ভারতে পেঁয়াজ রপ্তানির ওপরে শুল্ক, ক্ষতির মুখে কৃষকরা

পেঁয়াজ রপ্তানির ওপরে বাড়তি ৪০ % শুল্ক চাপিয়েছে ভারত সরকার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পেঁয়াজ রপ্তানির ওপরে বাড়তি ৪০ % শুল্ক চাপিয়েছে ভারত সরকার
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকার রপ্তানির ওপরে যে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তার ফলে পেঁয়াজ রপ্তানি প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। এর ফলে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা সহ যেসব দেশ, সেখানে পেঁয়াজের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুল্ক চাপানোর আগে যে পেঁয়াজের পাইকারি বাজারে দাম হচ্ছিল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা প্রতি কুইন্টাল, তার দাম হঠাৎই প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। পেঁয়াজ চাষি আর পাইকাররা বলছেন এই সরকারী সিদ্ধান্তে খুচরো ক্রেতারা তো কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন বাজার থেকে, কিন্তু দাম পড়ে যাওয়ায় তারা বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

দেশের সবথেকে বড় পেঁয়াজ বাজার মহারাষ্ট্রের নাসিকের লাসালগাঁও সহ রাজ্যের সব পেঁয়াজ বাজারেই সোমবার থেকে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে কেনাবেচা বন্ধ করে রেখেছেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারেরা।পেঁয়াজ চাষি আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে তারা কিছুটা বাড়তি দামে কৃষক আর আড়ৎদারদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে নেবে।

ইতিমধ্যেই নাফেড বা জাতীয় কৃষিজ পণ্য সমবায় বিপণন ফেডারেশন ২৪১০ টাকা প্রতি কুইন্টাল দরে পেঁয়াজ সংগ্রহ শুরু করেছে বলে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযুষ গোয়েল।

ভারতে পাইকারি দরে সবজি বিক্রি হয় কুইন্টালে হিসাবে। এক কুইন্টাল মানে একশো কিলোগ্রাম।

অভ্যন্তরীন বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অভ্যন্তরীন বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সরকারের এই সিদ্ধান্ত

বাড়তি দুলাখ টন পেঁয়াজ কিনবে সরকার

মন্ত্রী বলেন, “কৃষকদের আতঙ্কিত হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার দরকার নেই।“

ইতিমধ্যেই নাফেডের ভাণ্ডারে তিন লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ আছে, আরও দুই লাখ টন পেঁয়াজ কেনা হবে বলে সরকার জানিয়েছে। মহারাষ্ট্র ছাড়া গুজরাত এবং মধ্যপ্রদেশের পেঁয়াজ বাজারগুলি থেকেও সরকার পেঁয়াজ কিনতে শুরু করেছে। আবার ২৫ টাকা প্রতি কিলো দরে সেই পেঁয়াজ সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও হচ্ছে বলে মি. গোয়েল জানিয়েছেন।

সরকার যুক্তি দিয়েছে দেশীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম যাতে বেড়ে না যায়, সাধারণ মানুষ যাতে স্বাভাবিক দামে পেঁয়াজ কিনতে পারেন, সেজন্যই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করতে ৪০% অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়েছে গত শনিবার থেকে।

বৃষ্টির কারণে এবারের খরিফ মরসুমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে ক্ষেতেই

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বৃষ্টির কারণে এবারের খরিফ মরসুমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে ক্ষেতেই

পেঁয়াজ ফলনে ক্ষতি, দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধি

মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিরা বলছেন খরিফ মরসুমের পেঁয়াজ যখন ঠিক বেরতে শুরু করছিল, সেই মার্চ মাসে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বৃষ্টি হয়। তার ফলে পেঁয়াজ নষ্ট হতে শুরু করে।

“ঠিক যখন পেঁয়াজ বেরচ্ছে, মার্চ মাসে বৃষ্টি হয়। এর ফলে জমিতেই অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আমরা তাড়াতাড়ি ফসল তুলে নিয়েছিলাম। আর দিন পনেরোর মধ্যে সব চাষিই ফসল তোলা শেষ করে ফেলত। দামও ভালই পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু সরকার রপ্তানির ওপরে ৪০ % শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার ফলে যেসব কৃষকের ঘরে এখনও পেঁয়াজ রয়ে গেছে, তাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ভারতে সবথেকে বেশি পেঁয়াজ চাষ হয় যে নাসিকে, সেখানকারই এক চাষি রাজেন্দ্র বড়গুড়ে।

