!”
ওই একই বক্তৃতার অন্য একটি অংশে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসর একটি বিখ্যাত উক্তি নিয়েও বিস্তর কাটাছেঁড়া করেন। সেটি হল, ‘যত মত তত পথ’ – ধর্মীয় সাধনার অনেক রাস্তা দিয়ে গিয়েই শেষে ঈশ্বর লাভ সম্ভব, এ কথা বোঝাতেই যে উক্তি করা হয়েছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
সেই প্রসঙ্গে ইস্কনের ওই সাধু বলেন, “এখন আমি যদি অস্ট্রেলিয়া যাব বলে বেরিয়ে ‘যত মত তত পথ’ শুনে যে কোনও রাস্তা ধরি, তাহলে তো আমি অ্যান্টার্কটিকা পৌঁছে যাব!”
“কিংবা ধরুন গঙ্গা নদীর ডাইনে-বাঁয়ে-ওপরে-নিচে যে কোনও দিকে গেলেই মায়াপুর পৌঁছে যাব – এরকম আবার হয় না কি?”
অমোঘ লীলা দাসের বক্তব্যের এই অংশটুকু টুইট করে কলকাতার সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ কুন্ডু টু্ইট করেছেন, রামকৃষ্ণ আজ বেঁচে থাকলে এই অপব্যাখ্যা শুনে বলতেন : “বাছা, তোর চৈতন্য হোক!”
কে এই অমোঘ লীলা দাস?
ইস্কনের যে সাধু এখন এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে, সেই অমোঘ লীলা দাস নিজের টুইটার বায়ো-তে একজন ‘লাইফস্টাইল কোচ, মোটিভেশনাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও স্পিরিচুয়াল অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন।
৪৩ বছর বয়সী এই সাধু গত এক যুগ ধরে ইস্কনের (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস) সঙ্গে যুক্ত। গতকাল পর্যন্তও তিনি দিল্লিতে ইস্কনের দ্বারকা শাখার ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন।
এর আগে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, লখনৌর একটি পাঞ্জাবি পরিবারে তাঁর জন্ম এবং তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল আশিস অরোরা।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post, 2
দিল্লি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে স্নাতক ডিগ্রি পেয়ে তিনি মার্কিন একটি বহুজাতিক কর্পোরেশনে চাকরিতেও ঢুকেছিলেন।
কিন্তু বছরকয়েক চাকরি করার পরই কর্পোরেট দুনিয়া ছেড়ে মাত্র ২৯ বছর বয়সে একজন ব্রহ্মচারী হিসেবে তিনি ইস্কনে যোগ দেন।
বিগত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়াতে তাঁর লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার তৈরি হয়েছে, ইউটিউব বা ফেসবুকে দেওয়া তাঁর অজস্র ধর্মীয় বা অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও ভাইরালও হয়েছে।
কিন্তু এখন স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণকে আক্রমণের নিশানা করেই তিনি চরম বিপদে পড়েছেন।
ইস্কন কর্তৃপক্ষও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, বিবেকানন্দ বা রামকৃষ্ণকে নিয়ে অমোঘ লীলা দাস যা যা বলেছেন তারা তার একটি কথাও সমর্থন করেন না।