তিনি বোঝাচ্ছিলেন, “বৃষ্টির ফলে ক্ষেতেই ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমরা আগেভাগে পেঁয়াজ তুলে নিয়েছি। এই পেঁয়াজ আবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখাও যাচ্ছে না, পচে যাচ্ছে। সাধারণত খরিফ মরসুমে ফসল আমরা অক্টোবর থেকে তুলতে শুরু করি, কিন্তু এবার প্রায় মাস দুয়েক আগেই ফসল তুলে বিক্রি করতে হয়েছে।“

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

খরিফ মরসুমের পেঁয়াজ দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের ৩৫ % পূরণ করা হয় আর বাকি ৬৫% রবি মরসুমের পেঁয়াজ।

কলকাতার খুচরো পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন যে পেঁয়াজ বাজারে এসেছে, তা বেশিদিন রাখা যাচ্ছে না, দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মি. বড়গুড়ে বলছিলেন, সরকার রপ্তানির ওপরে ৪০% শুল্ক চাপানোর আগে পর্যন্ত গত সপ্তাহেও কুইন্টাল প্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে পেয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু শনিবার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পরেই দাম এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।

“শনিবারের আগে পর্যন্ত আমরা কুইন্টাল প্রতি পাঁচ হাজার টাকায় পাইকারি বাজারে ফসল বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন দাম পাওয়া যাচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা প্রতি কুইন্টাল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. বড়গুড়ে।

এর আগে মার্চ মাসে সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে পেঁয়াজ চাষিরা সঙ্কটে পড়েছিলেন।

তখন অতিরিক্ত ফলনের কারণে পেঁয়াজের দাম পড়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিক রকম।

সেই সময়ে কৃষকরা কেজি প্রতি দুই - তিন টাকাতেও পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

হাজার হাজার কিলোগ্রাম পেঁয়াজ তারা ক্ষেতেই নষ্ট করে দিয়েছিলেন।

ভারতের বৃহত্তম পেঁয়াজের পাইকারি বাজার মহারাষ্ট্রের লাসালগাঁওতে, যেখানে প্রতিদিন এক লাখ টন পেঁয়াজ কেনা বেচা হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের বৃহত্তম পেঁয়াজের পাইকারি বাজার মহারাষ্ট্রের লাসালগাঁওতে, যেখানে প্রতিদিন এক লাখ টন পেঁয়াজ কেনা বেচা হয়

পাইকারি বাজার বন্ধ

বৃহত্তম পেঁয়াজ বাজার নাসিকের লাসালগাঁও মাণ্ডি। সেখানেই পেঁয়াজের আড়ৎ আছে হীরামন পরদেশির।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “আমাদের বাজারে প্রতিদিন এক লক্ষ টন করে পেঁয়াজ কেনাবেচা হয়। এর মধ্যে ৫০% বিদেশে রপ্তানি হয়ে যায়। এখন বাড়তি শুল্ক চাপানোর ফলে সব রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার টন পেঁয়াজ মুম্বাই বন্দরে আটকিয়ে গেছে। বিদেশ থেকে যারা পেঁয়াজ কেনে তাদের সঙ্গে তো রপ্তানিকারকদের আগেই চুক্তি হয়ে গেছে। এখন বিদেশী আমদানিকারকরা বাড়তি ৪০ % শুল্ক দিতে রাজি হবে কেন?”

মি. পরদেশিদের লাসলগাঁও সহ মহারাষ্ট্রের সব পেঁয়াজ বাজারই সোমবার থেকে বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।

পথ অবরোধ করে আন্দোলনেও যেমন নেমেছেন তারা, তেমনই নেতা-মন্ত্রীদের কাছে দেন দরবারও করছেন।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করার ফলে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মধ্য প্রাচ্য সহ যেসব দেশ মূলত ভারত থেকেই পেঁয়াজ আমদানি করে, সেখানেও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।